শহীদ জিয়া : সততা, সংযম ও রাষ্ট্রচিন্তা

মো: সহিদুল ইসলাম সুমন

Printed Edition

আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের জীবন ও কর্ম শুধু একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাদের নাম রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে সমুজ্জ্বল হয়ে থাকবে। এখনো তাদের মানসিকতা, রাষ্ট্রচিন্তা ও নেতৃত্বের নৈতিক মানদণ্ড জাতীয় মানসিকতা নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের অন্যতম। স্বাধীনতা যুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব- প্রতিটি পর্যায়ে তিনি যে সততা, দায়িত্ববোধ, আত্মসংযম ও কর্মনিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন, তা আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

আজকের বাস্তবতায় যখন দুর্নীতি, প্রশাসনিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজনৈতিক অবিশ্বাস নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে, তখন শহীদ জিয়ার কর্মজীবনের বিভিন্ন অধ্যায় নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। কারণ একটি রাষ্ট্র শুধু অবকাঠামো নির্মাণে উন্নত হয় না; রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি গড়ে ওঠে নেতৃত্বের নৈতিকতা, প্রশাসনের জবাবদিহি এবং জনগণের আস্থার ওপর। জিয়াউর রহমান তার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জীবনে তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ ছিল ভয়াবহ সঙ্কটের মুখোমুখি। শিল্প উৎপাদন প্রায় বন্ধ, কৃষিব্যবস্থা বিপর্যস্ত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সীমিত এবং প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এমন এক অনিশ্চিত সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, শুধু রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন সৎ প্রশাসন, কঠোর পরিশ্রম এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করে উন্নয়নের বাস্তব কর্মসূচি গ্রহণ।

তার সহকর্মী ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের স্মৃতিচারণে বারবার উঠে এসেছে- জিয়াউর রহমান ছিলেন অত্যন্ত সংযমী ও মিতব্যয়ী মানুষ। রাষ্ট্রপতির পদে থেকেও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি কখনো বিলাসিতাকে প্রশ্রয় দেননি। সরকারি সম্পদের ব্যবহারে ছিলেন কঠোর নীতিনিষ্ঠ। বঙ্গভবনের কর্মকর্তাদের অনেকে উল্লেখ করেছেন, ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সরকারি সম্পদ ব্যবহারকে তিনি অনৈতিক মনে করতেন। এমনকি পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করতেন।

তার ব্যক্তিগত জীবনের বহু ঘটনা আজও মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়। জানা যায়, সন্তানরা স্কুলে যাওয়ার জন্য বড় সরকারি গাড়ি ব্যবহার করলে তিনি অসন্তুষ্ট হতেন এবং কম জ্বালানি খরচ হয় এমন ছোট গাড়ি ব্যবহারের নির্দেশ দিতেন। রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকেও এ ধরনের মিতব্যয়িতা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক বিরল উদাহরণ। কারণ, আজ ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাসের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ জিয়াউর রহমান দেখিয়েছিলেন- রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব মানে জনগণের সম্পদের প্রতি দায়বদ্ধতাও।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালনকালে তিনি যেমন শৃঙ্খলা ও কর্তব্যনিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছিলেন, রাষ্ট্র পরিচালনাতেও একই নীতি অনুসরণ করতেন। প্রশাসনিক ফাইল নিষ্পত্তিতে অযথা বিলম্ব কিংবা অবহেলা তিনি পছন্দ করতেন না। কর্মকর্তাদের প্রতি তার স্পষ্ট নির্দেশ ছিল- রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্ত হতে হবে জনগণের জীবন ও অর্থনীতির সাথে সম্পর্কিত; তাই দায়িত্ব পালনে গাফিলতির সুযোগ নেই। অনেক সাবেক কর্মকর্তা স্মৃতিচারণে বলেছেন, তিনি মাঠপর্যায়ের সমস্যা সম্পর্কে সরাসরি জানতে আগ্রহী ছিলেন। শুধু কাগুজে রিপোর্টে সন্তুষ্ট থাকতেন না।

শহীদ জিয়ার প্রশাসনিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল উৎপাদনমুখী অর্থনীতি। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, বাংলাদেশকে টেকসই উন্নয়নের পথে নিতে হলে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হবে। সেই চিন্তা থেকে তিনি ‘খাল কাটো, দেশ গড়ো’ কর্মসূচি গ্রহণ করেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাল খনন, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয় তার সময়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সত্তরের দশকের শেষ দিকে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে তার সরকারের বাস্তবমুখী উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন- কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। তাই কৃষি খাতে ভর্তুকি, সেচ-সুবিধা সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে তিনি জোর দেন। তার সময় গ্রামাঞ্চলে সড়ক নির্মাণ, সেচখাল সংস্কার এবং স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রমের বিস্তার ঘটে। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হয়। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, বাংলাদেশের পরবর্তী কৃষি অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি হয়েছিল সেই সময়কার নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।

শুধু অর্থনীতি নয়, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন। স্বাধীনতার পর যে একদলীয় শাসন ব্যবস্থার কায়েম হয়েছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে বহুদলীয় রাজনৈতিক চর্চা পুনঃপ্রবর্তনে ভূমিকা রাখেন তিনি। সেই সময় রাজনৈতিক দল গঠনের সুযোগ সৃষ্টি, সংবাদপত্রের ক্ষেত্র উন্মুক্ত করা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। তাই বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

শহীদ জিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার ব্যক্তিগত সততা। দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার পরও ব্যক্তিগত সম্পদের পাহাড় গড়ে না তোলার বিষয়টি আজও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনায় আসে। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও তার জীবনযাপন ছিল সাধারণ ও নিয়ন্ত্রিত। বর্তমান সময়ে যেখানে দুর্নীতির অভিযোগ প্রায় প্রতিটি স্তরে আলোচিত হয়, সেখানে জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত স্বচ্ছতা নতুন প্রজন্মের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

তার সহকর্মীদের অনেকে বলেছেন, তিনি মানুষকে পদমর্যাদা দিয়ে নয়, কাজ ও দায়িত্ববোধ দিয়ে মূল্যায়ন করতেন। সাধারণ কর্মচারী কিংবা নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গেও তিনি মানবিক আচরণ করতেন। তার পরিবার সম্পর্কিত বিভিন্ন স্মৃতিচারণে উল্লেখ পাওয়া যায়, কোনো কর্মচারীর সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করলে তিনি নিজের সন্তানদেরও শাসন করতেন। এ আচরণ তার ব্যক্তিত্বের মানবিক দিকটিকে স্পষ্ট করে।

বেগম খালেদা জিয়া বিভিন্ন সময়বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন, জিয়াউর রহমান পরিবারকে খুব বেশি সময় দিতে পারতেন না, কারণ দেশের কাজ নিয়ে তিনি অধিকাংশ সময় ব্যস্ত থাকতেন। একজন সামরিক কর্মকর্তা থেকে রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হওয়ার পুরো যাত্রাপথে দায়িত্ববোধ ও কর্মনিষ্ঠা ছিল তার জীবনের মূল ভিত্তি। তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো ব্যক্তিগত গৌরবের বিষয় নয়; বরং এটি জনগণের প্রতি একটি অর্পিত দায়িত্ব।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তিনি বাস্তববাদী কূটনীতির পরিচয় দেন। মুসলিম বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার, আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগ এবং বৈদেশিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণে তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। অনেক বিশ্লেষকের মতে, বাংলাদেশের শ্রমশক্তি মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে প্রবেশের যে প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, তার পেছনেও জিয়াউর রহমান সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

বর্তমান প্রজন্মের জন্য শহীদ জিয়ার জীবন কয়েকটি মৌলিক শিক্ষা বহন করে। প্রথমত, নেতৃত্বের মূল ভিত্তি ব্যক্তিগত সততা। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি ও দায়িত্ববোধ অপরিহার্য। তৃতীয়ত, উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয় যখন তার সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছে যায়। চতুর্থত, ক্ষমতা ভোগের জন্য নয়; জনগণের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য।

আজ দেশের মানুষ যখন সুশাসন, নৈতিক নেতৃত্ব এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার দাবি তুলছে, তখন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কর্মজীবন নতুনভাবে আলোচনায় আসা স্বাভাবিক। কারণ ইতিহাস কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়; ভবিষ্যতের জন্যও দিকনির্দেশনা দেয়। যে রাষ্ট্রে নেতৃত্বের মধ্যে সততা ও দায়বদ্ধতা থাকে, সেই রাষ্ট্রই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহু নেতা এসেছেন, আবার সময়ের স্রোতে হারিয়েও গেছেন। কিন্তু কিছু মানুষ তাদের কর্ম, আদর্শ ও ব্যক্তিত্বের কারণে দীর্ঘসময় জনগণের স্মৃতিতে বেঁচে থাকেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাদের একজন। তার জীবন নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু ব্যক্তিগত সততা, দেশপ্রেম ও কর্মনিষ্ঠার প্রশ্নে তিনি যে একটি শক্তিশালী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

আজ যখন সমাজের বিভিন্ন স্তরে নৈতিক অবক্ষয়ের অভিযোগ বাড়ছে, তখন শহীদ জিয়ার জীবন ও কর্ম আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন সৎ নেতৃত্ব, দায়িত্বশীল প্রশাসন এবং জনগণের প্রতি আন্তরিক অঙ্গীকার। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তার কর্মজীবনের মধ্য দিয়ে সেই বার্তা দিয়ে গেছেন- নেতৃত্বের প্রকৃত শক্তি ক্ষমতায় নয়, সততা ও জনগণের আস্থায়।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিষয়ক গবেষক