৪৫ বছর পর প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদনে নতুন প্রশ্ন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনা ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড। প্রায় সাড়ে চার দশক ধরে এই হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে নানা ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব আলোচনায় থাকলেও, ঘটনার পর গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দীর্ঘদিন জনসমক্ষে আসেনি। ১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বরে জমা দেয়ার ৪৫ বছর পর, দ্য ডেইলি স্টার কমিশনের উঠে আসা তথ্যগুলো প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত এই প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু নতুন করে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে আলোচনায় এনেছে। তবে প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি শুধু এতে কী বলা হয়েছে তা নয়; বরং কী বলা হয়নি, সেটিও সমান তাৎপর্যপূর্ণ।
তদন্তের পরিধি কিভাবে বদলে গেল
হত্যাকাণ্ডের মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় গঠিত বিচার বিভাগীয় কমিশনের প্রাথমিক দায়িত্ব ছিল হত্যাকাণ্ডটি কোনো বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল কি না, কারা জড়িত ছিল এবং তাদের উদ্দেশ্য কী- এসব অনুসন্ধান করা। কিন্তু কমিশন কাজ শুরু করার আগেই সরকারের নতুন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি বাদ দেয়া হয়। ফলে কমিশনের তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং ঘটনার পর রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা। অর্থাৎ, কমিশন মূল ঘটনার রাজনৈতিক বা সামরিক নেপথ্য বিশ্লেষণের পরিবর্তে কার্যত একটি প্রশাসনিক অনুসন্ধান কমিশনে পরিণত হয়।
এই পরিবর্তনই আজও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে রয়েছে- যে কমিশনকে সম্ভাব্য ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটনের দায়িত্বই দেয়া হয়নি, তার প্রতিবেদনের মাধ্যমে কি হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ সত্য জানা সম্ভব?
নিরাপত্তাব্যবস্থার ভয়াবহ ভাঙন
প্রতিবেদনটি যে বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে, তা হলো রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তাব্যবস্থার চরম অদক্ষতা ও সমন্বয়হীনতা।
সার্কিট হাউজের মূল ফটক খোলা ছিল, রাষ্ট্রপতির কক্ষের সামনে দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপত্তাকর্মীরা অনুপস্থিত ছিলেন, বৃষ্টির কারণে অনেক পুলিশ সদস্য দায়িত্বস্থল ছেড়ে আশ্রয়ে চলে যান, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি এবং গুলিবর্ষণের বড় অংশই হামলাকারীরা চলে যাওয়ার পরে করা হয়েছিল।
এ ধরনের তথ্য কেবল ব্যক্তিগত অবহেলার নয়; বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকাঠামোর মৌলিক দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। একজন রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা যদি এভাবে ভেঙে পড়ে, তাহলে সেটি বিচ্ছিন্ন কোনো ভুল নয়, বরং পুরো নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতার ইঙ্গিত বহন করে।
রাষ্ট্রপতির নিকটতম কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
কমিশনের প্রতিবেদনে রাষ্ট্রপতির কয়েকজন ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তার আচরণ নিয়ে বিস্ময় ও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে।
ব্যক্তিগত সচিবের কক্ষ বণ্টনের তালিকা সংগ্রহ, নিরাপত্তা প্রহরী সরিয়ে নেয়া, গুলির চিহ্ন নিয়ে প্রশ্ন এবং ঘটনার সময় সহায়তা চাওয়ার পরিবর্তে সময়ক্ষেপণের বিষয়গুলো কমিশনের নজরে আসে। একইভাবে এডিসির রাষ্ট্রপতির কক্ষে প্রবেশের চেষ্টা না করা কিংবা সংযোগ দরজার অস্তিত্ব সম্পর্কে অজ্ঞতার দাবি কমিশনকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কমিশন এসব আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুললেও ষড়যন্ত্র অনুসন্ধানের এখতিয়ার না থাকায় এসব সন্দেহের চূড়ান্ত অনুসন্ধান বা দায় নির্ধারণ করতে পারেনি।
গোয়েন্দা তথ্য ছিল, কিন্তু প্রতিরোধ ছিল না
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলো রাষ্ট্রপতিকে আগেই মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরের অসন্তোষ ও বিদ্রোহী মনোভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিল। কিন্তু সম্ভাব্য হামলার সময়, পদ্ধতি কিংবা প্রস্তুতি সম্পর্কে কার্যকর গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হয়নি।
এটি গোয়েন্দা ব্যবস্থার একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে। কেবল সম্ভাব্য ঝুঁকির তথ্য থাকা যথেষ্ট নয়; সেই তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়াই গোয়েন্দা কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য। এই ক্ষেত্রে সেই ব্যবস্থাই কার্যত অনুপস্থিত ছিল।
প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা
হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিক্রিয়াও কমিশনের সমালোচনার মুখে পড়ে।
স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও বেসামরিক কর্মকর্তারা নেতৃত্বহীন অবস্থায় কার্যত অপেক্ষার নীতি গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতির লাশ দীর্ঘ সময় অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে। পরে তা সামরিক বাহিনীর একটি দল সরিয়ে নেয় এবং বিদ্রোহীদের পতনের পর গণকবর থেকে লাশ উদ্ধার করা হয়।
একজন রাষ্ট্রপ্রধানের লাশের ক্ষেত্রেও যদি রাষ্ট্র এমন অগোছালো ও সমন্বয়হীন আচরণ করে, তবে তা কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতার নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সঙ্কট মোকাবেলার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
প্রতিবেদন যা বলেছে, যা বলেনি
কমিশন শেষ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের জন্য মেজর জেনারেল মঞ্জুরের ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ ও রাষ্ট্রপতির প্রতি বিদ্বেষকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। একই সাথে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তায় নিয়োজিত গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ ও প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের সমন্বয়হীনতাকেও বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তবে প্রতিবেদনের সীমাবদ্ধতাও এখানেই স্পষ্ট। কারণ কমিশনকে বৃহত্তর ষড়যন্ত্র, সম্ভাব্য পরিকল্পনাকারী, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা সামরিক অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের বিষয় অনুসন্ধানের অনুমতি দেয়া হয়নি। ফলে তদন্তে বহু প্রশ্ন উত্তরহীন থেকে গেছে।
ইতিহাসের জন্য শিক্ষা
৪৫ বছর পর এই প্রতিবেদন প্রকাশ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলেও এটি কোনো চূড়ান্ত সত্য প্রতিষ্ঠা করে না। বরং এটি দেখায়, রাষ্ট্রীয় তদন্তের পরিধি নির্ধারণই অনেক সময় ইতিহাসের ব্যাখ্যাকে প্রভাবিত করে।
প্রতিবেদনটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে নিরাপত্তাব্যবস্থার ভয়াবহ ব্যর্থতা রাষ্ট্রপতির হত্যাকাণ্ডকে সহজ করে দিয়েছিল। একই সাথে এটি মনে করিয়ে দেয়, তদন্তের মূল প্রশ্ন যদি শুরুতেই বাদ পড়ে, তাহলে একটি ঐতিহাসিক ঘটনার পূর্ণ সত্য হয়তো আর কখনোই উদ্ঘাটিত হয় না।
আজও তাই জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে গবেষণা, নথিপত্রের উন্মুক্তকরণ এবং ইতিহাসভিত্তিক নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের দাবি প্রাসঙ্গিক হয়ে রয়েছে। কারণ রাষ্ট্রের ইতিহাসে কিছু প্রশ্নের উত্তর শুধু অতীত জানার জন্য নয়, ভবিষ্যতের রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জন্যও অপরিহার্য।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, জিয়া হত্যাকাণ্ডের সময় উপস্থিত মেজর মোজাফ্ফর সম্প্রতি ঢাকা থেকে গ্রেফতার হয়েছেন।
জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার তদন্ত পুনরায় শুরু এবং ৪৫ বছর পর সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব:) মোজাফফর হোসেন গ্রেফতারের আগে ও পরে বেশ কয়েকজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা প্রকাশ্যে মতামত দিয়েছেন। তবে তাদের বক্তব্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মতপার্থক্য রয়েছে।
মেজর জেনারেল (অব:) মইনুল হোসেন চৌধুরী : মইনুল হোসেন চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে জিয়া হত্যাকাণ্ড নিয়ে গবেষণা ও স্মৃতিচারণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি করেছেন। তিনি জেনারেল আবুল মঞ্জুর হত্যার পরিকল্পনার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন- এমন ধারণা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সার্কিট হাউজে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে আটক করে সেনানিবাসে নেয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন; হত্যার পরিকল্পনা সবার জানা ছিল না।
তিনি দাবি করেন, পলাতক দুই কর্মকর্তা মেজর এস এম খালেদ ও মেজর মোজাফফর হোসেনের সাথে তার আলোচনায় তারা বলেছেন, জিয়াকে হত্যা নয়, আটক করাই উদ্দেশ্য ছিল; পরে ঘটনাস্থলে গুলিবর্ষণের মাধ্যমে পরিস্থিতি বদলে যায়। তবে এটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, আদালতে পরীক্ষিত সাক্ষ্য নয়।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মীর শওকত আলী : মীর শওকত আলী অতীতে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন : জিয়া হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কখনো হয়নি। সামরিক আদালতের বিচার দ্রুত সম্পন্ন হলেও কে পরিকল্পনাকারী এবং কারা রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছিল- এসব প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত থেকে গেছে। একটি স্বাধীন তদন্ত হলে অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
গ্রেফতার হওয়া মেজর (অব:) মোজাফফর হোসেনের সাথে সম্পর্কিত বক্তব্য : বর্তমান তদন্তে গ্রেফতার হওয়ার আগে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে তার নামে যে বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে, তার সারাংশ হলো : তিনি নাকি জানতেন জিয়াউর রহমানকে সার্কিট হাউজ থেকে বের করে আনা হবে, হত্যা করা হবে না।
হত্যার পর তিনি লাশ সরানো ও সার্কিট হাউজে তল্লাশির ঘটনায় উপস্থিত ছিলেন বলে বিভিন্ন বই ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব বক্তব্য আদালতে যাচাইকৃত সাক্ষ্য নয়; নতুন তদন্তে এগুলো যাচাই করা হতে পারে।
বর্তমান তদন্ত নিয়ে সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের সাধারণ অভিমত
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত মতামত থেকে যে বিষয়গুলো বারবার উঠে এসেছে : পূর্ণাঙ্গ বিচারিক তদন্ত প্রয়োজন, কারণ ১৯৮১ সালে মূলত সামরিক আদালতে দ্রুত বিচার হয়েছিল। ঘটনার রাজনৈতিক ও সামরিক পটভূমি পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত। সাক্ষ্য, নথি ও জীবিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
বিতর্কের মূল বিষয়
বর্তমান আলোচনায় প্রধান বিতর্কগুলো হলো : জেনারেল আবুল মঞ্জুর কি হত্যার পরিকল্পনাকারী ছিলেন, নাকি পরে পরিস্থিতির মধ্যে জড়িয়ে পড়েন? জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত কি আগে থেকেই নেয়া ছিল, নাকি ঘটনাস্থলে তা ঘটে? এই ঘটনার পেছনে কেবল কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা ছিলেন, নাকি আরো বৃহত্তর রাজনৈতিক বা সামরিক ষড়যন্ত্র ছিল?
এই প্রশ্নগুলোর চূড়ান্ত উত্তর এখনো বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। বর্তমানে চলমান তদন্তের মাধ্যমে এসব বিষয়ে নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে।



