শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় তাদের নেগেটিভ ইকুইটির পরিমাণ বাড়ছে। এর ফলে এসব কোম্পানির বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশনও বেড়ে এখন তিন হাজার ৬৬৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এতে একদিকে কোম্পানিগুলোর আর্থিক সঙ্কট স্পষ্ট হচ্ছে, অন্য দিকে বাজারে ঝুঁকি ও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগও বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্বল কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থার উন্নতি এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত না হলে এই চাপ আরো বাড়তে পারে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের পুঁজিবাজারে ২০১০-১১ সালের ধসের পর সৃষ্টি হওয়া নেগেটিভ ইকুইটির দীর্ঘস্থায়ী সঙ্কট এখনো পুরোপুরি কাটেনি। তবে সম্ভাব্য ক্ষতির ঝুঁকি মোকাবেলায় ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো উল্লেখযোগ্য হারে প্রভিশন বাড়িয়ে তাদের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের ৩০ মে পর্যন্ত নেগেটিভ ইকুইটির বিপরীতে মোট প্রভিশনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে ছিল দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র ১৮ মাসে এ খাতে প্রভিশন বেড়েছে প্রায় ৩৬ শতাংশ। যদিও একই সময়ে নেগেটিভ ইকুইটির মোট বকেয়া দায়ও বেড়েছে, যা ইঙ্গিত করছে যে আর্থিক সুরক্ষা বাড়লেও মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনো হয়নি।
বিএসইসির প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) আওতাধীন ১৪৬টি ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংক সম্মিলিতভাবে ১৬ হাজার ৪১ কোটি টাকার মার্জিন ঋণ বিতরণ করেছে। এর মধ্যে মূল ঋণের স্থিতি রয়েছে সাত হাজার ৮২০ কোটি টাকা এবং জমাকৃত সুদের পরিমাণ দুই হাজার ৭২৭ কোটি টাকা। এমন পরিস্থিতিতে নেগেটিভ ইকুইটির সাথে সংশ্লিষ্ট মোট বকেয়া দায় দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা। একই সাথে অবাস্তবায়িত ক্ষতির পরিমাণ রয়েছে চার হাজার ৪৩ কোটি টাকা, যা দীর্ঘদিন ধরে বাজারে মন্দাভাব এবং অনাদায়ী মার্জিন হিসাবের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নেগেটিভ ইকুইটি এমন একটি পরিস্থিতি, যখন মার্জিন ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা শেয়ারের বর্তমান বাজারমূল্য ঋণের বকেয়া অর্থের চেয়ে কমে যায়। এতে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্ভাব্য ক্ষতির ঝুঁকি বহন করতে হয়। বর্তমানে দেশে সক্রিয় বেনিফিশিয়ারি ওনার (বিও) হিসাব রয়েছে প্রায় ১৪ লাখ ১০ হাজার। এর মধ্যে মার্জিন হিসাবের সংখ্যা এক লাখ ৩১ হাজার ৫২৪টি। এসব হিসাবের মধ্যে ৩৬ হাজার ৬১০টি এখনো নেগেটিভ ইকুইটির আওতায় রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ২৮ শতাংশ মার্জিন হিসাব এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সঙ্কটের সূচনা ২০১০-১১ সালের শেয়ারবাজার ধসের সময়। ওই সময় বাজারে অতিরিক্ত তারল্য প্রবাহের কারণে ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো ব্যাপকহারে মার্জিন ঋণ বিতরণ করেছিল। অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে ঋণ দেয়া হয় এবং কিছু শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতেও এসব ঋণ ভূমিকা রাখে। বাজার ধসে শেয়ারের দাম দ্রুত কমে যাওয়ার পর বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারী ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হন এবং সৃষ্টি হয় নেগেটিভ ইকুইটির। এরপর বাজার ঘুরে দাঁড়াবে এই আশায় অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধক রাখা শেয়ার বিক্রি না করে বছরের পর বছর ধরে ঋণ সমন্বয় স্থগিত রাখে। কিন্তু বাজার প্রত্যাশিতভাবে পুনরুদ্ধার না হওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ ক্রমেই বেড়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, গত দেড় দশকে বিএসইসি অন্তত ছয়বার নেগেটিভ ইকুইটি সমন্বয়ের সময়সীমা বাড়িয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি মন্দা বাজারের কারণে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রভিশন সম্পন্ন করতে পারেনি। পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২৪ সালে কমিশন আবারো সময় বাড়ায়। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এক থেকে দুই বছর সময় দেয়া হয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে ২০৩০ কিংবা ২০৩২ সাল পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছে। একই সাথে বাড়তি সময় পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি তিন মাস অন্তর অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সর্বশেষ তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রভিশন বাড়লেও নেগেটিভ ইকুইটির মোট বকেয়া কমেনি। ২০২৪ সালের অক্টোবরে যেখানে এ দায় ছিল ১০ হাজার ৫২০ কোটি টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ১০ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৪৫৮ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্য দিকে একই সময়ে প্রভিশন বেড়েছে প্রায় ৯৬৮ কোটি টাকা। এতে বোঝা যায়, প্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে আর্থিক সুরক্ষা বাড়ালেও মূল সমস্যার সমাধান এখনো হয়নি।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রভিশন বৃদ্ধি অবশ্যই ইতিবাচক। কারণ এর ফলে ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের আর্থিক বিবরণী আরো বাস্তবসম্মত হয় এবং সম্ভাব্য ঋণ ক্ষতি মোকাবেলার সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তবে এটি কোনোভাবেই নেগেটিভ ইকুইটির স্থায়ী সমাধান নয়। বরং এটি ভবিষ্যৎ ক্ষতি মোকাবেলার জন্য আগাম প্রস্তুতি মাত্র।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সাবেক সভাপতি সায়েদুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, নেগেটিভ ইকুইটির প্রভাব শুধু পুঁজিবাজারেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের অধিকাংশ মার্চেন্ট ব্যাংক ও বড় ব্রোকারেজ হাউজের মূলধনের উৎস বাণিজ্যিক ব্যাংক হওয়ায় এ সঙ্কট ব্যাংকিং খাতেও চাপ সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী মার্জিন ঋণ আটকে থাকায় নতুন বিনিয়োগে অর্থায়নের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। একই সাথে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে অতিরিক্ত প্রভিশন রাখার কারণে প্রতিষ্ঠানের মুনাফাও কমে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, নেগেটিভ ইকুইটি এখন দেশের পুঁজিবাজারের অন্যতম বড় কাঠামোগত দুর্বলতা। এ কারণে বাজারে নতুন বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিএসইসি ইতোমধ্যে বিষয়টিকে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সহযোগিতা চেয়েছে, যাতে স্থায়ী সমাধানের পথ বের করা যায়। তবে এখনো কার্যকর কোনো নীতিগত সমাধান বাস্তবায়ন হয়নি।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নেগেটিভ ইকুইটির স্থায়ী সমাধানে শুধু প্রভিশন বাড়ানো যথেষ্ট নয়। দীর্ঘদিনের অনাদায়ী মার্জিন ঋণ পুনরুদ্ধার, ঝুঁকিভিত্তিক মার্জিন ঋণ নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাজারে তারল্য ফিরিয়ে আনা এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানির মানোন্নয়ন জরুরি। পাশাপাশি বাজারে স্বচ্ছতা, সুশাসন ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন ছাড়া এ সঙ্কট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। তারা বলছেন, ১৬ বছর ধরে বহন করা এই নেগেটিভ ইকুইটির বোঝা কমাতে সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যাংক, মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজের সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায় দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।



