হজের গুরুত্ব ও ফজিলত

Printed Edition
হজের গুরুত্ব ও ফজিলত
হজের গুরুত্ব ও ফজিলত

ড. ইকবাল কবীর মোহন

ইসলামের অন্যতম রুকন ও ফরজ একটি বিধান হজ। প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য জীবনে একবার হজ করা ফরজ। এ কথাই কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন এভাবে, ‘মানুষের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ওই গৃহের হজ করা তার অবশ্য কর্তব্য।’ [সূরা আলে-ইমরান : ৯৭]। হজ আরবি শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ সঙ্কল্প করা, সফর করা। পরিভাষায় নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট কার্যাবলির মাধ্যমে বাইতুল্লাহ শরিফ জিয়ারত করাকে হজ বলা হয়। হজের নির্দিষ্ট সময় হলো-আশহুরে হুরুম তথা শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজের প্রথম ১২ দিন, বিশেষত জিলহজের ৮ তারিখ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত এই পাঁচ দিন। হজের নির্ধারিত স্থান হলো পবিত্র কাবা, সাফা-মারওয়া, মিনা, আরাফা ও মুজদালিফা। হজের কার্যাবলির মধ্যে রয়েছে ইহরাম বাঁধা, তালবিয়া ও সাঈ, অকুফে আরাফাহ, অকুফে মুজদালিফা, অকুফে মিনা, কঙ্কর নিক্ষেপ, কুরবানি, হলক ও বায়তুল্লাহর তওয়াফ। হজের সফরে মদিনার রওজাতুর রাসূল যিয়ারত হজের অনুষঙ্গ । হজকে আল্লাহর রাসূল সা: উত্তম আমল বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘সর্বোত্তম আমল হলো-আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান আনা, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা এবং হজে মাবরুর তথা মকবুল হজ।’ [সহিহ বুখারি : ১৫১৯]

হজ কার ওপর ফরজ

পাঁচটি শর্তসাপেক্ষে হজ ফরজ। ১. মুসলিম হওয়া, ২. সজ্ঞান হওয়া অর্থাৎ পাগল না হওয়া, ৩. বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া, ৪. আজাদ বা স্বাধীন হওয়া ও ৫. দৈহিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হওয়া। তবে মহিলাদের বেলায় আরেকটি শর্ত হলো সাথে মাহরাম থাকা। এখানে উল্লেখ্য, কারো ওপর জাকাত ফরজ না হলেও হজ ফরজ হতে পারে। কেননা জাকাতের সম্পর্ক নির্ধারিত নিসাবের সাথে। আর হজের সম্পর্ক বাইতুল্লায় আসা-যাওয়ার খরচ বহন করার সামর্থ্যরে সাথে। তাই কেউ যদি স্থাবর সম্পত্তির কিছু অংশ বিক্রি করে হজ আদায় করে এবং হজ থেকে ফিরে বাকি সম্পত্তি দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে, তাহলে তার ওপর হজ করা ফরজ। আবার কোনো ব্যবসায়ী তার দোকানের পণ্যের কিছু অংশ বিক্রি করে যদি হজ করে এবং ফিরে এসে বাকি অংশ পণ্য দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে, তাহলে তার ওপর হজ করা ফরজ হবে।

হজের ফজিলত

হজের ফজিলত সম্পর্কে রাসূল সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হজ করল এবং এ সময় অশ্লীল ও গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকল সে নবজাতক শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসবে।’ [সহিহ বুখারি : ১৫২১]। মহানবী সা: আরো বলেন, ‘ মাবরুর হজের বিনিময় তো জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।’ [সহিহ মুসলিম : ১৩৪৯]। হজের অন্যতম একটি রুকন হলো বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করা। এই তাওয়াফের মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে গিয়ে নবীজি সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তি সাতবার বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করবে, তাতে কোনো ধরনের অনর্থক কাজ করবে না, তবে তার একটি গোলাম আজাদ করার সমপরিমাণ সওয়াব হবে।’ [তারাবানি : ৮৪৫]। হজ ও উমরার সময় হাজিরা হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামেনি স্পর্শ করার জন্য পেরেশান হয়ে যান। এ সম্পর্কে মহানবী সা: বলেন, ‘হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামেনির স্পর্শ পাপগুলোকে মুছে দেয়।’ [সুনানে তিরমিজি : ৯৫৯]। হজের রুকনের মধ্যে অন্যতম হলো ইয়াওমে আরাফাহ। আরাফার দিনে আল্লাহ তায়ালা মুমিনের গুনাহ মাফ করে দেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্ত করেন। এ প্রসঙ্গে রাসূল সা: বলেন, ‘আরাফার দিন অপেক্ষা এমন কোনো দিন নেই যেদিন আল্লাহ তায়ালা অত্যধিক পরিমাণে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করেন এবং তিনি নিকটবর্তী হন। আর ফেরেশতাদের নিকট তাদেরকে নিয়ে গর্ব করেন।’ [সহিহ মুসলিম : ১৩৪৮] হজ করতে বিলম্ব না করা

যে ব্যক্তি হজ করার ইচ্ছা করে তাকে সেই ইবাদত তাড়াতাড়ি করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। মহানবী সা: বলেছেন, ‘যে কোনো সময় সে অসুস্থ হয়ে যেতে পারে বা এমন কোনো বাধা বা বিপদ-আপদ আসতে পারে তার ফলে হজ সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে যেতে পারে।’ [মুসনাদে আহমদ : ১৮৩৩]। হজরত আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত হাদিসে নবীজি সা: বলেন, ‘ফরজ হজ আদায়ে তোমরা বিলম্ব কর না। কারণ, তোমাদের কারো জানা নেই তোমাদের পরবর্তী জীবনে কী ঘটবে।’ [সুনানে বায়হাকি : ৩৪০]।

হজ না করার পরিণাম

সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কেউ হজ সম্পন্ন না করলে তার ভয়াবহ পরিণামের কথা বলা হয়েছে। আল্লাহর রাসূল সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তি হজ করার সামর্থ্য রাখে, তবুও সে হজ করে না, সে ইহুদি হয়ে মৃত্যুবরণ করল কি খ্রিষ্টান হয়ে, তার কোনো পরোয়া আল্লাহর নেই।’ [ইবনে কাসির : ৫৭৮]

হজের পর্যায়ক্রমিক বিবরণ

৮ জিলহজের আগের কাজ : মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধা। কাবাঘরে উমরার তাওয়াফ করা। সাঈ করা ও চুল কেটে হালাল হওয়া।

প্রথম দিন : ৮ জিলহজ

নিজ বাসস্থান থেকে ইহরাম বেঁধে হজের নিয়তে সূর্যোদয়ের পর মিনায় রওনা হওয়া। মিনায় অবস্থান। সেখানে জোহর, আসর, মাগরিব, এশা ও ফজরের নামাজ আদায় করা।

দ্বিতীয় দিন : ৯ জিলহজ

১. সূর্যোদয়ের পর আরাফাতের ময়দানের দিকে রওনা করা। ২. জোহরের প্রথম ওয়াক্তে জোহর আদায় করা। ৩. সূর্যাস্তের পর মুজদালিফায় রওনা করা। সেখানে মাগরিব ও এশার নামাজ পরপর আদায় করা। ৪. মুজদালিফায় রাত যাপন করে প্রথম ওয়াক্তে অন্ধকার থাকতেই ফজর পড়া। ৫. আকাশ ফর্সা হওয়া পর্যন্ত কেবলামুখী হয়ে হাত তুলে দীর্ঘ সময় দোয়া ও মুনাজাতে মশগুল থাকা। ৬. বড় জামরায় নিক্ষেপের জন্য সাতটি কঙ্কর এখান থেকে কুড়ানো।

তৃতীয় দিন : ১০ জিলহজ

মিনায় : ১. বড় জামরায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করা। ২. কুরবানি করা। ৩. চুল কাটা। অতঃপর ইহরামের কাপড় বদলিয়ে সাধারণ পোশাক পরিধান করা। মক্কায় : ৪. তাওয়াফে ইফাদা করা। এদিন না পারলে এটি ১১ বা ১২ তারিখ করা যেতে পারে এবং সাথে সাঈও করা।

চতুর্থ ও পঞ্চম দিন : ১১ ও ১২ জিলহজ [আইয়ামে তাশরিক]

মিনায় [১ম দিন] : ১. দুপুরের পর ধারাবাহিকভাবে প্রথমে ছোট, মধ্যম ও এর পর বড় জামরায় প্রত্যেকটিতে সাতটি করে কঙ্কর নিক্ষেপ করা। ২. মিনায় রাত যাপন। দ্বিতীয় দিন : মিনায় : আগের নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে ছোট, মধ্যম ও এরপর বড় জামরায় প্রত্যেকটিতে সাতটি করে কঙ্কর নিক্ষেপ করা। দুপুরের আগে পাথর নিক্ষেপ না করা। ২. সূর্যাস্তের আগে মিনা ত্যাগ করা।

১৩ জিলহজ [আইয়ামে তাশরিক]

মিনায় : যারা গত রাতে মিনায় কাটাবেন তারা এদিন দুপুরের পর আগের দিনের নিয়মে সাতটি করে মোট ২১টি কঙ্কর মারবেন। অতঃপর মিনা ত্যাগ করবেন।

অতঃপর

মক্কা : দেশে ফেরার আগে বিদায়ী তাওয়াফ সম্পন্ন করবেন। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের মধ্যে যারা সামর্থ্যবান তাদের সবাইকে যথাসময়ে ও যথা নিয়মে হজ পালন করার তৌফিক দান করুন।