১৫ বছরে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ৭০ শতাংশই শেয়ারের প্রস্তাবকৃত দর ধরে রাখতে পারেনি

নাসির উদ্দিন চৌধুরী
Printed Edition

দেশের পুঁজিবাজারে বিগত ১৫ বছর ধরে যে সব কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে তার মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ কোম্পানিই প্রাথমিক গণ প্রস্তাবে প্রস্তাবকৃত দর ধরে রাখতে পারেনি। এমনকি এসব কোম্পানির বেশির ভাগই এখন দুই পুঁজিবাজারে মৌলভিত্তির বিচারে সবচেয়ে খারাপ ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে লেনদেন হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে আসা কোম্পানি যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিও।

পুঁজিবাজারে কোম্পানির তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে সাধারণত দু’টি পদ্ধতিই অনুসরণ করা হয়ে থাকে। একটি ফিক্সড প্রাইস সিস্টেম এবং অপরটি বুক বিল্ডিং সিস্টেম। সাধারণ বিচারে ভালো কোম্পানিগুলো বাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে যাতে কোম্পানির উদ্যোক্তরা তাদের কোম্পানির শেয়ারের ন্যায্য দাম পান সে লক্ষ্যেই যোগ্য বিনিয়োগকারীদের বিডিংয়ের মাধ্যমে কোম্পানির শেয়ারের দাম নির্ধারণ করে থাকেন। স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা হয় বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ, মার্চেন্ট ব্যাংক ও মিউচুয়াল ফান্ডের সম্পদ ব্যবস্থাপকদের মতো অভিজ্ঞ এসব যোগ্য বিনিয়োগকারীরা বিডিং পদ্ধতিতে কোম্পানির শেয়ারের যে দর নির্ধারণ করে থাকেন সেসব কোম্পানি অবশ্যই মৌলভিত্তিসম্পন্নই হবে এবং এসব কোম্পানির ভবিষ্যৎ ভালো হবে। কারণ কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দর নির্ধারণে নিশ্চয়ই কোম্পানির অতীত ইতিহাস জেনেই তারা তাতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।

কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন । দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে ২০১০ সাল থেকে ২০২৪ সালে পুঁজিবাজার বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে মোট ২২টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয় যেগুলোর হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বাকিগুলো প্রথমিক গণ প্রস্তাবের দর ধরে রাখতে পারেনি। আবার কয়েকটি কোম্পানি ভালো লভ্যাংশ দিলেও বাজার পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন সময় দর হারিয়েছে। কিছু কিছু কোম্পানি বাজারে ১০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করে কোনভাাবে টিকে আছে। আবার কিছু কোম্পানি লভ্যাংশ দিতে না পেরে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে গেছে। এগুলোর মধ্যে এমন কোম্পানিও রয়েছে যেগুলো বিনিয়োগকারীরা প্রতিটি শেয়ার ৭২ টাকায় কিনলেও এ মুহূর্তে ‘জেড’ গ্রুপে ২৪ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। আবার কোনো কোনো কোম্পানি শেয়ারের অভিহিত মূল্যও ধরে রাখতে পারছে না।

অন্য দিকে ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে দুইভাবে কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। একটি অভিহিত মূল্যে। অর্থাৎ দশ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারের দর প্রস্তাব করা হয় দশ টাকা। অন্যটি উদ্যোক্তরা অভিহিত মূল্যে শেয়ার বিক্রি না করে অভিহিত মূল্যের সাথে কিছু প্রিমিয়াম নিয়ে দর প্রস্তাব করা হয়। বিনিয়োগকারীরা সেই নির্ধারিত দরেই শেয়ার কেনেন। এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থাই কোম্পানির আর্থিক অবস্থা যাচাই বাছাই করে প্রিমিয়ার নির্ধারণ করেন। ২০১১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে ১১০টির বেশি কোম্পানি পুঁজিাবাজরে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে কমপক্ষে ৩৫টি কোম্পানি বর্তমানে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে লেনদেন হচ্ছে। বাকি ৩৫টি কোম্পানি বিনিয়োগকারিদের নামমাত্র লভ্যাংশ প্রদান সাপেক্ষে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে লেনদেন হচ্ছে।

তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় তা হলো কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্তির আগে এগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ভালো দেখানো হলেও তালিকাভুক্তির পর বছর না যেতেই কোম্পানিগুলো লোকসানের শিকার হয়। আর্থিক প্রতিবেদনে উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে এটাই প্রকাশ করা হয়। এভাবে সময়ের সাথে সাথে কোম্পানিগুলো দিনদিন দুর্বল হতে থাকে। একপর্যায়ে দেখা যায় কোম্পানিগুলোর উৎপাদন পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। আর বিনিয়োগকারীরা এসব কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে মারাত্মকভাবে প্রতাািরত হন।

আবার ফিক্সড প্রাইস বা বুক বিল্ডিং উভয় পদ্ধতিতেই কোম্পানিগুলো যে পরিমাণ শেয়ারবাজারে ছাড়ে তার একটি বড় অংশই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা পেয়ে থাকেন। লেনদেন শুরুর দিন থেকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তারা এ শেয়ার বিক্রি করার সুযোগ পান। যত দিন এসব প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর হাতে শেয়ার থাকছে তত দিনই শেয়ারের দর একটি যৌক্তিক অবস্থানে থাকে। যখন তাদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি হয়ে যায় তখন কমতে শুরু করে শেয়ারদর।

এ ছাড়া বিগত সরকারের আমলে কয়েকটি কোম্পানির তালিকাভুক্তিতে নেককারজনকভাবে সরকারের প্রভাবকে কাজে লাগানো হয়। বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে ও ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে বড় প্রিমিয়াম নিয়ে আসা এসব কোম্পানির সব ক’টিই এখন ‘জেড’ গ্রুপে কোনভাবে টিকে রয়েছে।

কোনো কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকাটি রাখে মার্চেন্ট ব্যাংক। তারাই কোম্পানির ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে কাজ করে থাকে। কিন্তু মান সম্পন্ন ইস্যু ম্যানেজ করা মার্চেন্ট ব্যাংক খুব একটা নেই বললেই চলে। কারণ দেশে মার্চেন্ট ব্যাংকার হিসেবে শীর্ষ তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানির হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া বেশির ভাগই পরবর্তিতে দুর্বল কোম্পানিতে পরিনত হয়েছে। এমনো ঘটেছে বহুজাতিক কোম্পানি হিসেবে বড় প্রিমিয়াম নিয়ে বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিও এখন লভ্যাংশ দিতে পারছে না।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন, দেশের পুঁজিবাজারের সাথে যেসব স্টেকহোল্ডাররা জড়িত তাদের মধ্যে স্বচ্ছতার প্রচণ্ড অভাব রয়েছে। পুঁজিবাজারকে সবাই যেকোনো মূল্যে টাকা বানানোর হাতিয়ার হিসাবেই নিয়েছেন। উদ্যোক্তরা যেন তেনভাবে শেয়ার ছেড়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। ইস্যু ম্যানেজাররা কোনো বাছবিচার ছাড়াই শুধু নিজেদের প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে আঁস্তাকুড়ের কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করতে সহায়তা করছেন। যত দিন পুঁজিবাজারের সাথে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো যার যার জায়গা থেকে নিজেদের কাজটি সঠিক ও স্বচ্ছভাবে না করবে তত দিন পুঁজিবাজার থেকে ভালো কিছু আশা করা যাবে না।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রয়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, বিগত সময়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে অনুসৃত দুই পদ্ধতিতেই অনিয়ম হয়েছে। বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে বিডিংয়ে অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলো কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের চাইতে উদ্যোক্তাদের দ্বারাই বেশি প্রভাবিত হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা অযৌক্তিক দরও প্রস্তাব করেছে। সেখানে কোনো স্বচ্ছতা ছিল না। ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির পক্ষ থেকে একই ঘটনা ঘটানো হয়েছে। ফলে কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্তির পর অনেক ক্ষেত্রে মার্জিন রুলকে ব্যবহার করে শেয়ার ধারণ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সাময়িক অযৌক্তিকভাবে মূল্যবৃদ্ধি ঘটালেও একটি সময়ের পর প্রস্তাবিত দর ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, নতুন আইপিও রুলস এ এসব বিষয় বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। যদি তা ঠিকভাবে পরিপালন সম্ভব হয় তাহলে তালিকাভুক্তিতে কিছুটা হলেও স্বচ্ছতা আসবে।

পুবালি ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী আহসান উল্যা বলেন, নতুন আইপিও রুলস এ তালিকাভুক্তিতে আগ্রহ প্রকাশ করা কোম্পানির আর্থিক স্বচ্ছতার পাশাপাশি ইস্যু ম্যানেজারদের স্বচ্ছতা ও নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে তা পুরোপুরি স্পষ্ট হবে যখন এটি কার্যকর হবে। তা ছাড়া এখানে সবচাইতে যেটি বেশি প্রয়োজন তা হলো বিনিয়াগকারিদের স্বার্থসংরক্ষন করা। এক্ষেত্রে পুঁজিবাজারে কর্তৃপক্ষ ও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার যেমন ভূমিকা রয়েছে তেমনি বিনিয়োগকারীদেরও নিজেদের বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে কোম্পানির সার্বিক অবস্থা মাথায় রাখতে হবে। হুজুগে বা গুজবের দ্বারা তাড়িত হওয়া যাবে না। নিজেদের পুঁজি সুরক্ষার দায়িত্ব নিজেদেরই নিতে হবে। তা না হলে বরাবরের মতো সবাইকে পথে বসতে হবে।