- সীমান্তের ১৬২টি রুটে প্রবেশ করছে মাদকদ্রব্য
- বেছে নিচ্ছে সাগর ও আকাশ পথও
- মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে প্রায় ৯০ শতাংশ মাদক
ভারত সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় ঢুকে যাচ্ছে মাদক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর থাকলেও তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলছে এই অবৈধ কারবারি। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ২৯টি সীমান্তবর্তী জেলার প্রায় ১৬২টি রুট দিয়ে ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক ঢুকছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সীমান্তে কঠোর হওয়ার কারণে মাদককারবারিরা এখন কৌশল পাল্টে মাদক পাচার করছে। সীমান্ত থেকে বিভিন্ন পণ্যের আড়ালে গ্রাহকদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে মাদক। এ ছাড়াও সাগর এবং আকাশ পথেও মাদকের চোরাচালান আসছে। এসব মাদক আসার পর ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় পৌঁছে যায়।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, সীমান্তে মদককারবারিরা এখন কৌশল পাল্টে মাদক পাচার করছে। সাধারণত কাপড়ের গাঁট বা পশুবাহী ট্রাকে লুকিয়ে অথবা সীমান্তের কাঁটাতারহীন পয়েন্ট দিয়ে স্থানীয় পাচারকারিদের মাধ্যমে দেশে আসছে নানা ধরনের মাদক। তা ছাড়া চাল, চিনি বা সারের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারে পাচার করে তার বিনিময়ে ইয়াবা বা আইস নিয়ে আসা হয়। তারা প্রথমে সীমান্তের কাঁটাতার পার করে জঙ্গল বা পুকুরে ফেলে দেন মাদক। এরপর সময়-সুযোগ বুঝে সেখান থেকে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে পাচার করে। পাচারকারিরা ফল, চাল বা সারের বস্তা ও হলুদ-মরিচের বস্তার ভেতর লুকিয়ে, মাছ ধরার ট্রলারে, অথবা স্থানীয় ও রোহিঙ্গা বাহকদের মাধ্যমে হেঁটে বা মোটরসাইকেলে মাদক বহন করে।
সংশ্লিষ্ট সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা প্রথমে ভারতের ত্রিপুরা ও আসাম হয়ে বাংলাদেশের কুড়িগ্রামের রৌমারী-মানকাচর সীমান্ত দিয়েও ঢুকছে। এমনকি ইয়াবা কারখানার অবস্থান এখন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ (কোচবিহার ও ২৪ পরগনা), আসাম ও মেঘালয় সীমান্তেও শনাক্ত হয়েছে। ফেনসিডিলের প্রধান রুট হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সাতক্ষীরা, যশোর, দিনাজপুর এবং রাজশাহী অঞ্চলের সীমান্ত এলাকা ফেনসিডিল পাচারের জন্য বহুল ব্যবহৃত। কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া সীমান্ত এবং বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার ট্রলারে মিয়ানমার সীমান্ত এলাকা দিয়ে দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মাদক ঢুকছে। এই তিন রুট দিয়ে এবং সাগরপথ দিয়ে ঢুকছে ইয়াবা ও আইস। এ ছাড়াও হেরোইনসহ অন্যান্য মাদকের রুট হিসেবে ট্রানজিট পয়েন্ট ধরা হয়েছে রাজশাহীর গোদাগাড়ি ও চুয়াডাঙ্গার দর্শনা। সিলেটের সীমান্তের ওপারের আসাম থেকে আসে গাঁজা। ওই গাঁজা রেলপথে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার হয়।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তথ্য মতে, গত মার্চ মাসে দেশের সীমান্ত এলাকাসহ অন্যান্য স্থানে অভিযান চালিয়ে ১৬৫ কোটি ৭৬ লাখ ৭৪ হাজার টাকার বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য ও চোরাচালান পণ্য জব্দ করা হয়। জব্দকৃত মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের মধ্যে রয়েছে ১১ লাখ ২৫ হাজার ৯৭৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ৮৪৫ গ্রাম হেরোইন, ১২ বোতল এলএসডি, দুই হাজার ৪৫ বোতল ফেনসিডিল, এক কেজি ৭৯০ গ্রাম ক্রিস্টাল মেথ আইস, আটক হাজার ১২৯ বোতল বিদেশী মদ, ১৭০ দশমিক পাঁচ লিটার বাংলা মদ, দুই হাজার ৩৬৮ বোতল ক্যান বিয়ার, এক হাজার ১৩৩ কেজি ৪৫০ গ্রাম গাঁজা, এক লাখ ২৪ হাজার ৮৪০ প্যাকেট বিড়িও সিগারেট, এক লাখ ৮৩ হাজার ৬৬১টি নেশাজাতীয় ট্যাবলেট বা ইনজেকশন, চার হাজার ৬৬৫ বোতল ইস্কাফ সিরাপ, দুই হাজার ৯৬৮টি এ্যানেগ্রা বা সেনেগ্রা ট্যাবলেট এবং ৩৬ হাজার ৮৬০ পিস মদ তৈরির বড়ি ও ২১ লাখ ৪৪ হাজার ১৫২ পিস বিভিন্ন প্রকার ওষুধ বা ট্যাবলেট
এ ছাড়াও গত মাসে সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ইয়াবাসহ বিভিন্ন প্রকার মাদক পাচার ও অন্যান্য চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে ১১২ জন চোরাচালানি এবং অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের দায়ে ৮২ জন বাংলাদেশী, ৯ ভারতীয় ও ৩১৭ জন মিয়ানমার নাগরিককে আটকের পর তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়।
এ দিকে গত বুধবার কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর সীমান্ত এলাকায় গত এক বছরে উদ্ধার হওয়া প্রায় ৩১ কোটি ৩৪ লাখ টাকার বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য ধ্বংস করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বিজিবি সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে এই সীমান্ত এলাকা থেকে ১৭৫ জন আসামিসহ প্রায় ১১৪ কোটি ৮০ লাখ টাকার মাদক ও চোরাচালান পণ্য জব্দ করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিকায়নের নেতিবাচক প্রভাব, পারিবারিক-সামাজিক চাপসহ নানান কারণে তরুণদের মধ্যে হতাশা-বিষণœতা ভর করছে। এর জেরে ঘটছে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, যার চূড়ান্ত পরিণতিতে মাদকাসক্তিতেও ঝুঁকছেন অনেক তরুণ-তরুণী। দিন দিন অবসাদগ্রস্ত তরুণ-তরুণীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় বাড়ছে মাদকের চাহিদা। সেই চাহিদার জোগান দিতে বাড়ছে চোরাচালানও। এই চাহিদার প্রয়োজন মেটাতেই মাদকের ধরনও পাল্টাচ্ছে বছর বছর।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, মাদকমুক্ত দেশ গড়তে জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে। সীমান্তে দিন-রাত দায়িত্ব পালন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। মাদক শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি একটি জটিল সামাজিক সমস্যা- যা মোকাবেলায় জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণ জরুরি। সীমান্ত এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এ ধরনের কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালনা করা হবে।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) জানায়, মাদককারবারিরা তাদের কৌশল পাল্টে দেশের সীমান্তবর্তী এলাকা হতে অবৈধভাবে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্য সংগ্রহ করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করে আসছে। মাদক সমাজের সবচেয়ে ভয়াবহ বিষফোঁড়া। এটি আমাদের যুবসমাজকে ধ্বংস করছে, পরিবারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। র্যাব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, মাদক নির্মূলে জিরো টলারেন্স নীতির বাস্তবায়ন ছাড়া সমাজে শান্তি ও উন্নয়ন সম্ভব নয়। মাদকদ্রব্যের ভয়াল ছোবল থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষার লক্ষ্যে র্যাব নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে আসছে।
এ বিষয়ে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, সীমান্ত ও আকাশপথে মাদক আসা বন্ধ করতে বাংলাদেশ চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। সীমান্তে ইয়াবার চালান নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। যেহেতু সীমান্তের রুটগুলো অরক্ষিত নয়- সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন আসে, মাদকের চালান নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না কেন? নাকি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না। অনলাইন-অফলাইনে দেদার বিক্রি হচ্ছে মাদক। এভাবে চলতে থাকলে মাদক গ্রহণ ব্যক্তি পছন্দের ওপর নির্ভর হয়ে যাবে। তখন রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছুই করার থাকবে না। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে সত্যিকারের জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন ও সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কেউ কেউ মাদক কারবারে জড়ালে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।



