সৌদির তেলের পাইপলাইনে হামলার দায়ে ইরাকে রদবদল, সঙ্ঘাত এড়ানোর বার্তা ট্রাম্পের

জ্বালানি পথ ঘিরে বহুমুখী যুদ্ধ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরের মোখা বন্দরের আধিপত্য ফিরিয়ে নিতে হাউছিদের আস্তানা লক্ষ্য করে ব্যাপক ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনি সেনাবাহিনী। সম্প্রতি শহরটি হাতছাড়া হওয়ার পর রিয়াদের সহযোগিতায় এই আকাশপথের অভিযান শুরু হয়, যা ‘বাব আল মান্দেব’ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অংশ। সরকারি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, মোখা-ধুবাব মহাসড়কে হাউছি সাঁজোয়া বহরে এ অভিযানে ব্যাপক প্রাণহানির পাশাপাশি সামরিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংঘাতের ফলে ইতোমধ্যে ৫০০ জনের বেশি নিহত, বহু আহত এবং সাড়ে ছেচল্লিশ হাজারের মতো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সৌদি আরব সরাসরি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ ও বিমান হামলার অনুরোধ জানালেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অতিরিক্ত যুদ্ধে জড়াতে অসম্মতি জানিয়ে সেই আবেদন ফিরিয়ে দিয়েছেন। আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, সৌদির ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ তেল পাইপলাইনে সাম্প্রতিক অন্তর্ঘাতের পেছনে তেহরানের যোগসাজশ থাকার জোরালো আশঙ্কা রয়েছে, যদিও সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো মেলেনি। তিনি আরো জানান, হাউছিরা আগেভাগেই মার্কিন বহরে হামলা না চালানোর বার্তা পাঠায়। গাজা সংঘাত নিরসনে ওয়াশিংটনের পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উল্লেখ করেন, সব বন্দী ও নিহতদের লাশ ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্র কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, আগামী নভেম্বরে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরান যুদ্ধের অবসান হতে পারে, যা তেলের বাজারে স্বস্তি ফেরাবে। তবে হরমুজ প্রণালীর সুরক্ষায় ন্যাটো ও ইউরোপীয় মিত্রদের অনীহার কড়া সমালোচনা করেন তিনি।

অন্য দিকে ইরাকের মাইসান প্রদেশ থেকে পরিচালিত ড্রোন হামলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাইপলাইনের সরবরাহ বন্ধ রেখেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। এর পরিপ্রেক্ষিতে কোনো প্রকার সামরিক পাল্টা পদক্ষেপ না নিয়ে ইরাককে নিজস্ব ভূখণ্ড সুরক্ষিত রাখার সুযোগ দিয়েছে রিয়াদ। আন্তর্জাতিক বাজারে মোট তেলের ৪ থেকে ৫ শতাংশ পরিবহন করা এই বিকল্প পথ বন্ধ হওয়া এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে উত্তেজনার ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

ইরাকের সীমানা থেকে সৌদি ভূখণ্ডে হামলা চালানোর ঘটনায় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোনে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে বাগদাদ। ঘটনার সার্বিক দায়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদি মাইসান প্রদেশের পুলিশ প্রধানকে সরিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি স্থানীয় গোয়েন্দা ও সামরিক সংস্থার পরিচালকদের বরখাস্ত করে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। প্রাথমিক ড্রোন হামলার পরিস্থিতি সামাল দেয়ার পর নিজেদের শারুরাহ, তায়েফ ও খামিস মুশাইত এলাকায় জারি করা ‘সম্ভাব্য বিপজ্জনক’ সতর্কতা প্রত্যাহার করে নিয়েছে সৌদির বেসামরিক প্রতিরক্ষা দফতর।

এই সংঘাতের জেরে আঞ্চলিক স্তরে জটিল সামরিক-কূটনৈতিক টানাপোড়েনে পড়েছে পাকিস্তান। সৌদি আরব ও তুরস্কের সাথে সম্পাদিত ‘মক্কা জোট’ চুক্তির আওতায় রিয়াদের নিরাপত্তার খাতিরে পাকিস্তানি সেনারা সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার প্রবল ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালী কেন্দ্রিক জ্বালানি বাণিজ্য ও তেহরানের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষায় সরাসরি কোনোপক্ষ না নিয়ে শান্তি আলোচনার পথ উন্মুক্ত রাখার পক্ষে মত দিয়েছে ইসলামাবাদ। ইতোমধ্যে ইয়েমেনের ভেতরে লড়াই তীব্র রূপ নিয়েছে। লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালীর কাছে কৌশলগত হেস ও আল-খাওখাহ এলাকা দখলের দাবি করেছে হাউছি বিদ্রোহীরা। এর ফলে তাইজ, আল-জাউফ ও আল-বায়দায় ইয়েমেন সরকারের সামরিক বাহিনীর সাথে হাউছিদের সংঘর্ষ নতুন মাত্রা পেয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে সানা দখলের মধ্য দিয়ে হাউছিদের যে সশস্ত্র পথচলা শুরু হয়েছিল, পরবর্তীতে ২০১৫ সালে রিয়াদের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের জোরালো অংশগ্রহণে তা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নেয়।

নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সাফ জানান, সাধারণ মানুষের খাদ্য, নিত্যপণ্য ও যাতায়াতের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে ইরানকে নতজানু করার মার্কিন ও ইসরাইলি চক্রান্ত ব্যর্থ হতে বাধ্য। এ অঞ্চলে কোনো বহির্রাগত দেশের ‘পাহারাদার’ হওয়ার প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার কাজ এ অঞ্চলের দেশগুলোরই। অন্য দিকে, আন্তর্জাতিক অভিন্ন স্বার্থ রক্ষায় মার্কিন ও ইরানের মধ্যকার এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত থামাতে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।