গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার গঠন হওয়ার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ইতোমধ্যে দুই কার্যদিবস পার হয়েছে, যেখানে আগের ধারাবাহিকতায় বিচারিক কার্যক্রম স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অব্যাহত থাকতে দেখা গেছে। সরকার শপথ গ্রহণের পরদিন ১৮ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে নিজ দফতরে প্রথম কার্যদিবসেই আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।
মন্ত্রীর এই আশ্বাসের প্রতিফলন দেখা গেছে ট্রাইব্যুনালের এজলাসেও। ওই দিনই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই মামলায় শহীদ ওসমান হাদির দেয়া জবানবন্দী প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল গ্রহণ করেছেন। ওবায়দুল কাদের ছাড়া এই মামলার অন্য আসামিরা হলেন- আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।
একই দিন ট্রাইব্যুনাল-১-এ চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে হত্যাযজ্ঞ চালানোর দায়ে সজীব ওয়াজেদ জয় ও জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলায় প্রসিকিউশন তাদের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেছে। এই মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের এই কর্মতৎপরতা নিয়ে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন যে, সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বার্তা না এলেও আইনমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী বিচারকাজ আগের গতিতেই সচল থাকবে। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, ন্যায়বিচারের দাবিতে তারা দায়িত্ব থাকাকালীন স্বাভাবিক গতিতেই সব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাবেন এবং সরকার এ ব্যাপারে ইতিবাচক সঙ্কেত দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯ জুলাই মিরপুরে গুলিতে নিহত শহীদ রাব্বী এবং শহীদ তানহার বাবার জবানবন্দী গ্রহণের মাধ্যমে ওবায়দুল কাদেরের মামলায় সাক্ষ্য দান পর্ব শুরু হয়েছে।
অন্য দিকে ট্রাইব্যুনালের নিয়মিত কার্যক্রমে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর মামলার অগ্রগতি হয়েছে। ২০১৬ সালের ৮ অক্টোবর গাজীপুরের পাতারটেকে সাতজনকে ‘জঙ্গি’ সাজিয়ে হত্যার ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্তে উঠে এসেছে যে, ওই ব্যক্তিদের বিভিন্ন জায়গা থেকে গ্রেফতার করে দীর্ঘ দিন গুম রাখার পর একটি বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। এই মামলায় শেখ হাসিনা, সাবেক আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী ও শহিদুল হককে আগামী ২ মার্চ ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
এ ছাড়া র্যাবের ‘টিএফআই সেলে’ গুমের ঘটনায় সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চলমান মামলায় ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেমের জেরা পিছিয়ে ২৫ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করা হয়েছে, কারণ তিনি বর্তমানে সংসদ সদস্য হিসেবে সরকারি কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানে রামপুরায় বিজিবি কর্তৃক ২৮ জনকে হত্যার মামলায় আসামি কর্নেল রেদওয়ানুল ইসলাম এবং রাফাত বিন আলম মুনের বিরুদ্ধে সাক্ষীর জেরা বৃহস্পতিবারও চলমান ছিল। সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ও কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে আগামী ২ মার্চ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। এ দিকে ট্রাইব্যুনালের এই বিচারিক প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণে এসে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন কোনোভাবেই এই বিচার মন্থর বা বাধাগ্রস্ত না হয়।
তিনি নির্বাচিত সরকারের কাছে কারিগরি সহায়তা দেয়ার মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালকে আরো গতিশীল করার অনুরোধ জানান এবং আগের রায়গুলো কার্যকর করার ওপর জোর দেন। আখতার হোসেন বলেন, এবারের নির্বাচনটি একই সাথে সংসদ সদস্য নির্বাচন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের গণভোট ছিল। তিনি বিএনপির অবস্থান নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, যারা ক্ষমতা গ্রহণের জন্য সুবিধাজনক অংশ মানছেন কিন্তু জবাবদিহিতার জায়গাগুলো বাদ দিতে চাচ্ছেন, তাদের এমন মনোভাব যেন ট্রাইব্যুনালের বিচারে প্রভাব না ফেলে। সংস্কারের বিষয়ে কোনো দোদুল্যমানতা যেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমকে স্পর্শ না করে, আর সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতেই তিনি ট্রাইব্যুনাল পরিদর্শন করেছেন।
এ দিকে আজ রোববার মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মামলার প্রথম সাক্ষী উপস্থাপন করা হবে।
তাদের দু’জনের সম্পর্কে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেছেন, আসামি সালমান এফ রহমান সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। আসামি আনিসুল হক আইন রক্ষার শপথ নিয়েও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে আইনি ও নীতিগত প্রশ্রয় দিয়েছেন।



