আলি জামশেদ নিকলী, কিশোরগঞ্জ
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করছেন স্থানীয় সেবাপ্রত্যাশীরা। দীর্ঘদিন ধরে জনবল সঙ্কট, পর্যাপ্ত ওষুধের অভাব, চিকিৎসা সরঞ্জামের অকার্যকারিতা, অ্যাম্বুলেন্স সঙ্কট এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। সরেজমিন অনুসন্ধানে এসবের সত্যতা মিলেছে।
নিকলী উপজেলা সদরের মিরহাটি এলাকার জুবায়েরের দুই বছর বয়সী সন্তান উজাইফা গত ২০ নভেম্বর হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হলে গভীর রাতে হাসপাতালে আনা হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক প্রেসক্রিপশন দিলেও প্রয়োজনীয় ওষুধ হাসপাতাল থেকে দেয়া হয়নি। রাতের বেলা আশপাশের ফার্মেসি বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েন স্বজনরা। জুবায়ের বলেন, হাসপাতালে এসে যদি ওষুধই না মেলে, তাহলে চিকিৎসার মানে কী?
এদিকে বানিয়াহাটির ডায়াবেটিস রোগী রফিকুল আলম অভিযোগ করেন, গত ৭ সেপ্টেম্বরে ওষুধ চাইতে গেলে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: সজিব ঘোষ উত্তেজিত হয়ে প্রেসক্রিপশন ছিঁড়ে ফেলেন। পরে বিষয়টি নিয়ে বাগি¦তণ্ডার একপর্যায়ে তাকে লাঞ্ছিত করা হয় এবং মামলার মাধ্যমে হয়রানির শিকার হতে হয়। তার বিধবা মা বিচারের দাবিতে থানায় ও আদালতে মামলা করেছেন। এ ঘটনায় স্থানীয়রা মানববন্ধনও করেন।
আরেক ঘটনায় পাঁচরুখী এলাকার বৃদ্ধ কৃষক আলাল উদ্দিন গত ১৮ নভেম্বর রাতে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হলে নিকলী হাসপাতালে আনা হয়। চিকিৎসক অবস্থা গুরুতর দেখে সদর হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু সরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালক না থাকায় বিকল্প সিএনজিতে নেয়ার পথে রোগীর মৃত্যু হয়। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালে নিয়মিত অ্যাম্বুলেন্স চালক না থাকায় জরুরি রোগী পরিবহনে বড় ধরনের ভোগান্তি হচ্ছে।
২১৪.৩৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই হাওরাঞ্চলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীই সংখ্যাগরিষ্ঠ। মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য সরকারি হাসপাতালই ভরসা হলেও কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। জানা যায়, ১৯৮৩ সালে একটি ডিসপেনসারি হিসেবে যাত্রা শুরু করে হাসপাতালটি; ২০০৮ সালে ৩১ শয্যায় উন্নীত হয় এবং সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫০ শয্যায় রূপান্তর করা হয়। তবে উন্নয়ন হলেও সেবার মান বাড়েনি বলে অভিযোগ। হাসপাতাল সূত্র জানয়, এখানে এখনো গাইনি ও শিশুবিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। কয়েকজন সাধারণ চিকিৎসক দিয়েই সেবা চালানো হচ্ছে। ডেন্টাল চিকিৎসক থাকলেও কার্যক্রম সীমিত। টেকনোলজিস্ট না থাকায় এক্স-রে মেশিনও অচল হয়ে পড়ে আছে।
সঙ্কটের বিষয়ে জানতে চাইলে ডা: সজিব ঘোষ বলেন, চালক অল্পদিন আগে অবসরে গেছেন। রোগী মৃত্যুর ঘটনায় নির্দিষ্ট তথ্য জানা নেই বলে দাবি করেন এবং সেবার মান উন্নয়নে চেষ্টা অব্যাহত আছে জানান। স্থানীয়দের মতে, পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়োগ, ওষুধ ও অ্যাম্বুলেন্স সঙ্কট নিরসন এবং যাতায়াতের রাস্তা উন্নত করা হলে হাওরের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা অনেকটাই নিশ্চিত হবে।



