দেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম কিংবদন্তি এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেত্রী ফরিদা আক্তার ববিতা ২০২৬ সালের ‘একুশে পদকে’ ভূষিত হতে যাচ্ছেন। গত বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। রাষ্ট্রীয় এই অনন্য সম্মাননা প্রাপ্তির খবরে আবেগাপ্লুত ববিতা তার এই অর্জনকে উৎসর্গ করেছেন তার চলচ্চিত্র জীবনের পথপ্রদর্শক ও প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা শহীদ জহির রায়হানকে।
ঘোষণাটি আসার পর থেকেই দেশ-বিদেশের অগণিত ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীদের শুভেচ্ছায় সিক্ত হচ্ছেন এই অভিনেত্রী। প্রতিক্রিয়ায় ববিতা বলেন, ‘মহান আল্লাহর কাছে অসীম শুকরিয়া যে, তিনি আমাকে সুস্থ রেখেছেন। জীবদ্দশায় এমন রাষ্ট্রীয় পদক পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। যেহেতু চলচ্চিত্রে আমার আসা শ্রদ্ধেয় শহীদ জহির রায়হানের হাত ধরে, তাই আমার এই একুশে পদকপ্রাপ্তি তাকেই শ্রদ্ধার সাথে উৎসর্গ করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি রাষ্ট্রের প্রতি এবং যারা আমাকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করেছেন তাদের প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। আমার ভক্ত ও সংবাদ মাধ্যম সবসময় আমার অনুপ্রেরণা হয়ে পাশে ছিল, তাদের প্রতিও আমার গভীর ভালোবাসা।’
ববিতার ক্যারিয়ারের ব্যাপ্তি প্রায় তিন দশকের বেশি এবং তিনি প্রায় তিন শত সিনেমায় অভিনয় করেছেন। সত্তরের দশকে অস্কারজয়ী বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ সিনেমায় অভিনয় করে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা চলচ্চিত্রের মুখ হয়ে ওঠেন। তার এই বিশ্বজনীন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে ২০২৩ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ আগস্ট ‘ববিতা ডে’ হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে।
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের ইতিহাসেও ববিতা এক উজ্জ্বল নাম। ১৯৭৫ সালে ‘নয়নমনি’ সিনেমার জন্য তিনি প্রথম শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার লাভ করেন। এরপর ১৯৭৬ সালে ‘বসুন্ধরা’ এবং ১৯৭৭ সালে ‘বাদী থেকে বেগম’ চলচ্চিত্রের জন্য টানা হ্যাটট্রিক শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর সম্মাননা পান তিনি। এছাড়াও ‘রামের সুমতি’, ‘হাছন রাজা’ এবং ‘কে আপন কে পর’ সিনেমার জন্য তিনি বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরস্কৃত হন। শ্রেষ্ঠ প্রযোজক হিসেবে তিনি পুরস্কার পান ‘পোকা মাকড়ের ঘর বসতি’ সিনেমার জন্য। ২০১৬ সালে চলচ্চিত্রে সামগ্রিক অবদানের জন্য তাকে ‘আজীবন সম্মাননা’ প্রদান করে রাষ্ট্র। ব্যক্তিজীবনে ববিতার একমাত্র পুত্র অনিক বর্তমানে কানাডায় ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত। রূপালী পর্দায় ববিতা নায়করাজ রাজ্জাক, ফারুক, জাফর ইকবাল, ওয়াসিম ও সোহেল রানার মতো দিকপালদের সাথে জুটি বেঁধে অসংখ্য কালজয়ী সিনেমা উপহার দিয়েছেন। নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা ‘ববিতা মুভিজ’ থেকে তিনি ‘ফুলশয্যা’, ‘আগমন’, ‘লটারি’ ও ‘চণ্ডিদাস রজকিনী’র মতো দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন।
২০১৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পুত্র এখন পয়সাওয়ালা’ সিনেমার পর তাকে আর নতুন কোনো চলচ্চিত্রে দেখা যায়নি। অভিনয়ে ফেরা প্রসঙ্গে তিনি জানান, যদি শুধু তাকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী গল্প আবর্তিত হয়, তবেই তিনি ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবেন; অন্যথায় আর কোনো দিন অভিনয়ে ফেরার পরিকল্পনা নেই তার। ববিতার এই পদকপ্রাপ্তি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে এক নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে।



