ইরানে সপ্তাহব্যাপী অভিযানের প্রস্তুতি মার্কিন সেনাবাহিনীর

Printed Edition
ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন
ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন

রয়টার্স

  • ইরানে সবচেয়ে ভালো যা হতে পারে তা হল শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন : ট্রাম্প
  • হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলার হুমকি বিপ্লবী বাহিনীর

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানে টানা কয়েক সপ্তাহব্যাপী দীর্ঘ সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন দুই মার্কিন কর্মকর্তা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলার নির্দেশ দিলে এই অভিযান শুরু হতে পারে। কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, এ ধরনের অভিযানের পরিকল্পনা আগের সঙ্ঘাতগুলোর তুলনায় অনেক দীর্ঘ ও ভয়াবহ হতে পারে।

ওমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চললেও যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক শক্তি বাড়িয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন অবস্থান করছে, শিগগিরই বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও আধুনিক রণতরী ইউএসএস গেরাল্ড আর ফোর্ডও সেখানে যোগ দেবে। এর ফলে উত্তেজনা আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক সেনা, যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান ও সমরাস্ত্র ওই অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে।

নর্থ ক্যারোলাইনার এক ঘাঁটিতে সেনাদের উদ্দেশ্যে দেয়া বক্তৃতায় ট্রাম্প বলেন, ইরানের সাথে চুক্তিতে পৌঁছানো কঠিন। তার ভাষায়, ‘কখনো কখনো ভয় দেখানো উচিত। এটা পরিস্থিতি সামলাতে সহায়তা করে।’ হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র আনা কেলি জানিয়েছেন, ইরান নিয়ে সব ধরনের বিকল্প ট্রাম্পের টেবিলে রয়েছে। তবে পেন্টাগন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

সম্ভাব্য অভিযানের লক্ষ্য

দুই মার্কিন কর্মকর্তার একজন জানিয়েছেন, দীর্ঘ অভিযানে কেবল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাই নয়, রাষ্ট্রীয় ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোও হামলার লক্ষ্য হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা এ ধরনের অভিযানের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, ইরানের হাতে বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র থাকায় মার্কিন বাহিনী বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। পাল্টাপাল্টি হামলা হলে আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।

ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, তাদের ভূখণ্ডে কোনো হামলা হলে তারা অঞ্চলজুড়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলা চালাবে। মধ্যপ্রাচ্যে জর্দান, কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক ঘাঁটি রয়েছে।

শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের হুমকি

এ দিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনকেই দেশটির জন্য ‘সবচেয়ে ভালো জিনিস’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘৪৭ বছর ধরে তারা শুধু কথা বলেই গেছে। এই সময়ের মধ্যে আমরা অনেক প্রাণ হারিয়েছি।’ তবে ক্ষমতাসীনদের সরালে কারা দেশ পরিচালনা করবে সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি, শুধু ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এমন লোকজন আছে যারা ক্ষমতা নিতে পারবে।

ট্রাম্পের এ মন্তব্য ইরানবিরোধী অবস্থানকে আরো স্পষ্ট করেছে। ইরানের শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। তবে ইরান বারবার বলেছে, তারা পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে পারে কিন্তু তার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে তারা কোনো দরকষাকষি করবে না।

ইসরাইলের ভূমিকা ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি ওয়াশিংটনে গিয়ে ট্রাম্পের সাথে বৈঠক করেছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের সাথে কোনো চুক্তি হলে তাতে অবশ্যই ইসরাইলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো থাকতে হবে। নেতানিয়াহুর সরকার চাইছে তেহরান যেন ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করে এবং হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো সংগঠনগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করে।

অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, তার দেশ অতিরিক্ত দাবিদাওয়ার কাছে নতি স্বীকার করবে না। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে যে পারমাণবিক চুক্তি হয়েছিল, ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে তা বাতিল করেন এবং নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেন। নতুন চুক্তির লক্ষ্যে গত বছর আলোচনা শুরু হলেও ইসরাইলের হামলার পর তা নস্যাৎ হয়ে যায়। সম্প্রতি ওমানে ওয়াশিংটন ও তেহরান ফের আলোচনায় বসেছে, শিগগিরই যার পরবর্তী রাউন্ড হওয়ার কথা।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো এবং ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের হুমকি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি যুদ্ধের প্রস্তুতি- এই দ্বিমুখী অবস্থান আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামান্য ভুল পদক্ষেপই নতুন এক ভয়াবহ সঙ্ঘাতের সূচনা করতে পারে।