লড়াইটা এমবাপ্পে-ইয়ামালের

ক্রীড়া প্রতিবেদক
Printed Edition
লড়াইটা এমবাপ্পে-ইয়ামালের
লড়াইটা এমবাপ্পে-ইয়ামালের

ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের ২৩তম আসরের আজ প্রথম সেমিফাইনাল। দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের মোকাবেলা করবে ২০১০ শিরোপা জয়ী স্পেন। এই ম্যাচে ফুটবলপ্রেমীদের দৃষ্টি থাকবে দুই দলের দুই সেরা তারকা ফুটবলার কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লামিনে ইয়ামালের দিকে। প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি ফ্রান্সের আক্রমণভাগের প্রধান ভরসা এমবাপ্পে। গতি, দক্ষতা ও গোল করায় যে ক্ষমতা, তাতে যেকোনো সময় ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড। অন্য দিকে দুর্দান্ত নৈপুণ্য ও সৃজনশীল ফুটবলে ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন স্পেনের তরুণ সেনসেশন ইয়ামাল। ফাইনালে উঠার লড়াইয়ে এই ম্যাচটি বাড়তি আকর্ষণীয় করে তুলেছে অভিজ্ঞ এমবাপ্পে ও উদীয়মান ইয়ামালের এই লড়াই। দুই দলের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে এই দুই তারকার পারফরম্যান্সের ওপর। তাই সেমিফাইনাল ঘিরে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন এমবাপ্পে ও ইয়ামাল।

নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছেন এমবাপ্পে

বিশ্বকাপে নিজের সামর্থ্যরে প্রমাণ দিচ্ছেন ফ্রান্সের তারকা ফরোয়ার্ড এমবাপ্পে। গতিময় ফুটবল, নিখুঁত ফিনিশিং এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলকে এগিয়ে নেয়ার অসাধারণ ক্ষমতা দিয়ে তিনি দলের সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারিগর হয়ে উঠেছেন। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই ধারাবাহিক পারফরম্যান্স করে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে আতঙ্ক ছড়িয়েছেন এই ফরাসি তারকা। চলমান আসরে এখন পর্যন্ত আটটি গোল ও তিনটি অ্যাসিস্ট করে গোল্ডেন বুট জয়ের দৌড়ে এগিয়ে আছেন তিনি। এর মাধ্যমে তিনি মোট ১১টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন, যা তাকে টুর্নামেন্টে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শীর্ষে রেখেছে।

টুর্নামেন্টের শুরু থেকে কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচেও প্রতিটি ধাপেই দুর্দান্ত ছিলেন এমবাপ্পে। গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তার গতি ও ড্রিবলিং সামলাতে হিমশিম খেয়েছে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী রক্ষণভাগগুলো। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের একের পর এক কাটিয়ে আক্রমণে নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা তাকে এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত ফুটবলারদের একজন করে তুলেছে।

রাউন্ড অব ১৬-এ ফ্রান্সের জয়ে এমবাপ্পের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোয়ার্টার ফাইনালেও তিনি আক্রমণভাগে নেতৃত্ব দিয়ে দলকে কাক্সিক্ষত জয় এনে দিতে বড় ভূমিকা রাখেন। যদিও প্রতিপক্ষের নজর ছিল তাকে ঘিরে, তবুও নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতায় ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়ার সামর্থ্য দেখিয়েছেন তিনি। তার উপস্থিতি প্রতিপক্ষকে রক্ষণাত্মক কৌশল নিতে বাধ্য করেছে, যা ফ্রান্সের অন্য খেলোয়াড়দের জন্যও সুযোগ তৈরি করেছে।

এমবাপ্পের নেতৃত্বে এখন বিশ্বের অন্যতম ভয়ঙ্কর ইউনিট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, ফ্রান্সের আক্রমণভাগ। শুধু গোল করাই নয়, দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক, বল নিয়ন্ত্রণ এবং ম্যাচের ছন্দ পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও তার অবদান অনন্য। দলের তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন তিনি।

বিশ্বকাপে এমবাপ্পের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাকে আবারো ব্যক্তিগত পুরস্কারের দৌড়ে এগিয়ে রেখেছে। সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার লড়াইয়ের পাশাপাশি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতিও তার নাগালে রয়েছে। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে নিজের অবস্থান আরো শক্ত করেছেন এই ফরাসি তারকা।

সেমিফাইনালের দিকে এখন সবার চোখ, যেখানে ফ্রান্সের সামনে অপেক্ষা করছে কঠিন চ্যালেঞ্জ। স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচে এমবাপ্পের পারফরম্যান্সই অনেকাংশে নির্ধারণ করতে পারে ফরাসিদের ভাগ্য। তার গতি, অভিজ্ঞতা ও গোল করার সহজাত ক্ষমতা কাজে লাগাতে পারলে ফ্রান্স টানা আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালে জায়গা করে নিতে পারে বলে মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।

বিশ্বকাপের মঞ্চে ইতোমধ্যেই নিজেকে বড় ম্যাচের খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এমবাপ্পে। কাতার বিশ্বকাপে আট গোল করে গোল্ডেন বুট নিজের করে নিয়েছিলেন রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড। চলমান আসরেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে তিনি ফ্রান্সকে শিরোপার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। সেমিফাইনালের ম্যাচে শিরোপার দৌড়ে এগিয়ে থাকা ফ্রান্সকে সেরাটা উপহার দিয়ে গৌরবের আরো কাছে নিয়ে যাবেন এই বিশ্বতারকা- এটাই সবার প্রত্যাশা।

স্পেনের সাফল্যের নতুন নায়ক ইয়ামাল

স্পেনের অন্যতম বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছেন তরুণ উইঙ্গার লামিনে ইয়ামাল। অল্পবয়সেই অসাধারণ পরিণত ফুটবল উপহার দিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন বার্সেলোনার এই তরুণ সেনসেশন। তার গতি, ড্রিবলিং, নিখুঁত পাস এবং আক্রমণভাগে সৃজনশীলতা স্পেনকে চলমান ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। কেন তাকে ইউরোপীয় ফুটবলের ভবিষ্যৎ তারকা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, তারই প্রমাণ দিয়ে চলেছেন বিশ্ব ফুটবলের মঞ্চে প্রতিটি ম্যাচেই।

বিশ্বকাপের শুরু থেকেই দুর্দান্ত ছন্দে আছেন ইয়ামাল। গ্রুপ পর্বে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে বারবার চাপে ফেলে স্পেনের আক্রমণে প্রাণ ফিরিয়ে আনেন তিনি। দলের জয়ে একাধিক সুযোগ তৈরি করে সতীর্থদের গোল পেতে সহায়তা করেছেন প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই। তার দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা এবং বল নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা আরো বৈচিত্র্যময় ও কার্যকর করে তুলেছে স্পেনের আক্রমণকে।

নকআউট পর্বে আরো উজ্জ্বল পারফরম্যান্স ছিল ইয়ামালের। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে চাপ সামলে আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলেছেন তিনি। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে ডান প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ গড়ে তোলা এবং বক্সে নিখুঁত ক্রস দেয়ার ক্ষেত্রে তার দক্ষতা স্পেনের জন্য বড় সম্পদ হয়ে উঠেছে। প্রয়োজনের সময় নিজেও গোল করে দলের জয়ে অবদান রেখেছেন।

শুধু আক্রমণেই নয়, দলের রক্ষণভাগকে সহায়তা করতেও পিছিয়ে থাকেননি ইয়ামাল। বল হারানোর পর দ্রুত প্রেসিং এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে দেয়ার চেষ্টাও ছিল চোখে পড়ার মতো। তার এই পরিশ্রমী মানসিকতা আত্মবিশ্বাস আরো বাড়িয়েছে স্পেনের কোচিং স্টাফ এবং সতীর্থদের।

ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, ইয়ামালের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ম্যাচ পড়ার ক্ষমতা। বয়স কম হলেও কখন গতি বাড়াতে হবে, কখন বল ধরে রাখতে হবে কিংবা কখন সতীর্থকে পাস দিতে হবে- এসব বিষয়ে তার সিদ্ধান্ত নেয়ার দক্ষতা প্রতিটি ম্যাচেই হয়েছে প্রশংসিত। বড় ম্যাচেও তিনি ভয়হীন ফুটবল খেলছেন, যা একজন ভবিষ্যৎ বিশ্বতারকার বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চলমান বিশ্বকাপে এই ধারাবাহিকতায় টুর্নামেন্টের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের অন্যতম দাবিদারে পরিণত করেছে ইয়ামালকে। সেই সাথে বিশ্বসেরা একাদশে তার জায়গা পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে চলছে আলোচনা। প্রতিপক্ষের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা করতে বাধ্য করছে স্পেনের আক্রমণভাগে তার উপস্থিতি, তাতে অনেক বেশি সুযোগ তৈরি হচ্ছে দলের অন্য খেলোয়াড়দের।

স্পেনের সামনে সেমিফাইনালে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ইয়ামালের পারফরম্যান্সই অনেকাংশে নির্ধারণ করতে পারে দলের ভাগ্য। স্প্যানিশ তারকার পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট থাকার কথা বললেও, তার কাছ থেকে আরো ভালো কিছুর আশায় আছেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। স্পেন কোচ মনে করেন, বিশ্ব মঞ্চে এখনো নিজের সেরা ম্যাচটা খেলা বাকি আছে ইয়ামালের।

সবশেষ দুই ম্যাচেই পুরো সময় খেলেছেন ইয়ামাল। এখন পর্যন্ত একটি গোলই বিশ্বকাপে ইয়ামালের অর্জন। অ্যাসিস্ট করতে পারেননি একটিও। তবে স্পেনের সেমিফাইনালে ওঠার পথে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাকে আটকে রাখতেই যে প্রতিপক্ষকে দিতে হচ্ছে বাড়তি মনোযোগ। এর সুবিধা পাচ্ছেন স্পেনের অন্য খেলোয়াড়রা।