সেলের দেয়ালে লেখা ছিল ‘হে আল্লাহ আমাকে উদ্ধার করো’

ট্রাইব্যুনালে গুমের ভিকটিম

গভীর রাতে নিজ কক্ষের দরজায় ছোট ভাইয়ের তাড়াহুড়ো করে করাঘাত। দরজা খুলতেই অচেনা মানুষের সারি, হাতের কব্জিতে ধাতব হ্যান্ডকাফের কনকনে ঠাণ্ডা স্পর্শ, আর মুহূর্তের মধ্যেই এক নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের গর্ভে নিমজ্জিত হওয়া যে অন্ধকার থেকে আলোর মুখে ফিরতে সময় লেগে গিয়েছিল বছরের পর বছর।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

গভীর রাতে নিজ কক্ষের দরজায় ছোট ভাইয়ের তাড়াহুড়ো করে করাঘাত। দরজা খুলতেই অচেনা মানুষের সারি, হাতের কব্জিতে ধাতব হ্যান্ডকাফের কনকনে ঠাণ্ডা স্পর্শ, আর মুহূর্তের মধ্যেই এক নি-িদ্র অন্ধকারের গর্ভে নিমজ্জিত হওয়া যে অন্ধকার থেকে আলোর মুখে ফিরতে সময় লেগে গিয়েছিল বছরের পর বছর।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ দাঁড়িয়ে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারের (জেআইসি) অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দিনের পর দিন ঘটে চলা মধ্যযুগীয় বর্বরতার বিবরণ এভাবেই তুলে ধরেন গুমের শিকার ভিকটিম মো: নুরে আলম (৩২)। এ সময় এ মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রসিকিউটর শাইখ মাহদীসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বুধবার সপ্তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দেন নীলফামারী সরকারি কলেজ ছাত্রদলের এই সাবেক সভাপতি। জবানবন্দী দেয়ার একপর্যায়ে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিভীষিকাময় সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিচারিক প্যানেল প্রথমার্ধের জবানবন্দী রেকর্ড শেষে পরবর্তী অবশিষ্ট সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ১৮ আগস্ট দিন ধার্য করেছেন।

নুরে আলমের জবানবন্দীতে উঠে আসে কিভাবে ২০১৬ সালের ১২ এপ্রিল গভীর রাতে নীলফামারীর বাসা থেকে প্রশাসনিক পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাকে। বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৎকালীন সরকারের সমালোচনাই ছিল তার মূল অপরাধ।

চোখ ও মুখ বেঁধে ৮ বাই ১১ ফিটের একটি জানালাহীন রুমে তাকে বন্দী রাখা হয়, যেখানে ২৪ ঘণ্টা একটি তীব্র বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালিয়ে রাখা হতো। সেলের দেয়ালে বন্দীদের নখ দিয়ে লেখা আকুতি দেখতে পাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সেলের দেয়ালে অসংখ্য লেখা ছিল। তার মধ্যে লেখা ছিল ‘হে আল্লাহ আমাকে উদ্ধার করো’, ‘আল্লাহ জালিমদের সাহায্য করেন না’। কোথাও তারিখ, কোথাও নানা ধরনের মোবাইল নম্বর লেখা ছিল।

দূর থেকে ভেসে আসা জানাজার ঘোষণা এবং বিমান ও ট্রেনের শব্দে তিনি বুঝতে পারেন, তাকে ঢাকা সেনানিবাস এলাকার কোনো এক জেআইসির গোপন প্রকোষ্ঠ বা ‘আয়নাঘরে’ বন্দী রাখা হয়েছে।

জিজ্ঞাসাবাদকালে চরম হিংস্রতার বিবরণ দিতে গিয়ে সাক্ষী নুরে আলম বলেন, জিজ্ঞাসাবাদকালে এক পুরুষ কর্মকর্তা আমার দুই হাঁটু ও ঊরুর ওপর বেধড়ক পিটিয়ে বলেছিল ‘রেললাইনের পাশে, নদীনালার পাশে ও বস্তাবন্দী যেসব লাশ পাওয়া যায় তা আমরাই করি। তোকে যেভাবে বলব সেভাবে চলবি, তাহলে ভালো থাকবি’। পরবর্তীতে এক নারী কর্মকর্তাও তাকে উল্টো করে ঝুলিয়ে বেধড়ক প্রহার করেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নুরে আলমের জবানবন্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ অংশটি ছিল ২০১৬ সালের জুনের পরের ঘটনা। তিনি জানান, একটি সঙ্কীর্ণ সেলে তাকে টানা ৪০ দিন দু’টি হাত দরজার লোহার শিকের বাইরে দিয়ে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে রাখা হয়েছিল। ‘দু’হাত দরজার বাইরে বাঁধা থাকায় আমি কখনো শুতে পারতাম না। সারাক্ষণ চোখ-কান বাঁধা ও হ্যান্ডকাফ পরা থাকায় হাতে ঘা হয়ে রক্ত পড়ত। গায়ের ঘামাচি লোহার শিকে ঘষে চুলকাতে গিয়ে পিঠে তৈরি হয়েছিল গভীর ক্ষত।’ গোসল, টয়লেট ও ওজুর জন্য মাত্র দুই মিনিট সময় দেয়া হতো। সামান্য দেরি হলেই হাত দরজার বাইরে বেঁধে দিনভর চলত পেটানো, বন্ধ করে দেয়া হতো খাবার।

ট্রাইব্যুনালে এ দিন উপস্থিত ছিলেন- গ্রেফতার তিন আসামি ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো: সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী।

মামলার প্রধান আসামি শেখ হাসিনাসহ ১০ জন এখনো পলাতক। তাদের মধ্যে ডিজিএফআইয়ের সাবেক পাঁচ মহাপরিচালক (ডিজি) লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মোহাম্মদ আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব:) সাইফুল আবেদিন, অব: সঙ্কেতপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: সাইফুল আলম, (অব:) কর্মকর্তা আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও (অব:) কর্মকর্তা হামিদুল হক রয়েছেন।

এ ছাড়া অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন- সাবেক প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব:) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) মখছুরুল হক।