বই মেলায় ২৩টি বিষয়ভিত্তিক বইয়ের মধ্যে গতকাল পর্যন্ত নতুন প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৭৫৮টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কবিতার বই প্রকাশ পেলেও দুই বিষয়ে রচনাবলী ও গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে নতুন কোনো বই প্রকাশ হয়নি। আর মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা, অভিধান ও সায়েন্স ফিকশন নিয়ে মাত্র একটি করে নতুন প্রকাশনা এসেছে। তবে অন্যান্য ক্যাটাগরি একাধিক বই প্রকাশ পেয়েছে।
গতকাল বেলা ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত ছিল শিশু প্রহর। মেলার প্রবেশপথ খুলে দেয়ার পর থেকেই শিশুদের কলকাকলিতে মুখর ছিল পুরো প্রাঙ্গণ। শিশু-কিশোরদের প্রাণচাঞ্চল্যে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। বেলা বাড়ার সাথে সাথে শিশুদের উচ্ছ্বাস আর কলকাকলিতে মুখর হয়ে মেলার শিশুপ্রহর প্রাঙ্গণ। ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা, প্রিয় চরিত্রের গল্প আর নানা আয়োজন ঘিরে ছোটদের আনন্দে মুখর হয়ে ওঠে বইমেলা।
মেলা ঘুরে দেখা যায় শিশুপ্রহর উপলক্ষে মেলার নির্ধারিত মঞ্চে আয়োজিত গল্প বলা, ছড়া আবৃত্তি নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে অনেক শিশু। আবার আর বই কেনার সাথে চিত্রঙ্কন প্রতিযোগিতা আর পাপেট শো দেখতে কেউ মগ্ন। নিজের পছন্দের লেখকের বই সন্ধানে স্টলে থাকা বই উল্টেপাল্টে দেখছে। এক স্টল থেকে ছুটে যাচ্ছে অন্য স্টলে। তবে গতবারের মতো এবারো বইমেলায় নেই সিসিমপুরের জনপ্রিয় চরিত্রগুলো।
গতকাল মেলায় নতুন বই জমা পড়েছে ১৮৫টি। লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন মুস্তাফা মজিদ। বিকেল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন মিনহাজুল হক।
অমর একুশে উদযাপনের অংশ হিসেবে বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে শিশু-কিশোর সঙ্গীত প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় জন্মশতবর্ষ : নূরজাহান বেগম শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইসরাইল খান। আলোচনায় অংশ নেন সোহরাব হাসান। সভাপতিত্ব করেন লুভা নাহিদ চৌধুরী।
ইসরাইল খান বলেন, বাংলা ভাষায় প্রকাশিত সাময়িক সাহিত্যের ইতিহাসে নারী সম্পাদকের নেতৃত্বে সুদীর্ঘকালব্যাপী পরিচালিত ও প্রকাশিত দু-একটি পত্রিকার নাম ইতিহাসে উজ্জ্বলরূপে চিরজাগরুক থাকলেও ‘সাপ্তাহিক বেগম’ এর তুলনা পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের সমাজ রাজনীতি অর্থনীতি তথা সার্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ও উন্নয়নের ইতিহাসে এই পত্রিকা যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছে। এই পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে মহীয়সী নূরজাহান বেগমের নামও সমমর্যাদায় উচ্চারিত হবে। তার বহুমুখী তৎপরতায় নারীর সার্বিক কল্যাণমূলক বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও গড়ে উঠেছিল। শিক্ষিত, সচেতন নারীরা যদি নূরজাহান বেগমকে অনুসরণ করে নারীসমাজের সার্বিক কল্যাণে এগিয়ে আসেন, তবে সেই দিন বেশি দূরে নয় যেদিন বাংলার নারীদের মুখে অমলিন হাসি ফুটে উঠবে।
আজ মেলা শুরু হবে বেলা ২টায়, চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে আসাদ চৌধুরী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন কুদরতই হুদা। আলোচনায় অংশ নেবেন সৈকত হাবিব। সভাপতিত্ব করবেন সৈয়দ আজিজুল হক। বিকেল ৪টায় রয়েছে
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
প্রথমা প্রকাশন নিয়ে এসেছে কবি আল মাহমুদের ‘তিন শহর তিন আকাশ’। কবি হিসেবে আল মাহমুদ যেমন স্বদেশ বাংলার আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছেন, তেমনি পৃথিবীর নানা দেশও ভ্রমণ করেছেন। মূলত কবিতা পাঠের আমন্ত্রণ পেয়েই ছিল সেসব ভ্রমণ। ১৯৮৮ থেকে ২০০২- এই দেড় দশকে তিনি যেমন পাশের দেশ ভারত, তেমনি ইউরোপের ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স সফর করেন। সফরকালে সেসব দেশের নৈসর্গিক সৌন্দর্য এবং ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নানা নিদর্শন তার পরিব্রাজক সুলভ সংবেদী হৃদয়কে উদ্বেলিত করেছে। সেখানকার শিল্প-সাহিত্য ও সমাজ-সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গের সাথে তার পরিচয় ঘটেছে। পরিচিত হয়েছেন তিনি সেখানকার কবি-শিল্পী-চিন্তকসহ নানা পেশার মানুষের সাথে। সেসব অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি লিখেছেন কবিতার জন্য বহুদূর, কবিতার জন্য সাতসমুদ্র এবং কবিশিল্পীদের মাতৃভূমি প্যারিস নামে তিনটি অনুপম ভ্রমণকাহিনী। এই বই কবির সেই তিন ভ্রমণ কাহিনীরই একত্রিত সংকলন। ভ্রমণ অভিজ্ঞতার বয়ান প্রধান হলেও লেখার ফাঁকেফাঁকে কবি আপন দেশের সংস্কৃতি, এমনকি তার নিজেকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্ক নিয়েও নিঃসংকোচে কথা বলেছেন। পাঠকের জন্য যা হবে বইটি পাঠের এক অতিরিক্ত আকর্ষণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘বক্তৃতা সমগ্র’ কথাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বই, যেখানে তার বিভিন্ন সময়ের ভাষণ, বক্তৃতা ও প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। তার বক্তৃতা ও লেখায় সাহিত্য, রাজনীতি, সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ এবং মানবতাবাদের ওপর তীক্ষè বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। বইগুলো রকমারি, ওয়াফিলাইফ ও বইঘরের মতো অনলাইন লাইব্রেরিতে পাওয়া যায়। মার্ক্সবাদী দর্শনে বিশ্বাসী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বক্তৃতায় পুঁজিপতিদের শোষণ, প্রতিরোধ, মানবিক সমাজ এবং জাতীয়তাবাদী চেতনা ফুটে ওঠে। তিনি বাংলা সাহিত্য, সাহিত্যের নির্মাণ-প্রকৌশল এবং সমসাময়িক সাংস্কৃতিক ইস্যু নিয়ে বিশ্লেষণাত্মক বক্তব্য রেখেছেন। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে (যেমন- স্বাধীনতা দিবস) স্মৃতিচারণমূলক বক্তৃতা। বইঘর বা রকমারি থেকে তার এই বক্তৃতা ও প্রবন্ধের বইগুলো কেনা যেতে পারে।
ঐতিহ্য প্রকাশনী নিয়ে এসেছে ‘জুলাই রেকর্ডস’। এর সম্পাদনা করেছেন কাজী ওয়ালী উল্লাহ, সুলাইম মাহমুদ। মূল্য : ৫৪০ টাকা। এই বইয়ে আমাদের নেয়া মোট আড়াইশোরও বেশি ইন্টারভিউর মধ্যে ১৭টা শহীদ পরিবার, আহত ও প্রত্যক্ষদর্শীর ইন্টারভিউ সংকলিত হয়েছে। এর মধ্যে আছে এখনো শহীদের স্বীকৃতি না পাওয়া ‘রোহিঙ্গা’ নূর মোস্তফা। ঐতিহাসিক ১৬ জুলাইয়ের চট্টগ্রামের তিনজন শহীদের দু’জন, শহীদ ফারুক ও ফয়সাল আহমেদ শান্ত। যেই তারিখ আর স্পটগুলা পুরা জুলাইয়েই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রোল প্লে করছে, এর প্রায় সবগুলার কোনো না কোনো শহীদ বা আহতের ইন্টারভিউ রাখা হয়েছে। এই কারণে পুরা অভ্যুত্থানেরই একটা ওভারভিউ এই বই থেকে পাওয়া পাঠকের পক্ষে সম্ভব।
ও আকাশ ও বিহঙ্গ। লেখক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু, মূল্য ৬৪০ টাকা। পেশাগত দায়িত্ব পালন, পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বেশ কিছু দেশে লেখকের যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। কাউকে যদি ভ্রমণের নেশায় পেয়ে বসে, তাকে ঘরে আটকে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা স্বাধীনভাবে ভ্রমণের বড় প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেছে। এক দেশের নাগরিক আরেক দেশে যেতে চাইলে তাকে উভয় রাষ্ট্রের আইন ও বিধিব্যবস্থা অনুসরণ করতে হয়। ভ্রমণের ইচ্ছা জাগলেও হুট করে কোথাও যাওয়া যায় না। তা ছাড়া মানুষের জীবন এখন জটিল হয়ে পড়েছে।
বর্তমান প্রজন্মের কেউ যখন এই ভ্রমণবৃত্তান্ত পাঠ করবেন, তাকে খেয়াল রাখতে হবে যে লেখকের অধিকাংশ ভ্রমণের সময়কালে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট প্রযুক্তি, ই-মেইল, ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, গুগল, ইয়াহু, জিপিএস ইত্যাদি ছিল না। সেই পিছিয়ে থাকা সময়ের চিত্র এ সময়ে কল্পনা করে কেউ যদি পেছনের সময়কে বুঝতে চান, তার কাছে এই ভ্রমণকাহিনী উপভোগ্য হতে পারে। বাংলাদেশের ও সমকালীন সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত প্রতিভাবান ব্যক্তিদের মধ্যে আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। বইটি যেকোনো রসজ্ঞ পাঠককেই অনেক অজানা বিষয়ের স্বাদ গ্রহণে সহায়তা করবে।


