অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
ধারাবাহিকভাবে পতন ঘটছে দেশের পুঁজিবাজার সূচকের। গতকাল দুই পুঁজিবাজারের এ পতন গড়াল টানা পঞ্চম দিনে। আর ঢাকা পুঁজিবাজারের হিসাবে তা ষষ্ঠ দিন পার করেছে গতকাল। ১৩ আগস্ট থেকেই শুরু হয়েছে পুঁজিবাজার সূচকের এ পতন। এ সময় ঢাকা শেয়ারবাজারের প্রধান সূচকটির অবনতি ঘটেছে প্রায় ১৩০ পয়েন্ট। বাজার বিশ্লেষকরা হঠাৎ পুঁজিবাজারের নেতিবাচক আচরণের কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ বলতে না পারলেও বিনিয়োগকারীরা কয়েকটি বিষয়কে এর পেছনের কারণ হিসেবে দেখছেন।
তাদের মতে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের অপ্রতুলতা, বিভিন্ন ব্রোকার হাউজের নানা অনিয়মের অভিযোগে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ, ডিএসইর বিভিন্ন অনিয়মের কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্তের সিদ্ধান্ত ও সর্বোপরি সংশোধিত মার্জিন রুলস নিয়ে বিনিয়োগকারীদের কিছুটা হতাশা তো আছেই। সব মিলিয়ে হ-য-ব-র-ল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে পুঁজিবাজার। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পুঁজিবাজারের জন্য চলতি অর্থবছরের বাজেটে বেশ কিছু নীতি সহায়তার কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশের অর্থনীতি এখন অনেকটা স্থবির। অর্থনীতিতে চাঙ্গাভাব না থাকলে কিসের ভিত্তিতে পুঁজিবাজার ভালো থাকবে। তা ছাড়া বাজারকে ইতিবাচক ধারায় ফেরাতে হলে দৃশ্যমান কিছু করতে হবে, যাতে বিনিয়োগকারীরা আশ্বস্ত হতে পারেন যে, বাজারে ভালো কিছু ঘটবে। ন্যূনতম পক্ষে কিছু ভালো কোম্পানির আইপিও বা ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির উদ্যোগ দেখা গেলেও তা বিনিয়োগকারীদের বাজারে টিকে থাকার প্রেরণা জোগাতো।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৪০ দশমিক ৬৪ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৫ হাজার ৮১৪ দশমিক ২৬ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৭৭৩ দশমিক ৬২ পয়েন্টে। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ একই সময় যথাক্রমে ১১ দশমিক ১৯ ও ৭ দশমিক ৫৪ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। একই চিত্র ছিল দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই)। এখানে সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১১০ দশমিক ৭২ পয়েন্ট হারায় গতকাল। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৯৩ দশমিক ৪১ ও ৬ দশমিক ৮৪ পয়েন্ট।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনার জন্য প্রদেয় মার্জিন ঋণের সংশোধিত বিধিমালার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এখন থেকে মার্জিন ঋণের ক্ষেত্রে এই বিধিমালা অনুসরণ করতে হবে।
সংশোধিত বিধিমালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে মার্জিন হিসাবে গ্রাহকের ইক্যুইটি মোট মার্জিন অর্থায়নের কমপক্ষে ৫০ শতাংশ রাখা, ইক্যুইটি ২৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই প্রয়োজনীয় সিকিউরিটিজ বিক্রির সুযোগ, মার্জিন ঋণের সর্বোচ্চ অনুপাত ১:১ নির্ধারণ, একক সিকিউরিটিতে মোট বকেয়া মার্জিন অর্থায়নের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ সীমা এবং মার্জিন অর্থায়নকারীর নিজস্ব মূলধন বা নিট সম্পদের চারগুণ পর্যন্ত অর্থায়নের সীমা।
এ ছাড়া কোনো কোনো শেয়ারে মার্জিন ঋণ দেয়া যাবে, সেই যোগ্যতার ক্ষেত্রেও কঠোর শর্ত রাখা হয়েছে। সাধারণ কোম্পানির ক্ষেত্রে মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই ৪০-এর বেশি হলে এবং শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস ঋণাত্মক হলে ওই শেয়ারে মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে না। তালিকাভুক্ত জীবন বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে পিইর পরিবর্তে মূল্য-সম্পদ অনুপাত বা পিবি বিবেচনা করা হবে। পিবি ৩-এর বেশি অথবা নিট সম্পদ মূল্য ঋণাত্মক হলে সংশ্লিষ্ট শেয়ারে মার্জিন ঋণ দেয়া যাবে না।
ব্যাংক, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে পি/ই রেশিওর পরিবর্তে পি/বি রেশিওর ভিত্তিতে মার্জিন দেয়ার প্রস্তাব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও সেখান থেকে সরে এসেছে কমিশন। সংশোধিত বিধিমালা অনুসারে কেবল জীবন বীমা কোম্পানির শেয়ারের ক্ষেত্রে পি/বি রেশিও প্রযোজ্য হবে।
বিধি অনুসারে, গ্রাহকের ইক্যুইটি মার্জিন অর্থায়নের ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এলে মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের কাছে প্রযোজ্য মার্জিন জমা দিতে বলবে, গ্রাহক তা না করলে বা করতে ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠান আংশিক সিকিউরিটিজ বিক্রি করে ইক্যুইটি মার্জিন অর্থায়নের ৫০ শতাংশে উন্নীত করবে। অন্য দিকে গ্রাহকের ইক্যুইটি ২৫ শতাংশের নিচে নেমে এলে মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান কোনো নোটিশ না দিয়েই প্রয়োজনীয় সংখ্যক সিকিউরিটিজ বিক্রি করে মার্জিন সমন্বয় করতে পারবে। তবে আবশ্যিক বিক্রয় আদেশ দেয়ার পরও যদি সেটি তাৎক্ষণিক কার্যকর না হয় বা বিলম্বে কার্যকর হয়, সেক্ষেত্রে উদ্ভূত ক্ষতির দায় প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তাবে না।
মার্জিন ঋণের সর্বোচ্চ অনুপাত হবে ১:১; অর্থাৎ গ্রাহকের ইক্যুইটির চেয়ে বেশি মার্জিন দিতে পারবে না সংশ্লিষ্ট ব্রোকারহাউজ বা মার্চেন্ট ব্যাংক। এ সুবিধা কেবল এ ও বি ক্যাটাগরির শেয়ারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। মূল বোর্ডের জি, এন ও জেড ক্যাটাগরিভুক্ত কোম্পানি এবং এসএমই বোর্ড, এটিবি বোর্ড ও ওটিসি প্ল্যাটফর্মে থাকা কোনো কোম্পানির শেয়ার মার্জিনযোগ্য হবে না।
এ ছাড়া মার্জিন নেয়ার সময় সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের কমপক্ষে তিন লাখ টাকা বিনিয়োগ থাকতে হবে। মার্জিনযোগ্য শেয়ারের সর্বোচ্চ মূল্য-আয় অনুপাত (পি/ই রেশিও) হবে ৪০। পিই রেশিও ৪০-এর বেশি হলে ওই শেয়ারে মার্জিন ঋণ দেয়া যাবে না। জীবনবীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে পি/ই রেশিওর পরিবর্তে পি/বি রেশিও বিবেচিত হবে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ রেশিও হবে তিনগুণ। কোনো কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ঋণাত্মক হলে, ওই শেয়ারেও মার্জিন দেয়া যাবে না। সর্বশেষ চার প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ইপিএসের ভিত্তিতে পি/ই রেশিও নির্ণীত হবে। (পি/ই রেশিও = সংশ্লিষ্ট শেয়ারের ক্লোজিং মূল্য/নিরীক্ষিত ইপিএস)।কোনো মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান তার প্রকৃত মূলধনের চারগুণের বেশি অর্থায়ন করতে পারবে না এবং তার মার্জিন অর্থায়নের ২০ শতাংশের বেশি একক সিকিউরিটিজে অর্থায়ন করতে পারবে না।



