এলএনজি খাতে বাড়তি কর সুবিধায় সরকারের ক্ষতি ১৩০০ কোটি টাকা : সিপিডি

Printed Edition
ধানমণ্ডিতে সিপিডি আয়োজিত বাজেট নিয়ে আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন গোলাম মোয়াজ্জেম : নয়া দিগন্ত
ধানমণ্ডিতে সিপিডি আয়োজিত বাজেট নিয়ে আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন গোলাম মোয়াজ্জেম : নয়া দিগন্ত

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজস্ব কাঠামো নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনে (ইভি) বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি, ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের ওপর উচ্চ কর ও শুল্ক আরোপের কারণে সবুজ জ্বালানি খাত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।

সিপিডির মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমপরিমাণ শুল্ক-কর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির ওপর আরোপ করা হলে সরকার বছরে এক হাজার কোটি থেকে এক হাজার ২৯৩ কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত রাজস্ব পেত। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানির তুলনায় জীবাশ্ম জ্বালানিকে এভাবে শুল্ক ছাড়ে অন্যায্য সুবিধা দেয়ার কারণে রাষ্ট্র বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে।

গতকাল রোববার সিপিডি আয়োজিত ‘ফসিল ফুয়েল এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে বিদ্যমান রাজস্ব বৈষম্য : জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় বিকল্প সমাধান’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে। সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় এ কথা বলেন।

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এনবিআর বর্তমানে আমদানি করা এলএনজিকে বাজারে কৃত্রিমভাবে সস্তা ও প্রতিযোগিতামূলক রাখতে ভ্যাট অব্যাহতি দিয়ে রেখেছে। এর ফলে এলএনজির ওপর মোট করের হার মাত্র ৯.৫ শতাংশ। অন্য দিকে পরিবেশবান্ধব সৌর বিদ্যুতের (সোলার) সরঞ্জামের ওপর মোট করের হার প্রায় ৩১ শতাংশ এবং বায়ু বিদ্যুতের ওপর এই হার ২৯ শতাংশ। এলএনজি আমদানিতে যদি সৌর বিদ্যুতের সমপরিমাণ কর বা টিটিআই আরোপ করা হতো, তবে সরকারের অতিরিক্ত রাজস্ব আয় হতো এক হাজার ২৯৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা। একইভাবে যদি বায়ু বিদ্যুতের সমপরিমাণ কর আরোপ করা হতো, তবে সরকারের অতিরিক্ত রাজস্ব আসত এক হাজার ৫৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ, জীবাশ্ম জ্বালানিকে এই অন্যায্য সুবিধা দিতে গিয়ে সরকার বছরে সর্বোচ্চ প্রায় এক হাজার ২৯৩ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।

বলা হয়, অন্য দিকে কয়লা আমদানির ওপর যদি পরিবেশবান্ধব সৌর বিদ্যুতের সমপরিমাণ কর আরোপ করা হতো তবে সরকারের অতিরিক্ত রাজস্ব আয় আসত ৬৬৩ কোটি ৬১ কোটি টাকা। সৌর বিদ্যুতের সমপরিমাণ কর আরোপ করলে তেল খাত থেকে আয়ের পরিবর্তে সরকারের রাজস্ব উল্টো চার হাজার ৯৫১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা কমে যাবে। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দেশে টেকসই জ্বালানি রূপান্তরের বড় বাধা হলো এই শুল্ক-কর বৈষম্য। এক দিকে এলএনজি আমদানিতে ভ্যাট শূন্য এবং অগ্রিম আয়কর মাত্র ২ শতাংশ, অন্য দিকে সোলার প্যানেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের ওপর ৭.৫ শতাংশ অগ্রিম কর এবং ৫ শতাংশ এআইটি চাপিয়ে রাখা হয়েছে। এর ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগকারীদের কাছে কৃত্রিমভাবে ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। রাজস্বের এই ক্ষতি ও বৈষম্য দূর করতে সিপিডির পক্ষ থেকে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে- এলএনজি আমদানির ওপর বিদ্যমান শূন্য ভ্যাট সুবিধা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে অন্যান্য সাধারণ জ্বালানির মতো ১৫ শতাংশ ভ্যাট পুনর্বিন্যাস করা, সোলার ও উইন্ড সরঞ্জামের ওপর থেকে ৭.৫ শতাংশ অগ্রিম কর বাতিল করা এবং আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্মার্ট গ্রিড ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য বিশেষ ‘সবুজ ভর্তুকি’ ও অনুদান বরাদ্দ করা।এ ছাড়াও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি, ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের ওপর কর ও শুল্ক কমানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব রাজস্ব নীতি প্রণয়ন এবং জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিদ্যমান প্রণোদনা ও সুবিধা পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করেছে সিপিডি।