হুসাইন মালিক চুয়াডাঙ্গা
শীত নামলেই চুয়াডাঙ্গার সরোজগঞ্জ যেন ফিরে পায় তার চিরচেনা রূপ। কুয়াশাভেজা ভোরে খেজুরের রস জ্বাল দেয়ার ধোঁয়া আর গুড়ের মিষ্টি ঘ্রাণে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। প্রায় ৩০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী সরোজগঞ্জ গুড়ের হাট এ সময় রূপ নেয় জনপদের অন্যতম অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্রে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই হাট শুধু ঐতিহ্য নয়, হাজারো মানুষের জীবিকার প্রধান ভরসাও।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শীত মৌসুমে প্রতি সপ্তাহে সোমবার ও শুক্রবার বসে এই হাট। চুয়াডাঙ্গার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা এখানে ছুটে আসেন খাঁটি খেজুর গুড় কিনতে। প্রতি হাটে গড়ে দেড় থেকে দুই কোটি টাকার বেচাকেনা হয়। পুরো মৌসুমে লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ কোটি টাকা।
সরেজমিন দেখা যায়, হাটজুড়ে হাঁকডাক আর দরকষাকষির ব্যস্ততা। কোথাও মাটির ভাঁড়ে সাজানো ঝোলা গুড়, কোথাও নলেন পাটালির স্তূপ, আবার কোথাও ধামা ও কাঠায় সাজানো টাটকা গুড়। মানভেদে বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি গুড় বিক্রি হচ্ছে ২৩০ থেকে ৩৫০ টাকায়। ১২ থেকে ১৬ কেজি ওজনের প্রতিটি ভাঁড়ের দাম এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত। এখান থেকে পাইকাররা গুড় পাঠাচ্ছেন ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
সরাবাড়িয়া গ্রামের গুড় প্রস্তুতকারী সাজ্জাদ হোসেন জানান, খেজুর গাছ থেকে সংগৃহীত রস বিশেষ টিনের জালায় ছেঁকে বড় চুলায় জাল দেয়া হয়। দীর্ঘ সময় ধরে নাড়াচাড়া করে রস ঘন হলে তা গুড়ে রূপ নেয়। শ্রমসাধ্য এই প্রক্রিয়া এখনো ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতেই সম্পন্ন হচ্ছে।
হাটে আসা পাবনার ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সরোজগঞ্জের গুড় মানে খাঁটি স্বাদ ও গুণগত নিশ্চয়তা। দাম একটু বেশি হলেও এখানকার গুড়ের চাহিদা সারা দেশে।’
বালিয়াকান্দি গ্রামের চাষি জামাল উদ্দিন জানান, তিনি ৩৫টি খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে এ মৌসুমে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কেজি গুড় উৎপাদনের আশা করছেন। সাধারণত একটি গাছ থেকে মৌসুমে গড়ে ১০ থেকে ১২ কেজি গুড় পাওয়া যায়।
হাট পরিচালনাকারী আলাউদ্দিন আলা বলেন, বাপ-দাদার আমল থেকেই এই হাট পরিচালনার সাথে জড়িত তারা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যাপারীরা এখানে আসেন। নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হাট কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ নজরদারি রাখে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় দুই লাখ ৭২ হাজার খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ হচ্ছে। গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় দুই হাজার ৭০০ মেট্রিক টন। এ কার্যক্রমকে ঘিরে মৌসুমজুড়ে কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
উপপরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার জানান, খাঁটি ও চিনিমুক্ত গুড় উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। ভেজাল রোধে নিয়মিত তদারকি চলছে। তার মতে, ঐতিহ্য, অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সমন্বয়ে সরোজগঞ্জের গুড়ের হাট আজ শুধু একটি বাজার নয়, এটি এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ।



