নির্বাচনে বড় ঝুঁকি সোশ্যাল মিডিয়া

আবুল কালাম
Printed Edition

নির্বাচনে বড় ঝুঁকি এখন সোশ্যাল মিডিয়া। এতে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া তথ্য ও বিদ্বেষমূলক প্রচার নির্বাচনে ঝুঁকির শঙ্কা তৈরি ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ডিজিটাল প্রতিযোগিতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর কনটেন্ট, প্রোপাগান্ডা নেটওয়ার্ক এবং বাণিজ্যিক কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিকৃত ছবি, মনগড়া ভিডিও ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি কনটেন্ট প্রার্থী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়ভীতি, হয়রানি, দমন ও দেশকে অস্থিতিশীল করার বড় হাতিয়ার হয়ে কাজ করছে।

হ্যাশমেটা নামের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারী সাড়ে ৪ কোটির বেশি। টিকটক ব্যবহারকারী প্রায় ২ কোটি। ইউটিউব ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩ কোটির বেশি। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠেছে ডিজিটাল মাধ্যম। কিন্তু এতে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া তথ্যের ৯০ শতাংশেরই উৎস প্রতিবেশী ভারত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রচলিত গণমাধ্যমের তুলনায় ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই প্রার্থীরা বেশি সক্রিয় থাকেন। পোস্টার ও ব্যানার ব্যবহারের সীমাবদ্ধতায় প্রচারে বিকল্প মাধ্যম হিসেবে তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের সব কার্যক্রম তুলে ধরছেন। কিন্তু ফেক নিউজ, গুজব ও অপপ্রচারে সোশ্যাল মিডিয়া ঝুঁকিতে ফেলছে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্য প্রার্থীদের ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব অপপ্রচার থেকে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেইট বলেছে, তারা ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে ‘হিন্দু গণহত্যা’ দাবি করে করা ৭ লাখের বেশি পোস্ট শনাক্ত করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি অ্যাকাউন্ট থেকে এসব তথ্য ছড়ানো হয়েছে। এসব কনটেন্টের ৯০ শতাংশের বেশি এসেছে ভারত থেকে। বাকিগুলো যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় থাকা সংশ্লিষ্ট হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেটওয়ার্কের সাথে সংশ্লিষ্ট। এএফপির ফ্যাক্ট চেক যেসব তথ্য যাচাই করে ভুয়া প্রমাণ করেছে, তার মধ্যে কিছু কিছু পোস্ট হাজার হাজার বার শেয়ার করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, নির্বাচন সংক্রান্ত ডিপফেক ঘটনাগুলোর ৯২ শতাংশে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহৃত হয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি জাতীয় গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত মাত্র এক মাসে ৯৭টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ছড়িয়েছে। এগুলো এসেছে ৬১৫টি পর্যবেক্ষণাধীন পেজ ও প্রোফাইল থেকে।

ভিডিওগুলোর মধ্যে কিছু এসেছে একটি রাজনৈতিক ধারার সমর্থকদের কাছ থেকে, কিছু এসেছে অন্য ধারা থেকে। এগুলোর কোনোটিতে রাজনৈতিক নেতাদের মুখে ভুয়া বক্তব্য বসিয়ে দেয়া হচ্ছে। তাদের ছবি বিকৃত করা হচ্ছে। এমনকি নেতাদের কণ্ঠস্বর নকল করে অডিও তৈরি হচ্ছে।

ডিজিটালি রাইটের গবেষণা বলছে, ১৭ কোটির বেশি জনসংখ্যার বাংলাদেশে ফ্যাক্ট চেকারের সংখ্যা ৪০ থেকে ৫০ জন। অধিকাংশ মূলধারার গণমাধ্যমে ফ্যাক্ট চেকার নেই। সাংবাদিক ও ফ্যাক্ট চেকারদের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি কৌশল যেমন নেই, আবার তাদের মধ্যে সমন্বয়েরও অভাব রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি বলছে নির্বাচন কমিশনেরও এই ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত নীতি-কাঠামো, দক্ষতা ও সক্ষমতা নেই। নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও নাগরিক সমাজেরও ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ চালানোর কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভুয়া তথ্য ও বিদ্বেষমূলক প্রচার নির্বাচনে ঝুঁকির শঙ্কা তৈরি ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

এ বিষয়ে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর জোহা নয়া দিগন্তকে বলেন, ভুল তথ্য মোকাবিলা করার জন্য ফেসবুক এবং ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। এ নিয়ে সরকারকে প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে আলোচনা করে তাদেরকে জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। দেশের জন্য এটি বড় হুমকি উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে তথ্য যাচাইয়ের সচেতনতা খুব বেশি নেই। এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া দৃশ্য ও ভিডিওর কারণে ভোটাররা বিভ্রান্ত হচ্ছে।

অপর দিকে রিউমার স্ক্যানার দ্য ডিসেন্টের সৈয়দ হাসান আল মানজুরের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে হাঁটছে। নির্বাচন কমিশন ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটের তফসিল ঘোষণা করেছে। এরপরই নির্বাচনকে সামনে রেখে অপতথ্যের বড় উৎস হয়ে উঠেছে ভারতীয় গণমাধ্যম এবং ভারতীয় সামাজিক মাধ্যম।

তার ভাষ্য, তফসিল ঘোষণার পর থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৬০ দিনে ভারত থেকে বহুল প্রচারিত ৩৯টি অসত্য বা অপতথ্য শনাক্ত করে দ্য ডিসেন্ট। বাংলাদেশের চারটি ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান দ্য ডিসেন্ট, রিউমার স্ক্যানার, বাংলা ফ্যাক্ট এবং ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করে এবং ফেসবুক, টুইটার (এক্স) এর মাধ্যমে প্রচারিত দাবি বিশ্লেষণ করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। গত ৬০ দিনে প্রাপ্ত ৩৯টি অপতথ্যের মধ্যে ৯টি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়েছে এবং ৩০টি ভারত থেকে পরিচালিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে।