‘দাবি না মানলে যে পথে গেছে শেখ হাসিনা, সে পথে যাবে তারেক জিয়া’

ময়মনসিংহে ১১ দলীয় ঐক্যের সমাবেশে বক্তারা

Printed Edition
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও জনদুর্ভোগ লাঘবের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের ময়মনসিংহ বিভাগ আয়োজিত সমাবেশে নেতৃবৃন্দ : নয়া দিগন্ত
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও জনদুর্ভোগ লাঘবের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের ময়মনসিংহ বিভাগ আয়োজিত সমাবেশে নেতৃবৃন্দ : নয়া দিগন্ত

ময়মনসিংহ অফিস

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও জনদুর্ভোগ লাঘবের দাবিতে ময়মনসিংহের ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে বক্তারা বলেছেন, গণভোটের রায় কার্যকর না করলে রাজপথে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চলবে। দাবি না মেনে বিএনপি যদি ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ৭০ ভাগ মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলবার চেষ্টা করে তাহলে, যে পথে গেছে শেখ হাসিনা, সে পথে যাবে তারেক জিয়া।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মুহাম্মদ মামুনুল হক বলেছেন, ‘কৃষক কার্ড আর ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে দেশের ৭০ ভাগ মানুষের ভোটের রায় নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে চান, তাহলে যে পথে গেছেন শেখ হাসিনা সেই পথে যাবেন তারেক রহমান।’ গণভোটে ৭০ ভাগ মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে তার শান্তিপূর্ণ বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘যদি বর্তমান সরকার দাবি মানতে ব্যর্থ হয় আর যদি বিএনপি ও তারেক জিয়া পাকিস্তানি স্বৈরশাসক ও ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার মতো জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে সেই পথে হাঁটে তা হলে, বিএনপি ও তারেক জিয়ার ভিন্ন ভাগ্য হবে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড দিচ্ছেন ভালো কথা, কৃষক কার্ড দিচ্ছেন ভালো কথা, মনে রাখবেন শুধুমাত্র টাকার বিনিময়ে জনগণের সম্মান ও মর্যাদা কিনতে পারবেন না।’ তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা মনে করেছিল পদ্মা সেতু আর মেট্রোরেল দিলেই বাংলাদেশের মানুষ তাদের আত্মমর্যাদা ও সম্মান শেখ হাসিনার কাছে বিকিয়ে দিবে। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশের আত্মঅভিমানী মানুষ না খেয়ে থাকতে পারে কিন্তু তারা তাদের সম্মান ও গৌরব কোনো স্বৈরাচারীর পায়ের নিচে পিষ্ট হতে দেয় না। ইনশা আল্লাহ সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত থাকুন আমরা মানুষের অধিকার আদায় করেই ঘরে ফিরব ইনশা আল্লাহ’ বলেন তিনি।

আল্লামা মামুনুল হক বলেন, ‘পনের বছর পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্বের ব্যর্থতার ফলস্বরূপ এ দেশের যুবকেরা প্রাণ দিয়েছে। মানুষ জীবন দিয়েছে, রক্ত দিয়েছে ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরে, আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ঘিরে আন্দোলনে এবং ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে। সেই রক্তের সাগর পেরিয়েই ৫ আগস্ট বাংলার মানুষ নতুন স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে এনেছে।’

মামুনুল হক বলেন, বাংলার মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে তারা কোনো কঠিন পথ অবলম্বন করতেও কুণ্ঠিত হবেন না। ব্যক্তিগত ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য নয় বরং দেশের মানুষের সম্মান ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তারা জনগণের দুয়ারে দুয়ারে যাচ্ছেন। তিনি দাবি করেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন অনুষ্ঠিত গণভোটে দেশের জনগণ জুলাই বিপ্লবের আকাক্সক্ষার পক্ষে রায় দিয়েছে এবং ৭০ শতাংশ ভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হয়েছে। স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন ধরে দুই দলীয় শাসনের কারণে জনগণ নিষ্পেষিত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শেখ হাসিনার শাসনামলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘গুম, খুন, দমন-পীড়ন ও ভোটাধিকার হরণের মাধ্যমে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করা হয়েছিল। ২০১৪ সালের বিনাভোট, ২০১৮ সালের রাতের ভোট এবং ২০২৪ সালের ‘ডামি নির্বাচন’-এর মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

জুলাই সনদ প্রসঙ্গে আল্লামা মামুনুল হক অভিযোগ করেন, ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে দীর্ঘ আলোচনার পর রাজনৈতিক দলগুলো যে সংস্কার প্রস্তাবে একমত হয়েছিল, বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু ব্যক্তির সাথে সমঝোতা করে তা নষ্ট করেছে। তিনি বিএনপিকে উদ্দেশ করে বলেন, সংস্কারের আকাক্সক্ষা উপেক্ষা করে কোনো ‘চোরাই পথ’ অবলম্বন করা হলে তা দলটির জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে।

গতকাল শনিবার বিকেলে ময়মনসিংহ নগরীর রেলওয়ে কৃষ্ণচূড়া চত্বরে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ ও ময়মনসিংহ অঞ্চল পরিচালক অধ্যক্ষ মো: শাহাবুদ্দিনের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলম পারওয়ার ও জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া। বক্তব্য রাখেন নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির মাওলানা আবদুল কাইয়ুম সোবহানী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা: মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় নাগরিক পার্টির সহসভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট আওরঙ্গজেব বেলাল, মঞ্জুরুল ইসলাম ভূঁইয়া, হেদায়েতুল্লাহ হাদীসহ ১১ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জনগণের দুর্ভোগ দূর করাই এখন সময়ের প্রধান দাবি। গণভোটের রায় কার্যকর না করলে রাজপথে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চলবে। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে বিরোধী জোটকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তবে দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে বিরোধী দল নির্বাচনের ফল মেনে নিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন। মিয়া গোলাম পারওয়ার বলেন, বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে মিলে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে আমাদের হারিয়েছে। তা না হলে আমরা ১৮০ সিট নিয়ে সংসদে যেতাম। গুপ্ত বিএনপির লোকেরা অন্তর্বর্তী সরকারে থেকে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা বলে স্বীকার করেছেন। আমাদের নেতা সংসদে বলেছেন, কষ্ট হলেও নির্বাচনের ফলাফল আমরা মেনে নিয়েছি দেশের রাজনীতিকে স্থিতিশীল করে এবং দেশের রাজনৈতিক সঙ্ঘাত দুর্নীতি বৈষম্যকে দূর করে নতুন বাংলাদেশ গড়তে। তিনি বলেন, সময় আসছে কারা কারা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে জড়িত প্রকাশ পাবে। তারাই বলবে ‘আমি কলা খাই না।’ তিনি জুলাই সনদ প্রসঙ্গে বলেন, জুলাই সনদের জন্য ৩৩টি রাজনৈতিক দল ৭২টি মিটিং করেছি। ৮৪টি সংশোধনীতে একমত হয়েছি। জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন করেছি। চার মাস চলে গেছে আজও জুলাই সনদের গণভোটে ৭০ ভাগ মানুষের রায়কে কার্যকর করা হচ্ছে না। জুলাই সনদে দলীয়মুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য সংস্কার করেছিলাম। এখন বিএনপি মানছে না। এই সনদ কার্যকর হলে যেই ক্ষমতায় যেত সে আর শেখ হাসিনার মতো স্বৈরাচার হতে পারত না। তিনি বলেন, গণভোটের রায় কার্যকর না করে সংবিধান সংশোধন না করে বিএনপি দলীয়করণ শুরু করেছে। বিএনপির ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এখন ‘সবার আগে বিএনপি’তে পরিণত হয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংসদে বিরোধী দলকে দেখে না। দলীয় এমপিদের ৮০ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দিয়েছে বিরোধী দলকে দেয়নি। তিনি বলেন, ‘গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে আমাদের আন্দোলন চলবে। গণভোটের রায় কার্যকর না করলে রাজপথে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চলবে।’

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া বলেন, ‘গুম, খুনসহ জুলাই গণহত্যার বিচারের কোনো অগ্রগতি নেই।’ প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘মালয়েশিয়ার শ্রম বাজারের ব্যাপারে কোনো সুখবর নেই। চীন থেকে কিছুই পাওয়া যায়নি। পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যর্থতার প্রমাণ দিলেন এটা দেশের মানুষ দেখেছে।’ তিনি বলেন, ‘জনগণ গণভোটে যে রায় দিয়েছে, সরকার তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। একই সাথে সংবিধান সংস্কার, বিচার এবং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। সরকার জনগণবিরোধী অবস্থান নিলে বিরোধী দল হিসেবে আন্দোলনের পথ বেছে নেয়া হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি। বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা: মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, ‘আমাদের লড়াই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। এক সময় আমরা লড়াই করেছি, আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এখন আমাদেরকে লড়াই করতে হচ্ছে বিএনপির ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এক সময় জামায়াতকে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করেছিল। এখন বিএনপিও জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধের দাবি করছে।’ বিএনপি পৌরসভা, সিটি করপোরেশন দখল করেছে। ইঞ্জিনিয়ারিং করে সংসদ দখল করেছে। পরিকল্পিতভাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার, মামুনুল হক, অলি আহমদের ছেলে এবং হামিদুর রহমান আজাদকে হারিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।