ফ্রান্সে ফোনে অনাকাক্সিক্ষত কল নিষিদ্ধে নতুন আইন

Printed Edition

ফ্রান্স থেকে প্রতিনিধি

ফ্রান্সে অনাকাক্সিক্ষত টেলিফোন কলের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ১১ আগস্ট থেকে গ্রাহকের পূর্বানুমতি ছাড়া টেলিফোনে বাণিজ্যিক প্রচারণা বা ‘দেমার্শাজ তেলেফোনিক’ নিষিদ্ধ হচ্ছে। ভোক্তাদের হয়রানি কমানোর পাশাপাশি টেলিফোনভিত্তিক প্রতারণা দমনে নতুন এই আইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে ফরাসি সরকার।

ফ্রান্সের বহু নাগরিক দীর্ঘদিন ধরে অনাকাক্সিক্ষত বাণিজ্যিক ফোনকল নিয়ে অভিযোগ করে আসছেন। ৬৫ বছর বয়সী ফ্রঁ-কমতে অঞ্চলের বাসিন্দা ও ইংরেজি শিক্ষিকা ওদিলের অভিজ্ঞতাও একই। মোবাইল ফোনের প্যাকেজ, বাড়ির তাপ নিরোধক, বিদ্যুৎ বিলসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রায়ই তাকে ফোন করা হয়। কখনো কখনো এসব কল প্রতারণামূলকও হয়ে থাকে। তার ভাষায়, বিষয়টি এতটাই বিরক্তিকর যে ফোনদাতাদের থামাতে তাকে ‘হয়রানি’ ও ‘অভিযোগ’ করার মতো শব্দ ব্যবহার করতে হয়।

একটি ভোক্তা জরিপ অনুযায়ী, ফ্রান্সের ৯৭ শতাংশ মানুষ টেলিফোনে বাণিজ্যিক প্রচারণায় বিরক্ত। এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ জানান, তারা প্রতিদিন মোবাইল ফোনে এ ধরনের কল পান। সরকারের মতে, নতুন আইনটি ফরাসি নাগরিকদের দীর্ঘদিনের একটি বড় প্রত্যাশার জবাব।

নতুন আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, কোনো কোম্পানিকে এখন আর গ্রাহকের আপত্তি না থাকা পর্যন্ত ফোন করার সুযোগ দেয়া হবে না। বরং বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ফোন করার আগে গ্রাহকের স্পষ্ট ও অবহিত সম্মতি নিতে হবে। ফ্রান্সের অর্থ মন্ত্রণালয় ‘বেরসি’র ভাষায়, দেশটি এতদিনের ‘আপত্তির ব্যবস্থা’ থেকে এখন ‘পূর্বানুমতির ব্যবস্থায়’ যাচ্ছে।

কোনো পণ্য কেনার সময় কিংবা অনলাইন ফর্ম পূরণের মাধ্যমে গ্রাহকের সম্মতি নেয়া যেতে পারে। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ ‘সিএনআইএলে’র সুপারিশ হলো, সম্মতি নেয়ার ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট চেকবক্স ব্যবহার করা। তবে নতুন নিয়মে কিছু ব্যতিক্রমও রাখা হয়েছে। কোনো কোম্পানির সাথে গ্রাহকের সক্রিয় চুক্তি থাকলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তাকে ফোন করা যেতে পারে। সংবাদপত্রের সাবস্ক্রিপশন বিক্রির ক্ষেত্রেও বিশেষ ব্যতিক্রম থাকবে।

অনাকাক্সিক্ষত ফোনকল বন্ধে ২০১৬ সালে চালু করা হয়েছিল ‘ব্লকতেল’ ব্যবস্থা। যেসব গ্রাহক এ ধরনের কল চান না, তারা সেখানে নিজেদের ফোন নম্বর নিবন্ধন করতে পারতেন। কিন্তু নতুন আইন কার্যকর হওয়ার সাথে সাথে এই ব্যবস্থার অবসান ঘটবে। ১১ আগস্ট থেকে ব্লকতেল আর থাকবে না।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন ‘ক্য জোয়াজির অঁসঁম্বথল’-এর মতে, নতুন আইনটি ভোক্তাদের জন্য একটি বড় বিজয়। সংগঠনটির প্রতিনিধিরা মনে করেন, এতে অনাকাক্সিক্ষত ফোনকলের সংখ্যা কমবে।

নতুন আইন টেলিফোনভিত্তিক প্রতারণা শনাক্ত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো কোম্পানি যদি গ্রাহকের সম্মতি ছাড়াই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ফোন করে, তাহলে সেটি সম্ভাব্য অবৈধ কার্যক্রম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

আইন অমান্য করলে শাস্তিও কঠোর। অবৈধ টেলিফোন ডেমার্শাজের জন্য একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রতি কল ৭৫ হাজার ইউরো পর্যন্ত এবং কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রতি কল তিন লাখ ৭৫ হাজার ইউরো পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। অবৈধ কলের মাধ্যমে কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রি হলে সেটিকে প্রতারণামূলক বাণিজ্যিক কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির সর্বোচ্চ তিন লাখ ইউরো এবং কোনো প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১৫ লাখ ইউরো জরিমানা হতে পারে। প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বার্ষিক টার্নওভারের ১০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানার বিধানও রয়েছে।

কোনো দুর্বল বা অসহায় ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে প্রতারণা বা তার দুর্বলতার সুযোগ নেয়ার ঘটনা প্রমাণিত হলে শাস্তি আরো কঠোর হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ লাখ ইউরো জরিমানার বিধান রয়েছে।

টেলিফোনভিত্তিক প্রতারণার ব্যাপকতা বোঝা যায় সরকারি অভিযানের পরিসংখ্যান থেকেও। ২০২৫ সালে দিজিসিসিআরএফ মোট ছয় হাজার ৩০০টি প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ বা পরিদর্শন করে এবং এক কোটি ১০ লাখ ইউরো জরিমানা আরোপ করে।

তবে কর্তৃপক্ষের সামনে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রতারকরা ক্রমেই নতুন কৌশল ব্যবহার করছে এবং তাদের মোকাবেলায় সরকারি সংস্থাগুলোর সক্ষমতা ও জনবল আরো বাড়ানো প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি অনেক ফরাসি নাগরিক অনাকাক্সিক্ষত কল ঠেকাতে কল-ব্লকার অ্যাপ ব্যবহার করছেন। এমনই একটি অ্যাপ ‘সারাক্রশ’। ২০২৫ সালে চালু হওয়ার পর ফ্রান্সে ইতোমধ্যে ২০ লাখের বেশি ব্যবহারকারী এই অ্যাপ ব্যবহার করছেন বলে এর নির্মাতার দাবি।

সবমিলিয়ে, ১১ আগস্ট থেকে ফ্রান্সে টেলিফোনভিত্তিক বাণিজ্যিক প্রচারণার ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। ফলে ভোক্তা সুরক্ষা জোরদার করার পাশাপাশি টেলিফোন প্রতারণা মোকাবেলায় এটি ফ্রান্সের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।