নয়া দিগন্ত ডেস্ক
হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক সীমানার বাইরে দ্রুতই একটি নতুন ‘নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে তেহরান। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা ও শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মহসেন রেজাই রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে এই তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, মার্কিন নৌ অবরোধের কেন্দ্রবিন্দু থেকেই এই নিয়ন্ত্রিত সীমানা শুরু হবে এবং তা উপসাগরের নানা অংশে বিস্তৃত থাকবে। নতুন নির্ধারিত সীমানায় প্রবেশের চেষ্টা করলে যেকোনো নৌযানের ওপর তাৎক্ষণিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। খবর আলজাজিরার।
একই সাথে ওমানের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য একটি নতুন আন্তর্জাতিক নৌ-করিডর নির্ধারণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এই নিরাপত্তা উপদেষ্টা। ইরান নিজেই এই করিডরটি তদারকি ও পরিচালনায় থাকবে এবং আগামী অল্প কিছু দিনের মধ্যে এ-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে বলে জানান তিনি। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেছেন, প্রস্তাবিত এই নৌপথ দিয়ে কোন জাহাজ প্রবেশ করবে আর কোন জাহাজ বের হবে- সেই সিদ্ধান্ত তেহরানই নেবে।
ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে একটি অস্থায়ী নৌপথ চালুর বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছে। এই পথের কিছু অংশ দুই দেশের জলসীমার মধ্য দিয়ে যাবে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবহন হতো। যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আবার চালু করার কূটনৈতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবেই দুই দেশ এখন আলোচনা করছে।
রেজাই স্পষ্ট করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা ও ইরান যেসব কার্যক্রমকে অন্তর্ঘাতমূলক বলে মনে করে, সেগুলো থেকে বিরত থাকলেই কেবল তেহরান হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার নিশ্চয়তা দেবে। তিনি জানান, জুনে স্বাক্ষরিত মার্কিন-ইরান সমঝোতা স্মারকের মূল সমস্যা ছিল গ্যারান্টির অভাব। মধ্যস্থতাকারীরাও সেই সমঝোতা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দিতে পারেননি। ওই চুক্তির আওতায় ওয়াশিংটনকে ইরানের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেয়ার কথা ছিল। অন্য দিকে তেহরানের দায়িত্ব ছিল হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে বিরোধের জেরে সেই চুক্তি ভেঙে যায়।
নতুন নৌপথ নিয়ে আলোচনা চললেও রেজাই জোর দিয়ে বলেছেন, বর্তমানে হরমুজ প্রণালী ‘সম্পূর্ণ বন্ধ’ রয়েছে। প্রতিদিন এই নৌপথ দিয়ে সর্বোচ্চ সাত-আটটি জাহাজ চলাচল করছে। এর মধ্যে পাঁচ-ছয়টি জাহাজ ইরানের প্রয়োজনীয় পণ্য বহন করছে। মার্কিন বাহিনী মাঝেমধ্যে ওমানের কাছাকাছি নৌসীমা দিয়ে কয়েকটি জাহাজ চলাচলে সহায়তা করে বলেও তিনি দাবি করেন। তবে সেসব জাহাজ সাধারণত হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় এবং অক্ষত অবস্থায় গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। এ ধরনের চলাচলকে হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেয়া বলা যায় না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। নৌপথটি কতটা খোলা রয়েছে, তা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের বক্তব্যও পরস্পরবিরোধী।
রেজাই আরো জানান, ইরান শিগগিরই হরমুজ প্রণালীর আশপাশে একটি নিয়ন্ত্রিত এলাকা ঘোষণা করবে। ওই এলাকায় প্রবেশকারী জাহাজগুলোকে ইরানের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রাখা হবে। তেহরানের অনুমতি ছাড়া সেসব জাহাজ আর হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করতে পারবে না। তিনি বলেন, ইরান এই নৌপথে বিধিনিষেধ আরো কঠোর করছে। তার দাবি, সেখানে তেহরানের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রভাবের চেয়েও বেশি হবে।
সামরিক দিক থেকে রেজাই বলেন, ৪৮ ঘণ্টা আগে ইরান প্রথমবারের মতো দেশটিতে তৈরি একটি যুদ্ধজাহাজ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের একটি নৌযানের বিরুদ্ধে পরীক্ষা করেছে। দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সমুদ্রপথে সংঘর্ষের সময়ই তার এসব মন্তব্য এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড শনিবার জানিয়েছে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দু’টি মার্কিন নৌযান লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর মার্কিন বাহিনী ইরানের তিনটি অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে।
এই সঙ্ঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন রেজাই। তিনি বলেছেন, ইরানের কাছে খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। একই সাথে দেশটি এখনো তেল বিক্রি করছে এবং রফতানি করা তেলের অর্থও পাচ্ছে। এমন এক সময়ে রেজাই এই মন্তব্য করলেন, যখন ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে দেশটির তেল রফতানি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। উল্লেখ্য, সরকারের রাজস্ব এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মূল প্রধান উৎসই হলো এই তেল রফতানি।
হরমুজ নিয়ন্ত্রণে ৪ মাসব্যাপী মার্কিন গোপন অভিযান
ইরানের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল করতে হরমুজ প্রণালীর ওপর চার মাস ধরে এক গোপন অভিযান পরিচালনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক বিশেষ খবরে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক সঙ্ঘাত চলাকালে মূলত রাতের আঁধারে নেভি সিল ডুবুরি, শক্তিশালী রোবোটিক বোট এবং উন্নত প্রযুক্তির বিশেষায়িত ডুবোযান ব্যবহার করে এ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাতাস ভরা বিশেষ নৌকাযোগে মার্কিন ডুবুরিদের ছোট দল সমুদ্রসীমায় প্রবেশ করে। একই সময় সমুদ্রের তলদেশে পেতে রাখা বিস্ফোরক বা মাইন শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সোনার যুক্ত চালকবিহীন জলযান ও বিশেষ ডুবোযান। শনাক্তকৃত মাইনগুলো নিখুঁতভাবে নিষ্ক্রিয় বা ধ্বংস করতে ডুবুরিরা সরাসরি সেগুলোতে বিস্ফোরক সংযুক্ত করত, আবার অনেক ক্ষেত্রে দূরনিয়ন্ত্রিত রোবোটিক যন্ত্রের সাহায্যে সেগুলোর বিস্ফোরণ ঘটানো হতো। পুরো চার মাসের এই বিপজ্জনক অভিযানে কোনো মার্কিন সদস্য হতাহত হননি বলে জানানো হয়েছে।
পারমাণবিক চুক্তি না হওয়ার ইঙ্গিত
তেহরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত পারমাণবিক চুক্তি শেষ পর্যন্ত না-ও হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের মধ্যে ওয়াশিংটন চুক্তির টেবিলে বসার বদলে তেহরানের পারমাণবিক অবকাঠামো ধ্বংস করে দেয়ার দিকেই আপাতত বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল এবিসি নিউজের ‘দিস উইক’ অনুষ্ঠানে দেয়া সাক্ষাৎকারে রাইট বলেন, ‘ইরানের সাথে কোনো পারমাণবিক চুক্তি না-ও হতে পারে। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির যে লক্ষ্য ইরানের রয়েছে, তা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়ার মাধ্যমেই হয়তো এর নিষ্পত্তি হবে।’ যুক্তরাষ্ট্র এর আগে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে ব্যবহৃত হচ্ছে, এমন একাধিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। তবে তেহরান শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল বেসামরিক ও শান্তিপূর্ণ কাজের জন্য, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। সাক্ষাৎকারে উপস্থাপক যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক পথ ছেড়ে লাগাতার বোমা বর্ষণের কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুললে সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দেন রাইট।



