নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রাম বন্দরের সর্ববৃহৎ কনটেইনার টার্মিনাল এনসিটি (নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল)-তে বিদেশী অপারেটর নিয়োগের প্রশ্নটি নবগঠিত সরকারের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। টার্মিনালটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে ইজারা দেয়ার বিষয়টির সাথে এবার নতুন করে যোগ হয়েছে সিসিটি (চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল)। ডিপি ওয়ার্ল্ড এখন এনসিটির পাশাপাশি বন্দরের আরেক সমৃদ্ধ কনটেইনার টার্মিনাল সিসিটিও চায় এবং সরকার বিষয়টি পিপিপি প্ল্যাটফর্মে আলোচনার জন্য সম্মত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। শিপিং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের অন্যতম প্রতিরক্ষা স্থাপনার সাথে লাগোয়া এনসিটি এবং সিসিটি উভয় টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে গেলে একদিকে প্রাইভেট মনোপলি যেমনি কায়েম হবে। তেমনি বন্দরের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই ভারত-মার্কিন-ইসরাইলি লবির হাতে গিয়ে ভূ-কৌশলগত ঝুঁকির সৃষ্টি হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। ইতঃপূর্বে ইজারা দেয়া পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালটির অপারেটর সৌদী আরবভিত্তিক হলেও প্রতিষ্ঠানটিতে আমাদের প্রতিবেশী একটি দেশের কর্মকর্তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলেও সূত্রের দাবি। তা ছাড়া বন্দরের বিদ্যমান আয়ের প্রায় ৫০ শতাংশই আসে এ দু’টি টার্মিনাল থেকে। বর্তমানে এনসিটিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কনটেইনার একক (টিইইউ) প্রতি নিট আয় ৯৭ ডলার; কিন্তু ডিপি ওয়ার্ল্ডের সর্বশেষ যে রেভিনিউ শেয়ারিং মডেল প্রস্তাব করা হয়েছে তাতে আফ্রন মানি (চুক্তি মূল্য) এবং হ্যান্ডলিং চার্জ মিলিয়ে তাতে কনটেইনার একক প্রতি আয় সর্বোচ্চ ৮৫ ডলার পর্যন্ত হয়।
শিপিং সংশ্লিষ্টরা বলছেন,এনসিটির বিষয়টি তিনটি সরকারের চলমান আলোচনা এবং দরকষাকষির একটি প্রক্রিয়া। যেহেতু সাত বছর আগে স্বাক্ষরিত জিটুজি এমওইউ’র আওতায় টার্মিনালটি ইজারার আলোচনা চলছে, ফলে সরকারের সরে আসার সুযোগ নেই; কিন্তু নতুন করে সিসিটি তাদের হাতে দেয়ার আলোচনা বড় ধরনের ঝুকি তৈরি করবে বলেও সূত্র দাবি করেছে।
শিপিং সংশ্লিষ্টরা বলছেন এনসিটির বাৎসরিক হ্যান্ডলিং ক্ষমতা ১৫ লাখ টিইইউএস। সিসিটির ক্যাপাসিটি সাত লাখ টিইইউএস। আর সৌদী প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেয়া পিসিটির ক্যাপাসিটি পাঁচ লাখ টিইইউএস। এনসিটি এবং সিসিটি একক প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দিলে তাদের হাতেই চলে যাবে ২২ লাখ টিইইউএস হ্যান্ডলিং-এর কর্তৃত্ব, যা বন্দরের বিদ্যমান কন্টেইনার হ্যান্ডলিং-এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। তা ছাড়া এ দুই টার্মিনালের বাইরে বন্দরের ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ডেরও শতভাগ নিয়ন্ত্রণ চায় ডিপি ওয়ার্ল্ড, সে ক্ষেত্রে বন্দর কর্তৃপক্ষ দিতে চায় ইয়ার্ডটির ৬০ শতাংশের কর্তৃত্ব।
সূত্র জানিয়েছে, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ৮ এপ্রিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে ৪র্থ বাংলাদেশ দুবাই জয়েন্ট পিপিপি প্লাটফর্ম মিটিং অনুষ্টিত হয়। ওই সভায় বাংলাদেশের পক্ষে বিডার চেয়ারম্যান ও পিপিপি অথরিটির সিইও আশিক চৌধুরী এবং দুবাই সরকারের পোর্টস কাস্টমস অ্যান্ড ফ্রি জোনস করপোরেশনের সিইও নাছের আব্দুল্লাহ আল নিয়াদি নিজ নিজ পক্ষে নেতৃত্ব দেন। ডিপি ওয়ার্ল্ডের গ্রুপ সিইও যুবরাজ নারায়নসহ ডিপি ওয়ার্ল্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা ওই সভায় যোগ দেন।
ওই সভায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষ হতে কনসেশন চুক্তির মেয়াদ ১৫ বছরের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য বাংলাদেশের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে। একটি সূত্র জানিয়েছে তারা ৩০ বছরের জন্য টার্মিনালটি নিতে চায়। এনসিটির জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ড (দরদাতা) একটি সংশোধিত দরপত্রও জমা দিতে সম্মত হয়েছে বলেও সূত্র জানায়।
নতুন করে আলোচনায় সিসিটি
সূত্র জানিয়েছে, গত মাসে অনুষ্ঠিত ৪র্থ পিপিপি প্ল্যাটফর্ম সভায় ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটি টার্মিনালকে একটি অবিচ্ছিন্ন টার্মিনালে পরিণত করতে এর সংলগ্ন সিসিটি টার্মিনালকে আধুনিকীকরণ ও পরিচালনায় আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশ দুবাই যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্মে সিসিটি অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করতে এবং প্ল্যাটফর্মের ভবিষ্যৎ সভাগুলোতে এটিকে একটি পৃথক প্রকল্প হিসেবে আলোচনা করতে সম্মত হয়েছে বলেও সূত্র জানায়।
এ দিকে বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের প্রধান প্রধান কেপিআই ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক অপারেটর নিয়োগ কার্যত ভূ-কৌশলগত ঝুঁকিও রয়েছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল ঘনিষ্ঠ হওয়ায় বন্দরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ভারত-মার্কিন-ইসরাইলি লবির স্বার্থে ব্যবহৃত হয় কি না সে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ।
শিপিং সংশ্লিষ্টদের মতে, শ্রম বাজারের ইস্যু সামনে রেখে দেশটি এনসিটির পাশাপাশি সিসিটিও নিতে চায়, যা রীতিমতো উদ্বেগজনক। তা ছাড়া সর্বশেষ দরকষাকষিতে তারা যে হ্যান্ডলিং চার্জ দেয়ার প্রস্তাব করেছে তা আবার বর্তমান আয়ের চাইতে অনেক কম। ফলে শ্রম বাজার রক্ষা এবং দরকষাকষিতে টার্মিনালটিতে বিদ্যমান আয়ের সাথে সঙ্গতি রেখে হ্যান্ডলিং চার্জ নির্ধারণই এখন সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন শিপিং সংশ্লিষ্টরা। টার্মিনালটি দেশের কৌশলগত অবস্থানে হওয়ায় বিদেশী অপারেটরের হাতে যাওয়ার পর যাতে দেশের কৌশলগত নিরাপত্তা ঝুঁকিতে না পড়ে সে বিষয়েও গুরুত্বারোপ করছেন বন্দর সংশ্লিষ্টরা।
শিপিং সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এনসিটিতে বর্তমানে হ্যান্ডলিং এবং স্টোরেজ চার্জ মিলিয়ে প্রতি একক কনটেইনারে আয় হয় ১৬০ ডলারের কিছু বেশি। অপারেশনাল ব্যয় বাদ দিলে প্রতি একক কনটেইনারে নিট আয় ৯৭ ডলার বলে সূত্র জানায়। ডিপি ওয়ার্ল্ডের সর্বশেষ প্রস্তাবনা অনুযায়ী আফ্রন মানি (চুক্তি মূল্য) এবং হ্যান্ডলিং চার্জ মিলিয়ে তা সর্বোচ্চ ৮৫ ডলার পর্যন্ত হয়। এর বাইরে বন্দর কর্তৃপক্ষ ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ডের ৪০% চলাচলের অধিকারসহ সিসিটির জন্য বরাদ্দ রেখে বাকি ৬০% ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বরাদ্দ দেয়ার প্রস্তাব দেয়; কিন্তু ডিপি ওয়ার্ল্ড চায় ইয়ার্ডটির শতভাগ। ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষ থেকে চুক্তির মেয়াদ ১৫ বছর হলেও আরো ১৫ বছরের এক্সটেনশন ক্লজ চায়। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ চায় ১৫ বছরেই সীমাবদ্ধ থাকতে।
তা ছাড়া বন্দর কর্তৃপক্ষ এনসিটির ১ নং জেটি পানগাঁও আইসিটির জন্য বরাদ্দ রেখে বাকি চারটি জেটির দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দিতে চায়; কিন্তু ডিপি ওয়ার্ল্ড তাতে রাজি নয়। সব মিলিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সর্বশেষ প্রস্তাবে রাজি হননি সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
বন্দরের একটি সূত্র জানিয়েছে, পিপিপি অ্যাক্ট ২০১৫ অনুসারে জি টু জি চুক্তির ক্ষেত্রে মিনিমাম প্রজেক্ট ভ্যালু ১০০ মিলিয়ন ডলার হতে হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, এনসিটিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের ক্যাপিটাল কস্ট ৮০ মিলিয়ন ডলারের বেশি হবে না। যদিও ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতে, ক্যাপিটাল কস্ট হবে ৬০০ মিলিয়ন ডলার আর আইএফসির মতে তা ১২০ মিলিয়ন ডলার। তা ছাড়া সর্বশেষ ডিপি ওয়ার্ল্ড রেভিনিউ শেয়ারিং মডেলের প্রস্তাব করে যেখানে প্রতি একক কনটেইনারে আয় ১১৫ ডলারের নিচে হলে তারা বন্দর কর্তৃপক্ষকে ৫২ ডলার এবং আয়ের ভিত্তিতে তা সর্বোচ্চ ১২০ ডলার পর্যন্ত পরিশোধ করতে রাজি হয়। বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন এ মডেলে গড়ে প্রতি একক কনটেইনারে বন্দরের আয় দাঁড়াবে ৮৫ ডলার; কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ বর্তমানে টার্মিনালটিতে প্রতি একক কনটেইনারে আয় করে নিট ৯৭ ডলার।
ডিপি ওয়ার্ল্ডকে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া যেভাবে শুরু
এনসিটিতে বর্তমানে বছরে হ্যান্ডলিং হয় ১.৩ মিলিয়ন টিইইউএস। টার্মিনালটির মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৩৩% রাজস্ব আয় হয়। লজিস্টিক খাতে বিনিয়োগ আকর্ষনের নামে দেশের ডলার সঙ্কট কাটাতে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকার সংযুক্ত আমিরাতকে চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনালসহ বন্দর খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়। ওই প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারী দুবাইতে পিপিপি জিটুজি পদ্ধতিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দুবাই সরকারের পক্ষে ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে পিপিপি কর্তৃপক্ষের মধ্যে এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়।
অন্তবর্তী সরকারের সময়ে দরকষাকষিতে গতি
সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ এর জুলাই আগস্ট আন্দোলনের সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেফতার বাংলাদেশীদের ছাড়াতে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা যখন ইউএই আমিরকে ফোন করেন তখন ওই ইস্যুকে কেন্দ্র করে ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটি ইস্যুতে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের অব্যবহিত পরেই ২০২৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ও সিইও সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টাকে চিঠি দিয়ে সে বছর জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সাইডলাইনের দ্বিপক্ষীয় মিটিংয়ের প্রস্তাব দেন। সে অনুযায়ী ডিপি ওয়ার্ল্ড চেয়ারম্যানের সাথে প্রধান উপদেষ্টার সাইডলাইন মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টাকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান এনসিটি প্রকল্পে তাদের আগ্রহ এবং ইতোমধ্যে পতিত সরকারের সময়ে সম্পাদিত জিটুজি এমওইউর কথা স্মরণ করিয়ে দেন বলে সূত্র জানায়। একই সাথে দুবাইয়ের বিশাল শ্রমবাজার এবং সেখানে থাকা প্রায় পাঁচ লাখ অবৈধ শ্রমিকের ইস্যুও সামনে আনা হয়েছে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। ওই বৈঠকের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চুক্তির প্রক্রিয়ায় জোর দেয়। ইতোমধ্যে আইএফসিও ট্রানজেকশন স্ট্রাকচার প্রতিবেদন জমা দেয়।
এ বিষয়ে সরকারের পিপিপি অথরিটির কর্মকর্তারা কথা বলতে রাজি হননি। তবে অথরিটির এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, দরকষাকষি এখনো সেভাবে শুরু হয়নি, তবে শিগগিরই শুরু হবে। এনসিটির পাশাপাশি সিসিটি নিয়েও ডিপি ওয়ার্ল্ডের আগ্রহের কথা ওই কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারাও কথা বলতে রাজি হননি। তবে একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের (পিসিটি) চুক্তিতে আরএসজিটির সাথে দেশের স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কাজেই দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই নেগোসিয়েশন হওয়া উচিত। বিদেশী অপারেটর নিয়োগের বিষয়ে ট্রানজেকশন এডভাইজর নিয়োগের পাশাপাশি একটি কোর কমিটি কাজ করছে বলেও সূত্র জানায়।



