বিশেষ সংবাদদাতা
সরকারের আর্থিক সংস্কার ও রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতার প্রতি আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) সম্মান দেখিয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিরি বলেন, বর্তমান সরকারের আর্থিক সংস্কার বিষয়ে আইএমএফ সন্তোষ প্রকাশ করেছে এবং সংস্থাটি বাংলাদেশকে ঋণসহায়তা বাড়ানোর বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। আইএমএফকে বলা হয়েছে দেশে ধাপে ধাপে সংস্কার করা হবে। রাতারাতি কোনো কিছু করা সম্ভব নয়। তারা এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছে। গতকাল সচিবালয়ে আইএমএফের বাংলাদেশ ও হংকংবিষয়ক মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের সাথে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। দীর্ঘ এক ঘণ্টার বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী বলেন, নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে এ পর্যন্ত আলোচনায় সন্তোষজনক অগ্রগতি হয়েছে।
তিনি বলেন, আইএমএফের সাথে বাংলাদেশের নতুন কর্মসূচির ভিত্তি, বাস্তবায়নের ধাপ (সিকোয়েন্সিং) এবং সামগ্রিক নীতিমালা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নতুন কর্মসূচি কোন ভিত্তির ওপর পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে ধাপে ধাপে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। রাতারাতি বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব নয় এবং আইএমএফও এ বিষয়ে একমত।
তিনি বলেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে কোন সংস্কার কখন প্রয়োজন, সেই অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া হবে। একটি রাজনৈতিক সরকারের জনকল্যাণমূলক দায়বদ্ধতাকেও আইএমএফ গুরুত্ব দিয়েছে। জনগণের স্বার্থ অক্ষুণœ রেখেই অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকারের চার মাসের মেয়াদে আর্থিক খাতের সংস্কার, শেয়ারবাজার ও পুঁজিবাজারের উন্নয়ন এবং রাজস্ব আদায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতিতে আইএমএফ প্রতিনিধিদল সন্তোষ প্রকাশ করেছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চার মাসে রাজস্ব আদায়কে উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে দেখা হয়েছে। ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে সরকারের প্রস্তাব নিয়েও ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।
ভর্তুকির বিষয়ে তিনি বলেন, এখনো কোনো নির্দিষ্ট শর্ত বা বিস্তারিত বিষয়ে আলোচনা হয়নি। আপাতত নতুন কর্মসূচির ভিত্তি নির্ধারণ নিয়েই আলোচনা হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
অর্থমন্ত্রী আরো জানান, আইএমএফের সাথে আলোচনা একটি চলমান প্রক্রিয়া। আগামী সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার সময় এ বিষয়ে পরবর্তী আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। সরকারের সংস্কার কার্যক্রমে আইএমএফ সন্তোষ প্রকাশ করেছে এবং সেই ভিত্তিতেই ভবিষ্যৎ কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হবে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ও আইএমএফের মধ্যে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদিত হয়। অন্তর্বর্তী সরকার তা বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার করে। সেই কর্মসূচির আওতায় কয়েক দফায় ৩ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়ও পায় বাংলাদেশ। তবে বর্তমান সরকার বলছে, আগের কর্মসূচির বেশ কিছু শর্ত জনস্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। তাই সেই কর্মসূচি থেকে সরে এসে এখন নতুন কাঠামোয় আইএমএফের সাথে আলোচনা এগিয়ে নিতে চায় সরকার।
আইএমএফের বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের প্রতিনিধি দল ১৬ জুলাই পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থান করবেন। এই সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সরকারের বিভিন্ন দফতরের সাথে ধারাবাহিক বৈঠকে সামষ্টিক অর্থনীতির অবস্থা, চলমান সংস্কার কর্মসূচি এবং নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করবেন তারা। তারই অংশ হিসেবে সোমবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীর সাথে তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল বৈঠক করে।
বৈঠকে সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা, সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচি, দ্বিতীয় রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটি বা আরএসএফ, বাজেট, রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং সংস্কার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং আর্থিক খাতের সুশাসন নিয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়া আর্থিক খাত, শেয়ারবাজার সংস্কার এবং ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে সরকারের নেয়া পদক্ষেপে সন্তুষ্ট আইএমএফ। তবে কবে নাগাদ নতুন ঋণ পাচ্ছে বাংলাদেশ, তা স্পষ্ট করেননি অর্থমন্ত্রী। বর্তমান মূল্যায়নে সন্তুষ্ট হলে আইএমএফ প্রতিনিধি দল তাদের সুপারিশ ওয়াশিংটনে সদর দফতরে জমা দেবে। এরপর আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিতব্য আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার পর নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করতে আইএমএফের ভাইস প্রেসিডেন্টের প্রতিনিধিদল পুনরায় ঢাকা সফর করতে পারে। এরপরই সম্ভাব্য নতুন ঋণ হিসেবে চার থেকে সাড়ে চার বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থছাড় হতে পারে।



