নির্বাচনী মাঠ ছাড়িয়ে অনলাইনে রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র লড়াই

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

বাংলাদেশে নির্বাচনী পরিবেশে গণসমাবেশ কিংবা লাখো ভোটারের কাছে সরাসরি পৌঁছানোই আর একমাত্র প্রচারণার উপায় নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গান, রিল ও বিভিন্ন কনটেন্টের মাধ্যমে ভিন্নধর্মী নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছে রাজনৈতিক দলগুলো। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণে এখন চলছে একধরনের উন্মত্ত প্রতিযোগিতা।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার। সঙ্গীত কেবল বৃহত্তর ডিজিটাল প্রচারণার একটি অংশ। এর পাশাপাশি ছোট ও নাটকীয় ভিডিও, আবেগঘন ভোটার সাক্ষাৎকার, নীতিগত ব্যাখ্যা এবং ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্যে ভরে উঠেছে অনলাইন পরিসর। চলতি বছরে এই অনলাইন যুদ্ধ সংসদীয় প্রতিযোগিতার বাইরেও একটি বড় রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

কেন অনলাইন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশে প্রায় ১৩ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল, যা আনুমানিক ১৭ কোটি ৬০ লাখ জনসংখ্যার প্রায় ৭৪ শতাংশ।

ডিজিটাল গবেষণা ও বিশ্লেষণ প্ল্যাটফর্ম ডেটা রিপোর্টাল-এর ২০২৫ সালের শেষ দিকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় ছয় কোটি ৪০ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারী, প্রায় পাঁচ কোটি ইউটিউব ব্যবহারকারী, ৯.১৫ মিলিয়ন ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী এবং ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী পাঁচ কোটি ৬০ লাখের বেশি টিকটক ব্যবহারকারী রয়েছে। তুলনামূলকভাবে এক্স (সাবেক টুইটার) ব্যবহারকারীর সংখ্যা কম- প্রায় ১৭.৯ লাখ।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপুল অনলাইন উপস্থিতিই ব্যাখ্যা করে কেন রাজনৈতিক দলগুলো ডিজিটাল প্রচারণায় বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট ভোটারের ৪৩.৫৬ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে। এদের অনেকেই প্রথমবার ভোটার অথবা এমন তরুণ, যারা শেখ হাসিনার শাসনামলে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত বোধ করেছেন। ২০১৩, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন অনিয়ম, বিরোধী দল দমন এবং নির্বাচন বর্জনের কারণে অনেকের কাছে ‘ভুয়া ভোটে’ পরিণত হয়েছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তরুণদের একাংশের মধ্যে এবার ভোটে অংশগ্রহণের দৃঢ় সংকল্প তৈরি হয়েছে।

দলগুলোর অনলাইন কৌশল

এক দিকে রয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট, যারা আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের অভিজ্ঞতার বিপরীতে নিজেকে একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করছে। শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে গণহত্যা, জোরপূর্বক গুম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরছে দলটি। বিএনপি ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-০৬ মেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রচারণা চালাচ্ছে। অন্য দিকে রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট, যার মধ্যে এনসিপিও অন্তর্ভুক্ত।

বিএনপি নেতা মাহদী আমিন আলজাজিরাকে বলেন, দলটি নীতি প্রস্তাব প্রচার এবং ভোটারদের মতামত সংগ্রহে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বিএনপি একটি পরীক্ষিত রাজনৈতিক দল। দেশ পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।’

অনলাইনে সম্পৃক্ততা বাড়াতে বিএনপি গধঃপযগুচড়ষরপু.পড়স নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করেছে। সেখানে ভোটাররা দলটির প্রস্তাবিত নীতির সাথে একমত বা দ্বিমত পোষণ করতে পারেন।

বিএনপির মতো জামায়াতে ইসলামীরও রয়েছে নিজস্ব ওয়েবসাইট- লধহধঃধৎরংযঃবযধৎ.ড়ৎম। দলটির দাবি, এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ভোটারদের মতামত নিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন করা হচ্ছে।

জামায়াত নেতা জুবায়ের আহমেদ বলেন, তাদের অনলাইন প্রচেষ্টা মূলত ‘যেসব বর্ণনায় আমরা বিশ্বাস করি, সেগুলো তুলে ধরার’ দিকে কেন্দ্রীভূত। অন্যান্য দল সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা অন্যদের পর্যবেক্ষণ করি; কিন্তু অনুসরণ করি না। আমাদের প্রতিযোগিতা হবে বুদ্ধিবৃত্তিক।’

অনলাইন যুদ্ধে কে এগিয়ে

বিশ্লেষকরা স্পষ্ট কোনো বিজয়ী ঘোষণায় সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলছেন। ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের অ্যাডজাঙ্কট ফেলো মুবাশ্বার হাসান বলেন, বিএনপি ও জামায়াতের অনলাইন কৌশলে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

তার মতে, বিএনপি তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো সংক্ষিপ্ত ভিডিও, ক্যাপশনযুক্ত রিল এবং শেয়ারযোগ্য গ্রাফিক্সে উপস্থাপন করছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রস্তাবিত ‘পরিবার কার্ড’ কর্মসূচি, যার আওতায় নির্বাচিত হলে ৫০ লাখ নারী ও পরিবারকে মাসে দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা বা প্রয়োজনীয় পণ্য দেয়ার প্রতিশ্রুতি। পাশাপাশি ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে সার, বীজ ও কীটনাশকের ন্যায্যমূল্য, কৃষকদের জন্য প্রণোদনা, সহজ ঋণ ও বীমা সুবিধার কথা বলা হচ্ছে।

অন্য দিকে জামায়াতপন্থী অনলাইন কনটেন্টের বড় একটি অংশ বিএনপিকে আওয়ামী লীগের থেকে ‘ভিন্ন নয়’ বলে আক্রমণ করার দিকে কেন্দ্রীভূত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম দ্য ডিসেন্ট-এর সম্পাদক কদরউদ্দিন শিশির বলেন, জামায়াত-সমর্থিত অনলাইন প্রচারণায় ভারতবিরোধী বার্তাও গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টে দেশ ছাড়ার পর শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাকে ফেরত না দেয়ার বিষয়টি এসব প্রচারণায় তুলে ধরা হচ্ছে। তার মতে, মিম ও কপি করা কনটেন্টের মাধ্যমে এই বার্তা তরুণদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

গণভোটও ভাইরাল

চলতি বছরে অনলাইন যুদ্ধ কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ‘জুলাই সনদ’ নামে পরিচিত রাষ্ট্র সংস্কারের একটি প্যাকেজ নিয়েও চলছে ব্যাপক ডিজিটাল প্রচারণা। শেখ হাসিনার পতনের পর এই সংস্কার প্রস্তাব সামনে আসে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সরকারি ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম আলজাজিরাকে বলেন, ঐতিহ্যবাহী প্রচারণার কার্যকারিতা কমে যাওয়ায় অনলাইন প্রচারণা এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

জুলাই সনদে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করা, নিরাপত্তাবাহিনীর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচন কারচুপি রোধে সুরক্ষাব্যবস্থা, বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা এনসিপিও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অনলাইনে সক্রিয় রয়েছে।

বিশ্লেষক ও কনটেন্ট নির্মাতারা মনে করেন, অফলাইন প্রচারণার গুরুত্ব এখনো অস্বীকার করা যায় না। এই নির্বাচনী মৌসুমে ভাইরাল প্রচারণার গান তৈরি করা জামায়াতপন্থী সুরকার এইচ এ এল বান্না বলেন, ‘নাগাল ও প্রভাবের দিক থেকে শারীরিক প্রচারণার বিকল্প নেই।’ তবে তিনি যোগ করেন, ‘অনলাইন প্রচারণা অফলাইনে মানুষের মধ্যে আলোচনা তৈরি করে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের তরুণ ভোটারদের ক্ষেত্রে এই অনলাইন-অফলাইন সংযোগই জয়-পরাজয়ের পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।