সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনায় বাংলাদেশী হজযাত্রীদের বাড়ি ভাড়া ও কর্মকর্তা নিয়োগ একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নতুন সরকার কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন সাবেক আইজিপি ও সৌদি আরবে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত জাবেদ পাটোয়ারী এবং লন্ডনে অবস্থানরত সৌদি আরবে বাংলাদেশের সাবেক কনসুলেট জেনারেল কাজী এমদাদুল ইসলাম। ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এই সিন্ডিকেট বাংলাদেশ কনস্যুলেটে নিজেদের পছন্দমতো কর্মকর্তাদের কাউন্সেলর (হজ) ও কনসাল (হজ) পদে পদায়নের জন্য কাজ করছে। ইতোমধ্যে এই সিন্ডিকেটের তৎপরতায় মাত্র দুই মাস আগে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা কনসাল (হজ) হিসেবে কর্মরত আসলাম উদ্দিনকে পুনরায় সৌদি আরবে পোস্টিং দিতে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ৩টি পত্র প্রেরণ করা হয়েছে।
সৌদি আরবভিত্তিক একাধিক সূত্র জানায়, মক্কা-মদিনাসহ বিভিন্ন এলাকায় জাবেদ পাটোয়ারী ও কাজী এমদাদুল ইসলামের সংশ্লিষ্ট হোটেল ও আবাসন ব্যবসা রয়েছে। এসব ব্যবসার পাশাপাশি হজ মৌসুমে বাড়ি ভাড়া নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দূতাবাস ও হজ সংশ্লিষ্ট পদে পছন্দের কর্মকর্তাদের নিয়োগে কাজ করছেন।
ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সাবেক কনসাল (হজ) উপসচিব মো: আসলাম উদ্দিনকে পুনরায় সৌদি আরবে একই পদে পদায়নের চেষ্টা চলছে। অতীতে তিনি সিলেটের সাবেক জেলা প্রশাসক কাজী এমদাদুল ইসলামের অধীনে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে দু’জনই জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটে দায়িত্ব পান। সেখানে অবস্থানকালে মক্কা-মদিনার বাড়ি ভাড়া ব্যবস্থাপনায় একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র জানায়, সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজযাত্রীদের আবাসন ভাড়ার ক্ষেত্রে ওই নেটওয়ার্কের বাইরে কাজ করার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছিল। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জাভেদ পাটোয়ারী এবং কনসুলেট জেনারেল কাজী এমদাদুল ইসলামসহ কয়েকজন কর্মকর্তা লন্ডনে পালিয়ে যান। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় সংশ্লিষ্টদের দেশত্যাগে সহায়তা করেছিলেন কনসাল (হজ) হিসেবে কর্মরত আসলাম উদ্দিন। পরবর্তীতে পলাতক কর্মকর্তাদের সম্পদ এবং অর্থ পৌঁছে দিতে আসলাম উদ্দিন সরকারের অনুমোদন ছাড়াই গোপনে মিসর এবং তুর্কি সফর করেছেন।
দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ এবং ফ্যাসিবাদের সহযোগীদের সাথে যোগাযোগের প্রেক্ষিতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আসলাম উদ্দিনকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ১৫ মার্চ তাকে চট্টগ্রাম বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলেও তিনি সেখানে যোগদান করেননি। এ অবস্থায় তাকে পুনরায় সৌদি আরবে পদায়নের জন্য তৎপরতা চলছে বলে জানা গেছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, উপসচিব পর্যায়ে যোগ্য কর্মকর্তার অভাব নেই। তবুও একই ব্যক্তিকে বারবার কনসাল (হজ) হিসেবে পাঠানোর উদ্যোগ রহস্যময়। ইতোমধ্যে ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে আসলাম উদ্দিনকে সৌদি আরবের পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তিনটি পত্র প্রেরণ করা হয়েছে। অন্য দিকে তাকে পদায়ন না দিলে হজ ব্যবস্থাপনায় বিঘœ ঘটতে পারে এমন যুক্তি দেখিয়ে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। অথচ হজ কার্যক্রম একটি সম্মিলিত কার্যক্রম এবং এতে প্রায় ৩০০ কর্মকর্তা একসাথে কাজ করেন।
এদিকে মদিনায় হজ অফিসের ভবন ভাড়া নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মালিকানাধীন ভবন ভাড়া নেয়া হয়েছে, যদিও সেগুলোর অবস্থান হজযাত্রীদের সেবার জন্য উপযোগী নয়। একই ধরনের অভিযোগ মক্কার আজিজিয়া এলাকায় এক শতাংশ কোটায় ভাড়া নেয়া কয়েকটি ভবন নিয়েও রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল, যা হজ ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এ ছাড়া বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ছাড়া একাধিক দেশে ভ্রমণের অভিযোগও উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
বর্তমানে মো: আসলাম উদ্দিন ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কর্মরত থাকলেও তাকে ২০২৬ সালের হজ প্রশাসনিক টিমের সাথে পুনরায় সৌদি আরবে পাঠানোর তদবির চলছে বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
এ বিষয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (হজ) আয়াতুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকারিভাবে যেসব হজযাত্রী যাবেন মক্কা ও মদিনায় তাদের বাড়ি ভাড়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো ধরনের সিন্ডিকেটের তথ্য তিনি অস্বীকার করেন। আসলাম উদ্দিনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তার পাঁচ বছর মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে তাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তিনি জনপ্রশাসনের অধীনে আছেন। তাকে পদায়নের বিষয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কোনো হাত নেই জানিয়ে তিনি বলেন, আসলাম উদ্দিন হজ বিষয়ে একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা। তিনি এ বিষয়ে ভালো কাজ করতে পারবেন। তবে তাকে দায়িত্ব দেয়া হবে কি না তা নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।



