নয়া দিগন্ত ডেস্ক
গাজা যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখার লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো সরাসরি আলোচনায় বসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও হামাস। মিসরের রাজধানী কায়রোতে অনুষ্ঠিত এই গোপন বৈঠককে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বরাতে জানা যায়, বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আরিয়ে লাইটস্টোন এবং হামাসের পক্ষ থেকে প্রধান আলোচক হিসেবে অংশ নেন খলিল আল-হাইয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানালেও বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠক গাজায় চলমান যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আলোচনায় মূলত যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ বাস্তবায়ন, গাজায় ইসরাইলি হামলা বন্ধ, মানবিক সহায়তা প্রবেশ নিশ্চিত করা এবং অবরোধ শিথিল করার বিষয়গুলো উঠে আসে। একই সাথে এই শর্ত পূরণ না হলে যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপে যাওয়া সম্ভব নয় বলে স্পষ্ট করেন হামাস প্রতিনিধি। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পক্ষ থেকে হামাসের নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। তবে হামাস এ প্রস্তাবকে ‘অসম ভারসাম্যপূর্ণ’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং গাজায় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। উল্লেখ্য, গত অক্টোবর থেকে কার্যকর যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় সঙ্ঘাত পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরাইলি হামলায় বহু ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া গাজার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা, নিরাপত্তা কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক বাহিনীর সম্ভাব্য উপস্থিতি নিয়ে এখনো বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
গাজায় ফের ইসরাইলি হামলায় শিশুসহ নিহত ৪
গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, ফিলিস্তিনের বিভিন্ন এলাকায় ইসরাইলি হামলায় এক শিশুসহ চারজন নিহত হয়েছে।
গত ১০ অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির। সংস্থাটির মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল বলেন, নিহতদের মধ্যে ৯ বছর বয়সী শিশু সালেহ বদউই রয়েছে। গাজা সিটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জেইতুন এলাকায় ইসরাইলি গুলিতে আহত হওয়ার পর তাকে আল-মা’মাদানি হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানে তার মৃত্যু হয়।
তিনি আরো জানান, গাজার উত্তরাঞ্চলের বেইত লাহিয়া এলাকায় একটি স্কুলের কাছে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় দুই ভাই নিহত হয়। একই দিনে গাজার দক্ষিণাঞ্চলের খান ইউনুসের কাছে ৩৮ বছর বয়সী মোহসিন ওদা আল-দাব্বারি ইসরাইলি গুলিতে নিহত হন।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর থেকে অন্তত ৭৬৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
গাজায় ‘পরিকল্পিত দুর্ভিক্ষ’ : খাদ্য ও জ্বালানি সঙ্কটে তীব্র মানবিক বিপর্যয়
গাজায় চলমান সঙ্ঘাত ও অবরোধের মধ্যে খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের ঘাটতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কেবল সরবরাহ সঙ্কট নয়, বরং একটি ‘পরিকল্পিত দুর্ভিক্ষ নীতি’র অংশ হিসেবে পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে। খবর আলজাজিরার।
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় সহায়তা প্রবেশের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সরকারি তথ্যানুযায়ী, গত ছয় মাসে নির্ধারিত এক লাখ ১০ হাজার ট্রাকের বিপরীতে মাত্র প্রায় ৪২ হাজার ট্রাক ঢুকেছে; যা চাহিদার মাত্র ৩৭ শতাংশ। জ্বালানির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ; প্রয়োজনীয় ৯ হাজার ২০০ ট্রাকের বিপরীতে প্রবেশ করেছে মাত্র এক হাজার ৩৬৬টি, অর্থাৎ মাত্র ১৪ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাক গণনার পদ্ধতিতেই রয়েছে বিভ্রান্তি। একটি বড় ট্রাকের মালামাল ভেঙে একাধিক ছোট ট্রাকে ভাগ করে গণনা করায় প্রকৃত সরবরাহের তুলনায় সংখ্যা বেশি দেখানো হচ্ছে। একই সাথে মিশ্র পণ্য পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় ট্রাকের বড় অংশ খালি রেখেই প্রবেশ করানো হচ্ছে।
এই সরবরাহ সঙ্কট সরাসরি প্রভাব ফেলছে খাদ্য নিরাপত্তায়। বর্তমানে গাজায় দৈনিক প্রায় ২০০ টন রুটি উৎপাদন হচ্ছে, যেখানে প্রয়োজন অন্তত ৪৫০ টন। বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম দ্রুত বাড়ছে- টমেটোর দাম কয়েক সপ্তাহে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
অর্থনৈতিক সঙ্কট পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। বেকারত্ব প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে এবং হাজার হাজার কর্মসংস্থান ধ্বংস হওয়ায় অধিকাংশ পরিবার খাদ্য কিনতে অক্ষম। ফলে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে রুটি সংগ্রহ বা বিকল্প হিসেবে প্লাস্টিক ও বর্জ্য জ্বালিয়ে রান্নার মতো ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে মানুষ। স্বাস্থ্য খাতেও পরিস্থিতি সঙ্কটজনক। যুদ্ধবিরতির শর্তানুযায়ী চিকিৎসার জন্য সীমান্ত খোলার কথা থাকলেও বাস্তবে মাত্র ৭ শতাংশ রোগী গাজা ছাড়তে পেরেছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এখনো প্রায় ১৮ হাজার রোগী জরুরি চিকিৎসার অপেক্ষায় রয়েছে।
গাজা যুদ্ধে নারী ও শিশুর মৃত্যু উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে : জাতিসঙ্ঘ
গাজা যুদ্ধ চলাকালে নারী ও শিশুদের মৃত্যু অস্বাভাবিকভাবে বেশি হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘের নারীবিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেন। সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৮ হাজারের বেশি নারী ও মেয়ে নিহত হয়েছেন। খবর বার্তা সংস্থা রয়টার্সের। প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৪৭ জন নারী ও মেয়ে নিহত হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, গাজার আগের সঙ্ঘাতগুলোর তুলনায় এবার নারী ও শিশুর মৃত্যুর হার অনেক বেশি। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও সহিংসতা থামেনি। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, গত ছয় মাসে ৭৫০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ইউনিসেফ জানিয়েছে, এ সময় অন্তত ২১৪ শিশু নিহত হয়েছে। বর্তমানে গাজায় প্রায় ১০ লাখ নারী ও মেয়ে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার অভাব পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, গাজায় পাঁচ লাখেরও বেশি নারী তাদের প্রয়োজনীয় মাতৃসেবা পাচ্ছেন না।
ইসরাইলি কারাগারে ‘নীরব গণহত্যা’
ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর ইসরাইলি কারাগারে ‘নীরব গণহত্যা’ চালানোর অভিযোগ উঠেছে। ফিলিস্তিনি বন্দিবিষয়ক কমিটির প্রধান রায়েদ আবু আল-হুমস বলেন, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে বন্দীদের ওপর নির্যাতন, চিকিৎসা বঞ্চনা ও একাকী কারাবাস ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ইসরাইলি কারাগারে ৯ হাজার ৬০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি আটক রয়েছেন, যার মধ্যে শতাধিক শিশু ও নারী রয়েছে। ১৯৬৭ সালের পর থেকে ইসরাইলি কারাগারে ৩২৬ বন্দীর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৮৯ জনই মারা গেছেন সাম্প্রতিক সঙ্ঘাতের পর। সম্প্রতি পাস হওয়া মৃত্যুদণ্ড আইন পরিস্থিতিকে আরো উদ্বেগজনক করে তুলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। হামাসসহ বিভিন্ন পক্ষ এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক তদন্ত ও হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। এ দিকে গাজার এক বন্দীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ইসরাইলি সেনাদের পুনর্বহালের সিদ্ধান্তে সমালোচনা শুরু হয়েছে। দক্ষিণ ইসরাইলের স্দে তেইমান ঘাঁটির ঘটনায় অভিযুক্ত সেনাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহারের পর তাদের আবার দায়িত্বে ফিরতে দেয়া হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এ সিদ্ধান্ত বিচারহীনতার সংস্কৃতি জোরদার করছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বন্দীকে মারধর, বিদ্যুৎ শক ও গুরুতর শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছিল।
পশ্চিমতীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা
অধিকৃত পশ্চিমতীরে আবারো সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার ভোরে দক্ষিণাঞ্চলে ফিলিস্তিনি বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে দু’টি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় ইসরাইলি অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা। স্থানীয় অ্যাক্টিভিস্ট ওসামা মাখমারা আনাদোলুকে জানান, হেবরনের দক্ষিণে ইয়াত্তার পশ্চিমে মাজদ আল-বা’আ এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। ওতনিয়েল বসতি থেকে আসা একদল সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারী ওই এলাকায় ঢুকে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘরে হামলা চালায়। এ সময় খালেদ ও ইয়াসের আবু আলি নামের দুই ভাইয়ের মালিকানাধীন দু’টি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়, যা সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। এই হামলা চলমান উত্তেজনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরাইলি অভিযানের পর থেকেই পশ্চিমতীরে সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারি ‘কলোনাইজেশন অ্যান্ড ওয়াল রেজিস্ট্যান্স কমিশন’-এর এক মাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মার্চ মাসেই বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ৪৯৭টি হামলা চালিয়েছে, যাতে অন্তত ৯ জন নিহত হয়। সামগ্রিকভাবে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় এক হাজার ১৪৮ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং প্রায় ১১ হাজার ৭৫০ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া প্রায় ২২ হাজার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।



