পণ্যের ন্যায্য মূল্য ও কৃষকের মর্যাদা ফেরানোর অঙ্গীকার জামায়াতের

দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর ভিত্তি কৃষি। দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে যুক্ত হলেও দীর্ঘদিন ধরে কৃষকের ন্যায্যমূল্য, উৎপাদন ব্যয়বৃদ্ধি, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য এবং কৃষিপণ্যের আমদানি নির্ভর নীতির কারণে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছেন। এ বাস্তবতায় আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ কৃষিখাত ও কৃষকের কল্যাণকে তাদের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর ভিত্তি কৃষি। দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে যুক্ত হলেও দীর্ঘদিন ধরে কৃষকের ন্যায্যমূল্য, উৎপাদন ব্যয়বৃদ্ধি, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য এবং কৃষিপণ্যের আমদানি নির্ভর নীতির কারণে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছেন। এ বাস্তবতায় আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ কৃষিখাত ও কৃষকের কল্যাণকে তাদের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছে।

দলটির ঘোষিত নীতিপত্র ও বিভিন্ন বক্তব্যে কৃষিকে কেবল উৎপাদন খাত হিসেবে নয়; বরং খাদ্য সার্বভৌমত্ব, গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখার কথা বলা হয়েছে।

ন্যায্যমূল্য ও সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার সংস্কার : জামায়াতের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম প্রধান দিক হলো কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। দলটি বলছে, ধান, গম, ভুট্টা, আলু, পেঁয়াজসহ প্রধান কৃষিপণ্যে উৎপাদন খরচ নিরূপণ করে তার ওপর ন্যূনতম লাভ যুক্ত করে সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হবে।

এ ছাড়া কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা জোরদার, ডিজিটাল কৃষক নিবন্ধনের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে ফসল সংগ্রহ এবং মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভরতা কমানোর প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

কৃষি উপকরণে ভর্তুকি ও সহজ প্রাপ্যতা : সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ ও ডিজেলের উচ্চমূল্য কৃষকের বড় সঙ্কট হিসেবে চিহ্নিত করে জামায়াত বলছে- মানসম্মত সার ও বীজের সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে; কৃষি উপকরণে লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি দেয়া হবে, যাতে প্রান্তিক ও ছোট কৃষক অগ্রাধিকার পান এবং নকল ও ভেজাল বীজ-সার সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কৃষিঋণ ও সুদমুক্ত অর্থায়ন : জামায়াতের ঘোষণায় কৃষিঋণ ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। দলটি দাবি করছে প্রকৃত কৃষকের জন্য সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে কৃষিঋণ; ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের ক্ষেত্রে সুদমুক্ত বা অংশিক সুদমুক্ত ঋণ ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং ঋণ খেলাপি নয়; বরং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য পুনঃতফসিল ও প্রণোদনার ব্যবস্থা।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও কৃষি বীমা : জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও ঘূর্ণিঝড় কৃষিতে বড় ঝুঁঁকি হয়ে উঠেছে। এ প্রেক্ষাপটে জামায়াত বলছে ধাপে ধাপে কৃষি বীমা ব্যবস্থা চালু করা হবে; দুর্যোগ-পরবর্তী ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে এবং উপকূল ও হাওর অঞ্চলের জন্য আলাদা কৃষি কৌশল গ্রহণ করা হবে।

কৃষি গবেষণা ও প্রযুক্তির ব্যবহার : জামায়াতের প্রতিশ্রুতিতে কৃষি গবেষণা জোরদারের কথা রয়েছে। উচ্চ ফলনশীল ও জলবায়ু-সহনশীল জাত উদ্ভাবন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কৃষকের কাছে আধুনিক প্রযুক্তি পৌঁছে দেয়ার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া তরুণদের কৃষিতে আগ্রহী করতে অ্যাগ্রো-উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর কথা বলা হয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তা ও আমদানি নির্ভরতা কমানো : জামায়াত মনে করে, অতিরিক্ত খাদ্য আমদানি কৃষকের স্বার্থের পরিপন্থী। তাই দেশীয় উৎপাদন বাড়িয়ে ধীরে ধীরে আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং দেশীয় কৃষককে অগ্রাধিকার দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা তাদের ঘোষণায় উল্লেখ রয়েছে।

পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়ন : বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের কৃষিসংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিগুলো কাঠামোগতভাবে কৃষকবান্ধব হলেও এর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক সংস্কার ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। বিশেষ করে ন্যায্য মূল্য, কৃষি বীমা ও মধ্যস্বত্বভোগী নিয়ন্ত্রণ এ তিন ক্ষেত্রে কার্যকর প্রয়োগ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

কৃষিখাত ও কৃষকের কল্যাণকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের কৃষি সঙ্কটের অনেক মৌলিক প্রশ্নকে সামনে আনে। তবে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবে কতটা রূপ পাবে, তা নির্ভর করবে রাষ্ট্র পরিচালনায় নীতিনির্ধারণ, অর্থায়ন ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার ওপর- এটাই এখন দেখার বিষয়।