আবাসন ব্যবসার দুরবস্থা

Printed Edition

হামিম উল কবির

আবাসন ব্যবসার দুরবস্থা চলছে। এমনও অনেক আবাসন কোম্পানি রয়েছে যারা এখন বছরে ৩ থেকে ৪টা ফ্যাটের বেশি বিক্রি করতে পারে না। ৫ আগস্টের পরপরই মাসে যে কোম্পানির ৪ থেকে ৫টা ফ্যাট বিক্রি হতো এখন একই আবাসন কোম্পানি বছরে ৩ থেকে ৪টা ফ্যাট বিক্রি করতে পারছে। বড় কোম্পানিগুলো কিছু বেশি বিক্রি করছে। আবাসন ব্যবসায়ীরা বলছেন, এমনিতেই দেশের সার্বিক ব্যবসার অবস্থা ভালো নয়। তবে আবাসনে যে মধ্যবিত্তরা বিনিয়োগ করে থাকেন তারা এই মুহূর্তে বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন। কারণটা রাজনৈতিক, যাদের হাতে টাকা রয়েছে তাদের সেই টাকাটার বৈধ উৎস দেখানো কঠিন হয়ে গেছে।

বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দার কারণে অনেকেই হাতের টাকা খরচ করতে চাচ্ছেন না। পরে পরিবেশ অনুকূলে আসলে তারা আবারো আবাসনে বিনিয়োগ করবেন। একজন আবাসন ব্যবসায়ী নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, আবাসন খাতে বিনিয়োগ থমকে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো রাজনৈতিক ক্রেতা ও প্রভাবশালী বিনিয়োগকারীদের অনেকেই গা ঢাকা দিয়েছেন। এদের অনেকেই পতিত সরকারের রাজনীতির সাথে জড়িত। একটা গ্রুপ ছিল যারা ব্যবসায়ী, এরাই বিলাসবহুল ফ্যাটগুলোর প্রধান ক্রেতা ছিলেন। আবার পতিত সরকারের আমলাদের বিশাল অংশও আবাসন খাতে এতদিন বিনিয়োগ করে আসছেন। অর্থ বিনিয়োগ করে আইনি জটিলতায় পড়তে চান না তারা। আবাসন খাতে বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আরেক কারণ হলো- বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত টাকা বিনিয়োগের সুবিধা বাতিল করে দিয়েছিল। প্রশ্নাতিতভাবে (ইনডেমনিটি) বিনিয়োগ করার সুবিধা এখন আর নেই। এসব কারণে, বেকায়দায় পড়ে গেছে আবাসন ব্যবসা।

একই সাথে চড়াসুদের ব্যাংকলোনের কারণেও অনেকে চাইলেও এই খাতে টাকা বিনিয়োগ করতে পারছেন না। আগে ব্যাংক লোন ১০ শতাংশের নিচে ছিল (৮ থেকে ৯ শতাংশ ছিল) কিন্তু সেই ব্যাংক লোন ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। চড়াসুদের ব্যাংক লোনে শেষ পর্যন্ত যত সুদই মোট লোনের সমান হয়ে যায়। সেই কারণেও এই খাতে মানুষ বিনিয়োগ করতে চাচ্ছেন না।

তবে অনেক আবাসন ব্যবসায়ী মনে করছেন, এই খাত আবার ঘুরে দাঁড়াবে। টাকা হাতে থাকলে মানুষ অগ্রাধিকার দিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই খোঁজেন। পরিস্থিতি অনুকূলে আসলেই এই খাতটা আবার চাঙ্গা হবে।

এ ব্যাপারে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) বর্তমান সিনিয়র সহসভাপতি ও আরমা রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে সব ব্যবসায়ের খারাপ অবস্থা, বেচাকেনা একেবারে কমে গেছে। এই খাতের ক্রেতা নেই বললেই চলে। যাদের হাতে টাকা আছে তারা এখন বিনিয়োগ করতে চাচ্ছেন না। আবার যাদের আকাক্সক্ষা রয়েছে ফ্যাট কেনা কিন্তু তাদের হাতে অর্থ নেই। রেজিস্ট্রেশন খরচসহ একটি তিন বেড রুমের ফ্যাটের বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় এক কোটি ৩৫ লাখ টাকা। আবার ফ্যাটের ইনটেরিয়র ডিজাইন ও ডেকোরেশন করতে আরো ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকাতো লাগেই। বিপরীতে যারা এখন কিনতে চান তাদের ওই পরিমাণ টাকা নেই। ফলে তারা এখন কেনার চিন্তা বাদ দিয়েছেন। ঢাকায় জমির দাম অনেক বেশি বলে আবাসন কোম্পানিগুলো এই দামের নিচে ফ্যাট বিক্রিও করতে পারছে না। এর সাথে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সঙ্কটতো আছেই। অন্য দিকে ঢাকার বাইরে যেমন গাজীপুরের পুবাইল কিংবা, মাওনার দিকে জমি কিনে আবাসন গড়ে তোলা যায় কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত বলে ক্রেতারা এতদূর যেতেও চান না। আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ২০২২ সালের ড্যাপের কারণে ভবনের উচ্চতা ও আয়তনের রেসট্রিকশন রয়েছে। ভবনের উচ্চতা বাড়াতে না পারলে ডেভেলপার কোম্পানিগুলো ফ্যাটের দামও কমাতে পারছেন না।

আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এই বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে প্রধানমন্ত্রী তিনজন মন্ত্রীর সমন্বয়ে একটি কমিটি করে দিয়েছেন, তারা বিষয়টি দেখবেন। এ ব্যাপারে রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট (ফিন্যান্স) ও এমবিট বিল্ডার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান ড. মো: হারুন অন রশিদ নয়া দিগন্তকে বলেন, এমনিতেই অর্থনৈতিক অবস্থা নাজুক, বাজারে অর্থের প্রবাহ অনেক কমে গেছে। আবার ড্যাপের কারণে আগের মতো উচ্চতা পাওয়া যাচ্ছে না, ডেভেলপাররা ফ্যাটের দাম কমাতে পারছেন না। আগে রিহ্যাবের সব কোম্পানি মিলে বছরে ১৪ থেকে ১৫ হাজার ফ্যাট বিক্রি করতে পারতেন কিন্তু এখন যা বিক্রি হচ্ছে সেগুলো হাতেগোনা যায়। টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এই সেক্টরের সাথে আরো অনেকগুলো শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে। এই সেক্টরটা না বাঁচলে অন্যান্য শিল্প-কারখানাতেও ধস নামবে। এটা গিয়ে পড়বে সরকারের ওপর। সে কারণে, এই সেক্টরটাকে বাঁচাতেই হবে, সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে বৃহত্তর স্বার্থে।

কয়েকজন আবাসন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, নগরীর গুলশান-বনানীতে ফ্যাট বিক্রিতে সবচেয়ে বেশি ধস নেমেছে। কারণ আমলা ও আওয়ামী আমলের রাজনীতিবিদদের বেশির ভাগেরই প্রথম পছন্দ গুলশান ও বনানী এলাকা। রাজনৈতিক কারণে এদের অন্তর্ধান এবং দুর্নীতিবাজ আমলাদের হাত খুলে অর্থ খরচ কমে যাওয়ায় এই এলাকার ফ্যাট ব্যবসায়ে ধস নেমেছে।