একজন হাদিকে গুলি করে আমাদের লড়াই থামানো যাবে না : মাহমুদুর রহমান

Printed Edition
শরিফ ওসমান হাদির ওপর সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে শাহবাগে সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন মাহমুদুর রহমান  : নয়া দিগন্ত
শরিফ ওসমান হাদির ওপর সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে শাহবাগে সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন মাহমুদুর রহমান : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান বলেছেন, শরিফ ওসমান বিন হাদি শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি জুলাই বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি। হাদির ওপর হামলা করে জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে থামিয়ে দেয়া যাবে না।

গতকাল রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির ওপর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত নাগরিক সমাবেশ ও গণ-প্রতিরোধ সমাবেশে এ কথা বলেন তিনি।

মাহমুদুর রহমান বলেন, ফজরের নামাজে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেছি- আমার সবকিছুর বিনিময়ে হলেও আল্লাহ আপনি হাদিকে ফিরিয়ে দিন। কারণ আমাদের আর দেশকে দেয়ার কিছু নেই; কিন্তু হাদির দেয়ার এখনো অনেক কিছু বাকি।

তিনি জানান, হাদির ওপর হামলার প্রতিবাদ জানাতেই জনসমক্ষে আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। হাদির সাথে নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফেরার সময় হাদিই তাকে বিমানবন্দরে রিসিভ করতে গিয়েছিলেন। মাত্র পাঁচ মাস আগেই তারা একসাথে হাদির মায়ের দাফন সম্পন্ন করেন। অথচ আজ সেই হাদি হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়াই করছেন।

মাহমুদুর রহমান বলেন, বহু ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও জুলাই বিপ্লব পরাজিত হয়নি- হাদি তারই প্রমাণ। যারা জুলাইকে বিপ্লব বলতে অস্বীকার করে, তারা মূলত নিজেদের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করছে। তার ভাষায়, জুলাই স্পষ্টভাবেই একটি বিপ্লব এবং সেই বিপ্লবের চেতনা ধারণ করেই সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তথাকথিত সুশীল সমাজের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারা কখনোই ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জনগণের পক্ষে দাঁড়ায়নি। এই লড়াই তরুণদেরই এগিয়ে নিতে হবে।

তিনি হাদির সাংস্কৃতিক উদ্যোগের কথা তুলে ধরে বলেন, যখন তরুণরা বই পড়া থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তখন হাদি মানুষের কাছ থেকে বই সংগ্রহ করে একটি কালচারাল সেন্টার গড়ে তুলেছেন, যার উদ্দেশ্য কালচারাল ফ্যাসিজম মোকাবেলা করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রস্তুত করা। এ সময় তিনি ঘোষণা দেন, হাদি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তার সেই কালচারাল সেন্টারের দায়িত্ব নিজেই পালন করবেন।

মাহমুদুর রহমান জানান, আগামী ১৫ ডিসেম্বর বেলা ৩টায় শহীদ মিনারে সর্বদলীয় প্রতিরোধ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে এবং সেখান থেকেই আগামী দিনের আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসের আগের দিন যে ঘোষণা দেয়া হবে, সেই বিজয় দিল্লির কাছ থেকে পাওয়া নয় এবং এই বিজয় দিল্লির কাছে সমর্পণও করা হবে না। তিনি বলেন, দেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে, যা প্রতিহত করতে সর্বদলীয় ঐক্য অপরিহার্য। অন্তর্বর্তী সরকার জুলাইযোদ্ধাদের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। হাদির ওপর হামলার আগেই একাধিকবার হুমকির তথ্য সরকারকে জানানো হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। হামলার পরও অস্ত্রধারীদের গ্রেফতারে দৃশ্যমান কোনো অভিযান নেই।

সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, এই সময়ের মধ্যে হামলাকারীদের গ্রেফতার করা না হলে ১৫ ডিসেম্বর শহীদ মিনার থেকেই সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলনের ঘোষণা দেয়া হবে। একজন হাদিকে গুলি করে আমাদের লড়াই থামানো যাবে না। ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমাদের আবার রুখে দাঁড়াতে হবে এবং জুলাই বিপ্লবকে পূর্ণ করতে হবে।

এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, বুদ্ধিজীবী কিংবা টকশোজীবী- কোনো ফর্মেই বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্য ঢুকতে দেয়া হবে না। গুলিটি শুধু ওসমান হাদির মাথার ভেতর দিয়ে যায়নি, গুলিটি বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের বিবেকের ভেতর দিয়ে গেছে। গত ১৭ বছর ধরে যারা আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করেছে, তারাই এখন টকশোর বুদ্ধিজীবী, নাট্যকর্মী বা সাংস্কৃতিক কর্মী পরিচয়ে নতুনভাবে সক্রিয় হচ্ছে।

হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ফ্যাসিস্টদের বাংলাদেশে কোনো জায়গা হবে না। সে যে নামেই থাকুক না কেন। গুলশানে জাতীয় পার্টির নামে যারা আবার ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে, ওসমান হাদির রক্তের সময়ে তাদের বাংলাদেশে এক ইঞ্চি জায়গাও দেয়া হবে না। আমার হাদি ভাইয়ের রক্তের শপথ- বাংলাদেশে ভারতের আধিপত্য কোনো ফর্মেই ঢুকতে পারবে না, বুদ্ধিজীবী, টকশোজীবী কিংবা কোনো ইনস্টিটিউশনের মাধ্যমেও নয়। তিনি বলেন, সবাইকে রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, বাংলাদেশ ৫ আগস্টের অতীতে ফিরে যাবে না এবং বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ফিরে আসতে পারবে না। দিল্লির দাসত্ব এ দেশে কায়েম হবে না এবং বাংলাদেশের সাংবাদিক ও সুশীলরা এ দেশের আজাদির লড়াইকে দিল্লির কাছে বেচে দিতে পারবে না। যারা বাংলাদেশের অলিতে-গলিতে আজাদির আকাক্সক্ষা বোঝে না, যারা ওসমান হাদির নাম পর্যন্ত ঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারে না, তারা আগামী দিনের বাংলাদেশে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে।

ফুয়াদ বলেন, লাখো বুলেট দিয়েও এই আজাদির লড়াই বন্ধ করা যাবে না। বাংলাদেশের মাটির রঙ আওয়ামী লীগের পতাকার রঙ নয়, এটি লাল-সবুজের রঙ- এই রঙের জন্য লাখ লাখ মানুষ জীবন দিতে প্রস্তুত আছে এবং আগামীতেও থাকবে। বাংলার আনাচেকানাচে আজাদির লড়াই চলবে এবং শরিফ ওসমান হাদিদের নাম প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নতুন করে পরিচিত করানো হবে। এ সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, শুক্রবার ১২ ডিসেম্বর দুপুরে রাজধানীতে নির্বাচনী প্রচারণাকালে শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়া হয় এবং অস্ত্রোপচারের পর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন।