সংসদ প্রতিবেদক
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন সংসদকে জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গুজব, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য মোকাবেলায় সরকার ২৪ ঘণ্টাব্যাপী ফ্যাক্টচেকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। একই সাথে তথ্য ও সম্প্রচার খাতকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিল্পে রূপান্তরের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অন্য দিকে দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যের স্বীকৃতি হিসেবে বর্তমানে ৬৪টি পণ্য ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদের বাজেট আধিবেশনের ১২তম দিনে টেবিলে উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে দুই মন্ত্রী এসব তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো: আবদুল মান্নানের প্রশ্নের জবাবে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জানান, তথ্য অধিদফতরের সদর দফতরে একটি বিশেষায়িত ‘গুজব প্রতিরোধ ও ফ্যাক্টচেকিং কমিটি’ ২৪ ঘণ্টা কর্মরত রয়েছে।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত যাচাই করে সরকারের পক্ষ থেকে ‘তথ্যবিবরণী’ ও ‘প্রতিবাদলিপি’ প্রস্তুত করা হয় এবং তা সরকারি-বেসরকারি সব গণমাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে পাঠানো হয়।
মন্ত্রী জানান, শুধু সদর দফতর নয়, তথ্য অধিদফতরের আওতাধীন বিভাগীয় পর্যায়ের আঞ্চলিক তথ্য অফিসগুলোও নিজ নিজ এলাকায় অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন তথ্য নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
এ ছাড়া অপপ্রচার ও সাইবার হয়রানি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে তথ্য অধিদফতরের ফিচার শাখা নিয়মিত বিশেষ নিবন্ধ ও সচেতনতামূলক ফিচার তৈরি করছে, যা জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন পোর্টালে প্রকাশ করা হচ্ছে।
জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো: মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) পরিচালিত ‘বাংলাফ্যাক্ট’ অপপ্রচার, কুৎসা ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য মোকাবেলায় সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
তিনি জানান, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাফ্যাক্ট ৭৮৩টি ফ্যাক্টচেক, বিশ্লেষণধর্মী ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, ভিডিও এবং বুলেটিন প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রকাশিত হয়েছে ২২৯টি ফ্যাক্টচেক ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বাংলাফ্যাক্ট প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে পাঁচটি দাবির সত্যতা যাচাই করে প্রতিবেদন, ভিডিও ও রিল প্রকাশ করছে।
জহির উদ্দিন স্বপন জানান, সংবাদপত্র বা টেলিভিশনের আদলে পরিচালিত হলেও প্রকৃতপক্ষে প্রোপাগান্ডা ও অপতথ্য প্রচারে জড়িত ১৬টি ওয়েবসাইট চিহ্নিত করেছে বাংলাফ্যাক্ট।
এ ছাড়া বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য প্রচারকারী ৩০০টির বেশি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট এবং ১০০টি এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টও শনাক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত কাজে সহায়তার জন্য একটি ‘ফ্যাক্টচেক ম্যানুয়াল’ শিগগিরই প্রকাশ করা হবে।
মন্ত্রী আরো জানান, গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলো কিভাবে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন এবং চরিত্রহননের কাজে যুক্ত হয়, সে বিষয়ে গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ‘শিকারি সাংবাদিকতা’ সম্প্রতি পিআইবি থেকে প্রকাশ করা হয়েছে।
গণমাধ্যমকর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে পিআইবির কার্যক্রমের তথ্য তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশের ৬৪ জেলায় ১২৩টি প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে। এতে পাঁচ হাজার ৯৭৭ জন সাংবাদিক অংশ নিয়েছেন।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ১০টি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে ৩৬৫ জন সাংবাদিককে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।
তিনি জানান, এসব প্রশিক্ষণে গুজব ও অপতথ্য শনাক্তকরণ, ফ্যাক্টচেকিং কৌশল এবং সাংবাদিকতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।
নেত্রকোনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম হিলালীর প্রশ্নের জবাবে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী বলেন, দেশের তথ্য ও সম্প্রচার খাতকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে সরকার বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
তিনি জানান, বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) এবং চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতরের তথ্য ও সম্প্রচার কার্যক্রমে আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে।
বিটিভিতে পর্যায়ক্রমে ডিজিটাল টেরেস্ট্রিয়াল টেলিভিশন (ডিটিটি) সম্প্রচার ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ বেতারের ডিজিটাল রূপান্তর কার্যক্রম বাস্তবায়নের পাশাপাশি অনলাইন ও মোবাইল অ্যাপভিত্তিক সম্প্রচার সেবা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপনা, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর গণসচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সরকারি তথ্যসেবা সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, চলচ্চিত্র শিল্পের আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অংশগ্রহণ বাড়াতে বিভিন্ন নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও সক্ষমতা উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
গণমাধ্যমের বিকাশ, তথ্য অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন, নীতি ও নির্দেশিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
দেশে জিআই পণ্যের সংখ্যা ৬৪
কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো: আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে ৬৪টি পণ্য ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত রয়েছে।
তিনি বলেন, এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী বস্ত্র, কৃষিপণ্য, খাদ্যসামগ্রী, হস্তশিল্প ও প্রাণিসম্পদভিত্তিক পণ্য, যা দেশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন।
নিবন্ধিত জিআই পণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- জামদানি শাড়ি, বাংলাদেশের ইলিশ, ঢাকাই মসলিন, রাজশাহী সিল্ক, বাংলাদেশের বাগদা চিংড়ি, শীতলপাটি, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল, টাঙ্গাইল শাড়ি, কুমিল্লার রসমালাই, বগুড়ার দই, টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম, মুক্তাগাছার মণ্ডা, যশোরের খেজুরের গুড়, নরসিংদীর অমৃতসাগর কলা, গোপালগঞ্জের রসগোল্লা, শেরপুরের তুলসীমালা চাল, রংপুরের হাঁড়িভাঙ্গা আম, মধুপুরের আনারস, গাজীপুরের কাঁঠাল, বরিশালের আমড়া, কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের চিজ, সুন্দরবনের মধু, সিরাজগঞ্জের লুঙ্গি, কুমিল্লার খাদি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী, গোপালগঞ্জের কাঁসার গহনা, মুন্সীগঞ্জের পাটক্ষীর, দিনাজপুরের বেদানা লিচু, নওগাঁর নাক ফজলি আম, মেহেরপুরের মেহেরসাগর কলা, ফুলবাড়িয়ার লালচিনি, ফরিদপুরের পাট, কালীগঞ্জের গামছা, জয়পুরহাটের লতিরাজ কচু এবং মানিকগঞ্জের হাজারি গুড়।
মন্ত্রী বলেন, জিআই পণ্যের সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ও অঞ্চলভিত্তিক পণ্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে।



