সহ্য করা মানেই মর্যাদা নয় : সানাম সাঈদের বার্তা

সানাম তার লেখনীতে অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন আমাদের সমাজব্যবস্থার সেই রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকা বিষাক্ত ধারণাকে, যেখানে একজন নারীর সহনশীলতা আর মুখ বুজে সব সহ্য করাকে ‘মর্যাদা’ বা ‘মহত্ত্ব’ হিসেবে তকমা দেয়া হয়। তিনি জেবাকে সম্বোধন করেছেন ‘মিষ্টি ও বাধ্য’ মেয়ে হিসেবে, কিন্তু সেই সাথে প্রশ্ন তুলেছেন এই বাধ্য হওয়ার আড়ালে নিজের ভবিষ্যৎ, মানসিক শান্তি এবং আত্মপরিচয় বিসর্জন দেয়া কি আদৌ কোনো সমাধান? সানাম সাঈদের এই সাহসী বার্তার মূল সুর ছিল আত্মরক্ষা।

সাকিবুল হাসান
Printed Edition

সাধারণত অভিনেতা-অভিনেত্রীরা যখন কোনো চরিত্রকে বিদায় জানান, তখন সেখানে কেবল নস্টালজিয়া বা কাজের প্রতি কৃতজ্ঞতা থাকে। কিন্তু এআরওয়াই ডিজিটালের জনপ্রিয় নাটক ‘কাফীল-এর প্রথম অধ্যায় শেষে সানাম সাঈদ তার চরিত্র ‘ জেবা’র উদ্দেশ্যে যে বার্তাটি দিয়েছেন, তা যেন গতানুগতিক অভিনয়ের গণ্ডি পেরিয়ে এক সামাজিক ইশতেহারে পরিণত হয়েছে। সানাম তার লেখনীতে অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন আমাদের সমাজব্যবস্থার সেই রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকা বিষাক্ত ধারণাকে, যেখানে একজন নারীর সহনশীলতা আর মুখ বুজে সব সহ্য করাকে ‘মর্যাদা’ বা ‘মহত্ত্ব’ হিসেবে তকমা দেয়া হয়। তিনি জেবাকে সম্বোধন করেছেন ‘মিষ্টি ও বাধ্য’ মেয়ে হিসেবে, কিন্তু সেই সাথে প্রশ্ন তুলেছেন এই বাধ্য হওয়ার আড়ালে নিজের ভবিষ্যৎ, মানসিক শান্তি এবং আত্মপরিচয় বিসর্জন দেয়া কি আদৌ কোনো সমাধান? সানাম সাঈদের এই সাহসী বার্তার মূল সুর ছিল আত্মরক্ষা। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, ‘নিজেকে বিসর্জন দিয়ে সারাজীবন দুর্দশার মধ্যে বেঁচে থাকা আসলে কারো উপকারে আসে না।’ তার মতে, মানুষের জীবন একটাই এবং সেই জীবনে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা স্বার্থপরতা নয়, বরং বেঁচে থাকার প্রাথমিক শর্ত। তিনি নারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা কেবল পারিবারিক আনুগত্য, ঐতিহ্য, লজ্জা কিংবা অপরাধবোধের চাপে পিষ্ট হয়ে নিজেদের ‘গাট ফিলিং’ বা সহজাত বোধকে বিসর্জন না দেন। কারণ অনেক সময় আমাদের চারপাশের মানুষ ও পরিবেশ আমাদের বিচারবুদ্ধিকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলে যে, আমরা নিজেদের প্রয়োজনগুলো ভুলে যেতে শুরু করি। এই নোটের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো বিয়ের ব্যাপারে সানামের দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি বিয়েকে অবাস্তব রূপকথার মতো করে দেখেননি, আবার একে স্রেফ নেতিবাচক হিসেবেও চিত্রায়িত করেননি। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, একটি সার্থক জীবনের জন্য বিয়ের চেয়েও বেশি জরুরি হলো নিরাপত্তা, শিক্ষা, আর্থিক স্বনির্ভরতা এবং মানসিক স্থিতি। বিয়ে তখনই সম্মানজনক হয় যখন সঙ্গী হিসেবে দুজন মানুষ একে অপরের স্বপ্নকে শ্রদ্ধা করে এবং একে অপরের বিকাশে সহায়ক হয়। উমেরা আহমেদের শক্তিশালী লেখনীতে জেবা চরিত্রটি সেইসব বাস্তব নারীদের প্রতিচ্ছবি, যারা সংসার, সন্তান এবং চাকরির চাপে পিষ্ট হতে হতে ভুলে গেছে তারা একসময় স্বপ্ন দেখতে জানত। জেবার স্বামী জামশেদ (ইমাদ ইরফানি অভিনীত) নিজের ব্যর্থতা আর নিরাপত্তাহীনতার দায় যখন জেবার ওপর চাপিয়ে দেয় এবং মৌখিক নির্যাতনে লিপ্ত হয়, তখন সেটি আর স্রেফ সাংসারিক ঝগড়া থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে এক চরম শোষণ। সানাম তার বার্তায় দর্শকদের কাছ থেকে পাওয়া হাজারো চিঠির কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে নারীরা জানিয়েছেন জেবার যন্ত্রণার সাথে তাদের নিজেদের জীবনের কতটা মিল।

এটি প্রমাণ করে যে, দর্শক কেবল রঙিন স্বপ্ন দেখতে নাটক দেখে না, বরং তারা নিজেদের জীবনের কঠিন বাস্তবতাগুলোর প্রতিফলনও পর্দায় দেখতে চায়। সানাম এই বার্তায় অভিভাবকদেরও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। কারণ যে শোষণের যাঁতাকলে জেবার মতো নারীরা পিষ্ট হয়, তার কলকাঠি কেবল স্বামীরা না, অনেক সময় বাবা-মায়েরাও নাড়েন।