- চলমান ঋণ কিস্তির ১৩০ কোটি ডলার জুলাইতে ছাড় হতে পারে
- আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সাথে অর্থমন্ত্রীর বৈঠক
যুদ্ধের কারণে জ¦ালানি তেল আমদানিতে বাড়তি ব্যয় মেটানোর জন্য আইএমএফের কাছে অতিরিক্ত ঋণ সহায়তা চাইবে বাংলাদেশ। একই সাথে চলমান ঋণ কর্মসূচির কিস্তির ১৩০ কোটি ডলার আগামী জুলাই মাসে পাওয়া যেতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
জুলাইয়ে মিলতে পারে আইএমএফের ১.৩ বিলিয়ন ডলার কিস্তি, অর্থনীতি সংস্কারে জোর অর্থমন্ত্রীর। তবে ঋণের কিস্তি পাওয়ার জন্য আইএমএফের সব শর্ত এখনই বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।
গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সফররত আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসনের সাথে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ তথ্য জানান।
আইএমএফের ঋণের শর্তের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখন কতটুকু বাস্তবায়ন করা সম্ভব আর বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেগুলো এখন সম্ভব নয়, সেগুলো ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। অর্থনীতি এখন যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে সব কিছু আমাদের মতো করেই করতে হবে।’
অর্থমন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে পরবর্তী কিস্তি হিসেবে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার বিষয়ে আগামী এপ্রিলে সংস্থাটির বোর্ড সভায় চূড়ান্ত আলোচনা হবে। সব ঠিক থাকলে আগামী জুলাই মাসে ঋণের এই কিস্তি পাওয়া যেতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, আইএমএফের ঋণ ছাড়ের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ‘১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে জুলাই মাসে রিভিউ হবে। এর মধ্যেই আমরা বাজেটের প্রস্তুতি নেবো। এপ্রিলে ওয়াশিংটনে আইএমএফের ‘¯িপ্রং মিটিং’ আছে, সেখানে এ বিষয়ে চূড়ান্ত আলোচনা হবে।’ তিনি আরো জানান, জ্বালানি আমদানির জন্য যে অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন, সে বিষয়েও আইএমএফের সাথে কথা হয়েছে এবং ওয়াশিংটনের স্প্রিং মিটিংয়ে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
আইএমএফের সাথে বাংলাদেশের চলমান কর্মসূচিগুলো আবারো পর্যালোচনা হবে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘এতে কোনো সমস্যা নেই। আইএমএফের যে শর্ত বা রিকোয়ারমেন্টগুলো রয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।’
তবে আইএমএফের সব শর্ত এখনই বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এখন কতটুকু বাস্তবায়ন করা সম্ভব আর বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেগুলো এখন সম্ভব নয়, সেগুলো ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। অর্থনীতি এখন যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে সব কিছু আমাদের মতো করেই করতে হবে।’
বৈঠক শেষে আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন সাংবাদিকদের বলেন, ঋণ কর্মসূচিসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর সাথে আলোচনা হয়েছে এবং আরো আলোচনা হবে। বাংলাদেশের সাথে চলমান ঋণ কর্মসূচির রিভিউ হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাত খুবই খারাপ অবস্থায় ছিল। সেই সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে যে কথাগুলো বলা আছে, তা নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের অনেক সংস্কার ও ডি-রেগুলেশন [নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ] দরকার।’
দেশের আর্থিক খাতের নাজুক অবস্থার চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ব্যাংকিং সেক্টর ও শেয়ার বাজার খুবই খারাপ অবস্থায় আছে। কর-জিডিপি অনুপাতও খুব কম। এগুলো দূর করতে ইশতেহার বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা একের পর এক পদক্ষেপ নিচ্ছি। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা সম্প্রসারণে আমরা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছি। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি ঋণ মওকুফসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থমকে যাওয়া উন্নয়ন প্রকল্পগুলো আবার সচল করতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, আর্থিক সক্ষমতা অর্জন করতে হলে সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে একটি টেকসই জায়গায় নিতে হবে। ব্যবসা সহজীকরণ এবং ব্যবসার ব্যয় কমানোর জন্য ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, বাকিগুলো পর্যায়ক্রমে নেয়া হবে।
মন্ত্রী বলেন, ‘যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ, ব্যাংকিং সেক্টরের চ্যালেঞ্জ, ক্যাপিটাল মার্কেটের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়েছে, ট্যাক্স-জিডিপিতে আমরা একেবারে নিম্ন পর্যায়ে । এটা ইম্প্রুভমেন্টের ব্যাপার আছে।’
ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সঙ্কটের মুহূর্তে দেশবাসীকে সহানুভূতিশীল ও সংযমী হওয়ার আহ্বান জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার মাত্র এক মাস আগে দায়িত্ব নিয়েছে। এর মধ্যেই রমজান গেল, যুদ্ধ শুরু হয়েছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সঙ্কট থাকলেও দেশের পরিবহন ব্যবস্থায় কোনো সমস্যা হয়নি। সবাই বাড়ি যেতে পেরেছে, ভাড়া বাড়েনি। গার্মেন্টে কোনো অস্থিরতা হয়নি এবং তেলের অভাবে কোনো পরিবহন বন্ধ ছিল না।’
মন্ত্রী বলেন, ‘সরকার একা এই সঙ্কট সামাল দিতে পারবে না। দেশবাসীকে সহানুভূতিশীল হতে হবে, সংযমের দিকে যেতে হবে। সবাই মিলে সঙ্কট থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারব।’
উল্লেখ্য, আইএমএফের সাথে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু হয় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের জুনে ৮০ কোটি ডলার বেড়ে ঋণ কর্মসূচির আকার ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। আইএমএফ থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩৬৪ কোটি ডলারের ঋণসহায়তা। বাকি আছে ১৮৬ কোটি ডলার। গত ডিসেম্বরে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ পাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি।
বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলতে থাকলে দেশের অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, এই চাপ বাড়তে থাকলে তা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপর আসবে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, বর্তমান সময় কঠিন সময়, সেটি আমাদের স্বীকার করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান।
গত রোববার চট্টগ্রাম নগরের মেহেদীবাগ বাসভবনে গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে ঈদ-পরবর্তী মতবিনিময়ের সময় এসব কথা বলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
এ সময় চট্টগ্রাম-১২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হক, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো: জিয়াউদ্দীন এবং জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা উপস্থিত ছিলেন।



