গফরগাঁওয়ে ভিপি সম্পত্তির পুকুরে সাবেক ডিজিএফআই ডিজির মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন

এস এম মিন্টু
Printed Edition
  • আদালতের ডিক্রি, রেকর্ড ও দখল নিয়ে তদন্তে সত্যতা
  • ট্রাইব্যুনালের মামলায় পলাতক থেকেও প্রভাব বিস্তার

ময়মনসিংহের দক্ষিণ গফরগাঁওয়ের দিগলবাঁক গ্রামের সুপরিচিত ‘লাহিড়ী দীঘি’ নামের পুকুরের মালিকানা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে এটিকে ৬ নম্বর রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত ভিপি (অর্পিত-‘ক’ তফসিল) পুকুর হিসেবে উল্লেখ করা হলেও পরবর্তীতে আদালতের ডিক্রি, দলিল, ভিপি ট্রাইব্যুনালের মামলা এবং উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে এর একটি বড় অংশ সাবেক ডিজিএফআই মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব:) সাইফুল আবেদীন ও তার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। এ ছাড়াও দিগলবাঁক গ্রামের সাধারণ মানুষের জমি, ভাংতি বাজারের খাস জমি, পাশের খাল ও সরকারি রাস্তা দখল করে দোকানপাট করারও অভিযোগ রয়েছে সাইফুল আবেদীনের বিরুদ্ধে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনকালে সাইফুল আবেদীন নিজের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তাঁর পরিবারকে পুকুরটির মালিকানা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছেন। এমনকি ভিপি সম্পত্তির তালিকা থেকে পুকুরটি অবমুক্ত করার আইনি প্রক্রিয়াতেও তার প্রভাব কাজ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি ভূমি মন্ত্রণালয়ে দেয়া লিখিত আবেদনে দিগলবাঁক জামে মসজিদ কমিটি ও স্থানীয় এলাকাবাসী পুকুরটির মালিকানা, রেকর্ড, নামজারি, আদালতের ডিক্রি ও দলিলগুলো আবার তদন্ত করে সরকারি সম্পত্তি দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। আবেদনের সাথে সংযুক্ত স্থানীয় ভূমি অফিসের তদন্ত প্রতিবেদনে পুকুরটির ভিপি সম্পত্তি হিসেবে অতীত ইতিহাস এবং পরবর্তীতে মালিকানা পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিকতা উঠে এসেছে।

গত ২২ জুন গফরগাঁও সহকারী কমিশনারের (ভূমি) সরেজমিন পরিদর্শন ও কাগজপত্র পর্যালোচনার পর দেয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, লাহিড়ী পুকুরটি ৬ নম্বর রেজিস্টারভুক্ত ভিপি পুকুর, যার ভিপি মামলা নম্বর ৩৯(গ)/৮০। পূর্বশর্তে ভূমিহীন সমবায় সমিতির ব্যবহারের জন্য পুকুরটি লিজ দেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে শামসুল হকের নামে আদালতের মাধ্যমে দলিল সম্পাদনের উদ্যোগ নেয়া হয়। ১৯৮৮ সালের ৯২ নম্বর মামলায় আদালত শামসুল হকের অনুকূলে সাফ কবলা দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রির নির্দেশ দেন এবং এর ভিত্তিতে ২৭ আগস্ট ১৯৮৮ তারিখে ৭৬০৩ নম্বর দলিল রেজিস্ট্রি হয়।

এরপর ১৯৮৯ সালের ৩ জুন ৩০১৫ নম্বর দলিলের মাধ্যমে মেজর জেনারেল (অব:) সাইফুল আবেদীনের পিতা ডা: জয়নাল আবেদীন ওই জমি কিনে নেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, একটি ভিপি পুকুরের জমি কিভাবে প্রথমে আদালতের ডিক্রি এবং পরে ব্যক্তিগত বিক্রয় দলিলের মাধ্যমে একটি পরিবারের মালিকানায় গেল- সেটি-ই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারিপক্ষ ওই আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ১৯৮৮ সালে ১০৩ নম্বর দেওয়ানি মামলা করেছিল। কিন্তু ১৯৮৯ সালের ৩ জুন মামলাটি খারিজ হয়ে যায়।

ভিপি গেজেটে থেকেও কিভাবে ব্যক্তিমালিকানা : এসি ল্যান্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএস রেকর্ডে ডা: জয়নাল আবেদীন গংয়ের নামে অধিকাংশ জমি রেকর্ড হলেও ভিপি গেজেটে লাহিড়ী পুকুরের ১.৮১ একর জমি ‘ক’ তফসিলভুক্ত ছিল। একই সাথে ০.৩৩ একর জমি ১ নম্বর খতিয়ানে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসকের নামে রেকর্ডভুক্ত ছিল।

এখানেই দেখা দিয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- এক দিকে সরকারি নথিতে পুকুরের জমির একটি অংশ ভিপি সম্পত্তি এবং অপর অংশ সরকারের নামে রেকর্ডভুক্ত; অন্য দিকে আদালতের ডিক্রি ও পরবর্তী রেকর্ডের ভিত্তিতে একই সম্পত্তির ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে আইনগত সামঞ্জস্য কোথায়, সেটিই এখন নতুন করে তদন্তের দাবি উঠেছে।

ভিপি ট্রাইব্যুনাল থেকে হাইকোর্ট, তারপর অবমুক্তি : সরকারি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ভিপি গেজেটের বিরুদ্ধে দলিলদাত্রী শামসুন্নাহার ও তার ছেলে মেজর জেনারেল (অব:) সাইফুল আবেদীন ভিপি ট্রাইব্যুনালে ২৮৮/২০১২ নম্বর মামলা করেন। ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তারা অবমুক্তির রায় পান। ওই রায়ের বিরুদ্ধে সরকার ২০১৫ সালে হাইকোর্টে ৮/২০১৫ নম্বর আপিল করে। ২০১৭ সালের ২৩ মার্চ হাইকোর্ট আপিলটি নিষ্পত্তি করে ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রাখেন। এরপর ২০১৮ সালে পুকুরের জমি আবেদনকারীদের পক্ষে অবমুক্ত করে খারিজ ও খাজনা গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়।

অর্থাৎ আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ের রায়ের পরই পুকুরের জমি ভিপি তালিকা থেকে অবমুক্ত হয়ে ব্যক্তিমালিকানার পথ তৈরি হয়। কিন্তু এই অবমুক্তির পেছনে প্রাথমিক মালিকানা কী ছিল, ভিপি সম্পত্তির চরিত্র কিভাবে নির্ধারিত হয়েছিল এবং ১৯৮৮ সালের আদালতের ডিক্রির সময় সম্পত্তিটির ভিপির তালিকাও সরকারি লিজের তথ্য আদালতের নজরে আনা হয়েছিল কি না- এসব প্রশ্নের নিষ্পত্তি ছাড়া পুরো বিষয়টি স্পষ্ট হচ্ছে না।

ডিজিএফআই ডিজি যেভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন : অ্যাসি ল্যান্ডের প্রতিবেদনে স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্নস্তরের মানুষের বক্তব্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, মামলা দায়ের, রায় লাভ, হাইকোর্টে আপিল নিষ্পত্তি এবং জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে অবমুক্তির প্রতিটি পর্যায়ে ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন ডিজি ‘অবৈধ প্রভাব বিস্তার’ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি পক্ষের হয়ে ভিপি ট্রাইব্যুনালের মামলায় পক্ষভুক্ত স্থানীয় ব্যক্তিদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করার অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে থাকা একজন কর্মকর্তার প্রভাবের কারণে পুকুরটির সরকারি চরিত্র নিয়ে আপত্তি তোলার সাহস অনেকেই পাননি। দিগলবাঁক জামে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকেও অভিযোগ করা হয়েছে, পুকুর রক্ষার আন্দোলনে যুক্ত ব্যক্তিদের ভয়ভীতি ও হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।

বায়নাপত্র দিয়ে ভিপি সম্পত্তি হাতিয়ে নেয়ার প্রশ্ন : অ্যাসি ল্যান্ডের প্রতিবেদনের শেষাংশে ভিপি সম্পত্তি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আদালতে বায়নাপত্রের ভিত্তিতে দলিল সম্পাদনের রায় পাওয়ার পর সেই দলিলের মাধ্যমে ভিপি সম্পত্তি দখলে নেয়া একটি প্রচলিত কৌশল হতে পারে। প্রতিবেদনে আদালতের সম্পাদিত দলিলকে চ্যালেঞ্জ করে সরকারি পক্ষে জমি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, কথিত হিন্দু জমিদার জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য লাহিড়ী পুকুর খনন করেছিলেন এবং সংলগ্ন মসজিদের জন্য জমি দান করেছিলেন বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। জমিদারের বিপুল সম্পত্তির মধ্যে শুধু পুকুরের জমি বিক্রির জন্য বায়না করার বিষয়টিকেও প্রতিবেদনে ‘অবান্তর’ যুক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

মসজিদের ঘাট এখন ভাঙনের মুখে : এ দিকে সাম্প্রতিক টানা বর্ষণে লাহিড়ী দীঘির পাড় ভেঙে দিগলবাঁক জামে মসজিদের সীমানা, পাকা ঘাট, ওজুখানা ও কবরস্থান ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। প্রায় দুই একর আয়তনের পুকুরটি দীর্ঘ দিন ধরে স্থানীয় মুসল্লি ও সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে আসছেন। মসজিদের নামে এসএ ও বিএস রেকর্ডে ৯ শতাংশ জমিও রয়েছে বলে মসজিদ কমিটির আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, পুকুরটির মালিকানা নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি পাড় ভাঙন ও দখল নিয়ে নতুন করে সঙ্ঘাত তৈরি হতে পারে। তাই বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত ভূমি বিরোধ নয়; সরকারি সম্পত্তি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলার সাথেও এর সম্পর্ক রয়েছে।

আইসিটি মামলায় পলাতক থেকেও প্রভাব বিস্তার : মেজর জেনারেল (অব:) সাইফুল আবেদীন বর্তমানে দেশে নেই। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এক মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তিনি বর্তমানে বিদেশে পলাতক রয়েছেন বলে জানা গেছে। ফলে তার সরাসরি বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। তবে আত্মগোপনে থেকেও তিনি প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছেন।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, সাইফুল আবেদীন ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে বিগত সরকারের সময় নিজ এলাকার অন্তত ২২ জন সাধারণ মানুষের জমি দখল করেছেন এবং ভালুকায় বনভূমির জমিও দখলের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়াও দিগলবাঁক গ্রামের ভাংতি বাজারে সরকারের এক নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত জমি, পাশের খাল ও সরকারি রাস্তা দখল করে দোকানপাট করার অভিযোগ রয়েছে সাইফুল আবেদীনের বিরুদ্ধে।

তবে তার প্রতিনিধি হিসেবে ভালুকার বাসিন্দা ও অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা ফজলুল হক বলেন, ‘সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের ভিত্তিতেই তারা পুকুরের মালিকানা অর্জন করেছেন।’

এখন প্রশ্ন হলো- একটি পুকুরকে একসময় ভিপি সম্পত্তি হিসেবে সরকারি রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল কেন, সরকারিপক্ষ সেই রেকর্ডের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল কেন এবং পরবর্তীতে আদালতের রায় ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেটি কিভাবে ব্যক্তিমালিকানায় চলে গেল? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। লাহিড়ী দীঘির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘ দিনের এই বিরোধে শেষ পর্যন্ত সরকারি নথি, পুরনো রেকর্ড, আদালতের ডিক্রি ও বর্তমান দখল- সবকিছু এক সাথে যাচাই করে প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা হবে কি না- সেটিই এখন দেখার বিষয়।