গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনের হাজার দিন

ফিলিস্তিনিদের পরাজিত করতে ব্যর্থ ইসরাইল

মিডল ইস্ট মনিটরের মন্তব্য কলাম

Printed Edition

গতকাল ৩ জুলাই গাজায় ইসরাইলের গণহত্যা যুদ্ধ শুরুর এক হাজার দিন পূর্ণ হলো। এটি আমাদের একটি অনস্বীকার্য বাস্তবতা স্বীকার করতে বাধ্য করে: অপ্রতিরোধ্য সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও, ইসরাইল তার প্রধান রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে ব্যাপক। মানবিক বিপর্যয় নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং হাজার হাজার মানুষের জীবনহানি ঘটেছে।

১৯৪৮ সাল থেকে ইসরাইলের একের পর এক সরকার সামরিক শক্তির মাধ্যমে এই সঙ্ঘাতের সমাধান করতে চেয়েছে। গাজায় এই কৌশলটি আবারো এই ধারণার ওপর নির্ভর করেছিল যে অপ্রতিরোধ্য সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিরোধ আন্দোলনকে নির্মূল করবে এবং ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী আকাক্সক্ষাকে স্থায়ীভাবে বিলুপ্ত করবে। এক হাজার দিন পরও, সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়িত হয়নি।

যুদ্ধ গোটা শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে, কিন্তু এটি একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয় বা তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাক্সক্ষাকে ধ্বংস করতে পারেনি। সম্ভবত এটিই এই সঙ্ঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এই যুদ্ধ ইসরাইলি নিরাপত্তা মতবাদের অন্যতম স্তম্ভ, অর্থাৎ এর প্রতিরোধ ক্ষমতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। কয়েক দশক ধরে, প্রযুক্তিগত ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে ইসরাইলের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। কিন্তু একটি দীর্ঘস্থায়ী সঙ্ঘাত, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের অবিচলতা এবং একাধিক আঞ্চলিক রণাঙ্গন উন্মোচিত হওয়া এই কৌশলের সীমাবদ্ধতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণœ রয়েছে। তবে সামরিক শক্তিকে স্থায়ী রাজনৈতিক ফলাফলে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে ইসরাইলের সক্ষমতা ক্রমশই বিতর্কিত হয়ে উঠেছে।

একই সময়ে ইসরাইল এক অভূতপূর্ব আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের সম্মুখীন হচ্ছে। যদিও এটি প্রধান মিত্রদের- বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন অব্যাহত রেখেছে, এর রাজনৈতিক অবস্থান এবং নৈতিক বৈধতা ক্রমাগত বিশ্বব্যাপী সমালোচনার মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে ক্রমবর্ধমান সমালোচনা, প্রসারিত আইনি প্রক্রিয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়, ট্রেড ইউনিয়ন ও নাগরিক সমাজ আন্দোলনের সক্রিয়তা- এই সবই বিশ্বব্যাপী জনমানসে এক গভীর পরিবর্তনের প্রতিফলন।

সম্ভবত এটাই যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ধাক্কা। বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের কাছে ফিলিস্তিনি পতাকা উপনিবেশবাদ, দখলদারিত্ব এবং আন্তর্জাতিক রীতিনীতির পক্ষপাতমূলক প্রয়োগের বিরুদ্ধে বিরোধিতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই এক হাজার দিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সঙ্কটকেও উন্মোচিত করেছে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ যত বেড়েছে, ততই এই ধারণাও দৃঢ় হয়েছে- বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথ জুড়ে যে, যখন প্রধান শক্তিগুলোর স্বার্থ বিপন্ন হয়, তখন বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলো একই দৃঢ়তার সাথে সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এই বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্কট আরো বহুকেন্দ্রিক এবং কম পক্ষপাতমূলক একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার আহ্বানকে জোরদার করেছে। এই এক হাজার দিনের সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, ফিলিস্তিনকে কোণঠাসা করার জন্য পরিকল্পিত কৌশলটি ঠিক তার বিপরীত ফল দিয়েছে।

এর আগে কখনো ফিলিস্তিনিদের দাবি এতগুলো বিক্ষোভ, প্রাতিষ্ঠানিক বিতর্ক, আন্তর্জাতিক প্রচারণা এবং এতগুলো মহাদেশ জুড়ে সংহতির প্রকাশকে অনুপ্রাণিত করেনি। গাজা একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এই এক হাজার দিনের উত্তরাধিকার যুদ্ধক্ষেত্রের অনেক ঊর্ধ্বে বিস্তৃত। এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছে ইতিহাস, পরিচয় এবং জাতীয় আকাক্সক্ষায় প্রোথিত সঙ্ঘাতের সমাধান কেবল সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে করা যায় না।

আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি দেখিয়েছে যে রাজনৈতিক ও নৈতিক বৈধতাও সামরিক শক্তির মতোই নির্ণায়ক হয়ে উঠেছে। ফিলিস্তিনের এখনো একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র নেই, তবুও বিশ্বের রাজনৈতিক চেতনায় এর দাবি আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।