ক্রীড়া ডেস্ক
মাঠের বাইরে এখন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় লড়াইটি প্রশাসনিক টেবিলে। একদিকে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে সমর্থন করছে আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যদিকে এক সাথে তার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে উয়েফা, এএফসি ও কনকাকাফ। ফলে নেতৃত্ব নিয়ে এবার বড় ধরনের সঙ্কটে পড়েছেন ফিফা সভাপতি। আর তাতে এক নজিরবিহীন ও নাটকীয় মোড় দেখা দিয়েছে বিশ্ব ফুটবলে।
উয়েফা, এএফসি ও কনকাকাফ তিন কনফেডারেশন যৌথ প্রকাশিত এক চিঠিতে গতকাল ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ‘আস্থার মৌলিক লঙ্ঘনের’ অভিযোগ তোলে। তাদের বক্তব্য, বিশ্বকাপের মতো ফুটবলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ নিয়ে এমন সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক ভুল নয়; এটি বিশ্ব ফুটবলের সম্মিলিত শাসনব্যবস্থার ওপরও আঘাত। তারা বিষয়টি নিয়ে ফিফার প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ফুটবল কোনো ব্যক্তি বা বিশেষ কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। ফুটবল হলো বিশ্ববাসীর যৌথ আবেগ- এর আসল মালিক খেলোয়াড়, সমর্থক এবং ক্লাবগুলো। নেতারা ফুটবলের সেবক হবেন, তার ওপর কর্তৃত্ব ফলানোর চেষ্টা করবেন না। সংস্থাগুলোর অভিযোগ- প্রতারণা ও গোপনীয়তার মাধ্যমে ইনফান্তিনো সাধারণ সদস্য দেশগুলোর আস্থা ও বিশ্বাস ভেঙে ফেলেছেন। যখন কোনো নেতা নিজেকে তার ওপর আস্থা রাখা সমষ্টির চেয়ে ওপরে স্থান দেন, তখন তার নেতৃত্ব দেয়ার নৈতিক অধিকার আর থাকে না।
উয়েফা, কনকাকাফ এবং এএফসির দাবি, ফিফা এই ঘটনাকে কেবল একটি ‘যোগাযোগের ব্যর্থতা’ বলে ধামাচাপা দিতে চাইছে। কিন্তু এটি কেবল প্রক্রিয়াগত কোনো ভুল ছিল না, বরং এটি ছিল বিচারবুদ্ধি ও সুশাসনের চরম ব্যর্থতা। এই পুরো কেলেঙ্কারির পেছনে ফিফার অভ্যন্তরীণ কোনো তদন্ত মানবে না এই তিন সংস্থা। তারা একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে। পাশাপাশি ফিফার বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের একপেশে কার্যকারিতা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে জানানো হয়েছে, ইনফান্তিনোর প্রশাসনের অধীনে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা হারিয়ে গেছে।
২১১টি সদস্য দেশের মধ্যে যেকোনো সিদ্ধান্ত পাস করার জন্য ১০৬টি ভোটের প্রয়োজন হয়। তবে বর্তমান সংঘাতে উয়েফার ৫৫, কনকাকাফের ৩৫ এবং এশিয়ার ৪৬- এই তিন কনফেডারেশনের মোট ১৩৬টি সদস্য দেশ ইনফান্তিনোর এই বাণিজ্যিক পরিকল্পনার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ফলে এই তিন সংস্থা একাট্টা হওয়ায় ফিফার পক্ষে কোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত জোর করে পাস করানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে আফ্রিকার ফুটবল সংস্থা (ঈঅঋ) এবং দক্ষিণ আমেরিকা ও মেক্সিকোর কিছু অংশের সমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ইনফান্তিনো। আফ্রিকার কনফেডারেশন প্রকাশ্যে ইনফান্তিনোর পাশেই থাকার ঘোষণা দিয়েছে। আগামী মার্চ মাসে ফিফার কংগ্রেস ও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তার আগে এই প্রকাশ্য বিদ্রোহ ইনফান্তিনোর চতুর্থ মেয়াদে মসনদে টিকে থাকার লড়াইকে ভীষণভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
উল্লেখ্য, বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্বের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় এই বিরোধ। বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল ফিফার প্রস্তাবিত ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ পরিকল্পনা। এর আওতায় বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক অধিকারের প্রায় ২০ শতাংশ অংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত বাতিল করা হলেও ততক্ষণে ফিফার ভেতর তৈরি হয় গভীর আস্থার সঙ্কট।
বিশেষ করে উয়েফার অবস্থান ইনফান্তিনোর জন্য বড় ধাক্কা। ইউরোপীয় ফুটবল দীর্ঘদিন ধরেই ফিফার কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তুষ্ট। বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রির পরিকল্পনা সামনে আসার পর সেই অসন্তোষ আরো প্রকাশ্য হয়। উয়েফা এর আগে সতর্ক করেছিল, প্রয়োজনে ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতা বয়কটের মতো কঠোর পদক্ষেপও বিবেচনা করা হতে পারে। এমনকি ফিফার বর্তমান নেতৃত্বের বাইরে বিকল্প পথ খোঁজার আলোচনা ইউরোপীয় ফুটবল মহলে শুরু হয়েছে। অর্থাৎ বিরোধটি এখন শুধু ইউরোপ বনাম ফিফা- এমন কোনো আঞ্চলিক দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই। ফুটবলবিশ্ব এখন ফিফা হাইকমান্ড কীভাবে এই নজিরবিহীন আন্তর্জাতিক চাপের জবাব দেয়, তা দেখার অপেক্ষায়।



