নেসকো ইস্যুতে একাট্টা রাজশাহীবাসী প্রধান কার্যালয় সরানো যাবে না

Printed Edition

মুহা: আব্দুল আউয়াল রাজশাহী ব্যুরো

নর্দান ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে বগুড়ায় স্থানান্তরের আলোচনা ঘিরে রাজশাহীতে বিরল এক রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐক্যের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন পর এমন একটি ইস্যুতে রাজনৈতিক মতাদর্শের বিভাজন ভুলে একই দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, আইনজীবী, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষ।

সবার দাবি একটাই- নেসকোর প্রধান কার্যালয় কোনোভাবেই রাজশাহী থেকে সরানো যাবে না।

সর্বশেষ ভূমিমন্ত্রী ও রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মিনুর প্রকাশ্য ঘোষণার পর এই জনমত আরো শক্তিশালী হয়েছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, প্রয়োজন হলে তিনি নিজেই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবেন, কিন্তু নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে সরতে দেবেন না। তার এই অবস্থান আন্দোলনে নতুন গতি এনে দিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেসকো এখন আর কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় রক্ষার প্রশ্ন নয়; এটি রাজশাহীর প্রশাসনিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক স্বার্থ, আঞ্চলিক ভারসাম্য ও আত্মমর্যাদার প্রতীকী লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

যেভাবে শুরু হয় বিতর্ক : ২০১৬ সালের অক্টোবরে যাত্রা শুরু করে নর্দান ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো)। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্ব পালন করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি এবং এর প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতেই স্থাপিত হয়।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রধান কার্যালয় বগুড়ায় স্থানান্তরের আলোচনা সামনে আসে। বগুড়ার শিবগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে উদ্যোগ নেয়ার অনুরোধ জানান। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি যাচাইয়ে একটি কমিটিও গঠন করা হয়।

বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই রাজশাহীতে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। জনমতের চাপে পড়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, আপাতত প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের পরিবর্তে বগুড়ায় একটি আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

নতুন করে উদ্বেগ : বিতর্ক কিছুটা স্তিমিত হলেও সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ১৬ জুলাইয়ের একটি চিঠি প্রকাশ্যে এলে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে প্রধান কার্যালয় স্থানান্তর বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়। এরপর থেকেই রাজশাহীতে আবারো আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ে যে, বিষয়টি নীরবে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে।

এ দিকে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেখানে তিনি বলেন, ‘হোক না বগুড়ায় হেড অফিস, আপনারা জোনাল অফিস নেন।’ পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, বগুড়ার উন্নয়নের প্রশ্নে তারা কোনো ছাড় দেবেন না।

এই বক্তব্য রাজশাহীতে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ এটিকে রাজশাহীর প্রতি অবমূল্যায়ন হিসেবে আখ্যা দেন।

মিনুর কড়া অবস্থান : এমন পরিস্থিতিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসের এক অনুষ্ঠানে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু নেসকো ইস্যুতে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন।

তিনি বলেন, শুধু নেসকো নয়, রাজশাহীর কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এখান থেকে সরানোর সুযোগ নেই। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হলে তিনি নিজেই আন্দোলনে নামবেন।

১৯৯২ সালে রাজশাহীর মেয়র থাকাকালে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের সদর দফতর অন্যত্র নেয়ার উদ্যোগ আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিহত করার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নেসকোর ক্ষেত্রেও একইভাবে রাজশাহীর স্বার্থ রক্ষা করা হবে।

তিনি আরো বলেন, মন্ত্রিত্ব কিংবা সংসদ সদস্যের পদ নয়, তার কাছে রাজশাহীর স্বার্থই সবচেয়ে বড়। প্রয়োজনে সেই স্বার্থ রক্ষায় যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতেও তিনি প্রস্তুত।

এক কাতারে রাজনৈতিক দল : নেসকো ইস্যুতে রাজশাহীর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরল ঐকমত্য দেখা গেছে।

রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন অর রশিদ মামুন বলেন, ‘নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতেই থাকবে। প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আপনি বগুড়াকে সোনা দিয়ে মুড়িয়ে দেন, আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতেই থাকবে।’

মহানগর বিএনপির সহসভাপতি নজরুল হুদা বলেন, কোনো চাপের মুখে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হলে রাজশাহীবাসী কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলবে।

জামায়াতে ইসলামীর রাজশাহী মহানগর সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন মণ্ডল বলেন, নেসকোর প্রধান কার্যালয় স্থানান্তর করা হলে বিদ্যুৎসেবার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেষ্টা হলে রাজশাহীবাসী রাজপথে নামবে।

এনসিপির রাজশাহী মহানগর আহ্বায়ক মোবাশ্বের আলী বলেন, কোনোভাবেই নেসকোর প্রধান কার্যালয় বগুড়ায় স্থানান্তর করতে দেয়া হবে না।

আইনজীবীদেরও প্রতিবাদ : নেসকোর প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের উদ্যোগের প্রতিবাদ জানিয়েছে রাজশাহী অ্যাডভোকেট বার অ্যাসোসিয়েশন। অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো: আবুল কাসেম ও সাধারণ সম্পাদক পারভেজ তৌফিক জাহেদী স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতে রয়েছে। বিভাগীয় শহর হিসেবে রাজশাহীর প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। প্রধান কার্যালয় অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ রাজশাহীবাসীর ন্যায্য অধিকার ও স্বার্থের পরিপন্থী।

অর্থনীতিবিদের দৃষ্টিতে : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক প্রোভিসি ড. ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে বগুড়ায় স্থানান্তরের বাস্তব প্রয়োজন থাকলে তা অবশ্যই বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে কোনোভাবেই আঞ্চলিকতা বা রাজনৈতিক বিবেচনায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়। কারণ এর সাথে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয় জড়িত।

তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের আগে এর ব্যয়, অর্থনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।

ড. ফরিদ উদ্দিন খান আরো বলেন, নেসকোর গ্রাহকদের পক্ষ থেকে সেবা নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো অভিযোগ নেই। তাই আবেগ নয়, বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।

তিনি বলেন, নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতে থাকায় এ অঞ্চলে কর্মসংস্থানসহ নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠেছে। ফলে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

কেন গুরুত্বপূর্ণ নেসকোর প্রধান কার্যালয় : বিশ্লেষকদের মতে, একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় কোনো শহরে থাকলে সেই শহরের প্রশাসনিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি সরকারি কার্যক্রম, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, আবাসন, পরিবহন ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও সম্প্রসারিত হয়।

তাদের মতে, নেসকোর প্রধান কার্যালয় অন্যত্র স্থানান্তরিত হলে শুধু একটি অফিসই সরবে না; দীর্ঘমেয়াদে রাজশাহীর প্রশাসনিক অবস্থান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হবে। একই সাথে ভবিষ্যতে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান স্থানান্তরেরও একটি নজির তৈরি হতে পারে।

রাজনীতিরও বড় পরীক্ষা : রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নেসকো ইস্যু এখন রাজশাহীর রাজনীতির জন্যও একটি বড় পরীক্ষা। স্থানীয় জনগণের স্বার্থ রক্ষায় কে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, সেটি এই ইস্যুর মাধ্যমে মূল্যায়িত হবে।

তাদের মতে, প্রধান কার্যালয় স্থানান্তর ঠেকাতে ব্যর্থ হলে স্থানীয় নেতৃত্বকে জনগণের কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারে। আবার রাজশাহীর স্বার্থ রক্ষায় দৃশ্যমান ভূমিকা রাখতে পারলে সেটি রাজনৈতিকভাবেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

নেসকোর প্রধান কার্যালয়কে ঘিরে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন আর কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি রাজশাহীর মানুষের অধিকার, আত্মমর্যাদা, প্রশাসনিক মর্যাদা, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং উন্নয়ন রক্ষার প্রতীকী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

এখন সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজশাহীবাসী। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট- এই ইস্যুতে রাজশাহীর মানুষ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ। রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে তাদের একটাই দাবি- নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতেই থাকতে হবে।