১৩২/২৩০ কেভি বাল্ক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সরবরাহে একক ক্রেতা হিসেবে বিপিডিবিকে রাখার প্রস্তাব

শিল্পাঞ্চলে সরাসরি বিদ্যুৎ সরবরাহে বছরে বাড়তে পারে ৪,৪০০ কোটি টাকার ভর্তুকি

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বিদ্যুৎ খাতে সরকারি ভর্তুকি কমানো, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত এবং দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে ১৩২ কেভি ও ২৩০ কেভি ভোল্টেজ স্তরের বড় শিল্প ও বাল্ক গ্রাহকদের কাছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সরাসরি বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, এ ধরনের গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সরবরাহে অতিরিক্ত বিতরণ সংস্থা যুক্ত হলে সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়ার পাশাপাশি দায়িত্বের পুনরাবৃত্তি, সমন্বয়হীনতা ও বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বিপিডিবি ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার ১৯টি সংযোগ পাঁচটি সংস্থার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব সংযোগ চালু হলে বিপিডিবির ওপর বছরে প্রায় চার হাজার ৪০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে। অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সময়ে এই অতিরিক্ত ভর্তুকিকে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি হিসেবে দেখছে বিদ্যুৎ খাত।

উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে বিদ্যুৎ বিক্রি

সরকারের একক বিদ্যুৎ ক্রেতা হিসেবে বিপিডিবি সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে। একই সাথে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সমন্বয়, গ্রিডের স্থিতিশীলতা এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্বও পালন করে।

নথিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিপিডিবির প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১২ টাকা ৬০ পয়সা। বিপরীতে ১৩২/২৩০ কেভি স্তরে বাল্ক পাইকারি বিদ্যুতের গড় বিক্রয়মূল্য ১০ টাকা ১১ পয়সা এবং খুচরা বিক্রয়মূল্য গড়ে ১২ টাকা ৬৪ পয়সা; অর্থাৎ উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে।

এই ব্যবধানের কারণে অন্য কোনো বিতরণ সংস্থা ১৩২/২৩০ কেভি স্তরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করলে একক ক্রেতা হিসেবে বিপিডিবির বছরে প্রতি মেগাওয়াটে আনুমানিক ২ থেকে ২.২ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হবে বলে নথিতে হিসাব করা হয়েছে। বিপরীতে বিপিডিবি নিজেই এসব বাল্ক গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহ করলে ওই অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হবে না।

২২০ মেগাওয়াটের একটি সংযোগেই ৪০৫ কোটি টাকার পার্থক্য

সরকারি প্রস্তাবে একটি ১৩২ কেভি, ২২০ মেগাওয়াট গ্রাহকের উদাহরণ দিয়ে সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব দেখানো হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, বাল্ক গ্রাহকের কাছে বিপিডিবি সরাসরি বিদ্যুৎ বিক্রি না করলে প্রায় ৪০৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত ভর্তুকি প্রয়োজন হতে পারে।

এই হিসাবকে সামনে রেখে বলা হয়েছে, বড় শিল্প গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে কে বিদ্যুৎ কিনবে, কে উৎপাদন ব্যয় বহন করবে এবং কে রাজস্ব পাবে- এই কাঠামো পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে ভর্তুকি কমানোর সুযোগ রয়েছে।

বিদ্যুৎ খাতের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা বড় সংযোগগুলো। নথিতে বলা হয়েছে, পাঁচটি সংস্থার প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াটের ১৯টি সংযোগ অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এগুলো চালু হলে বিপিডিবির বছরে প্রায় চার হাজার ৪০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ভর্তুকি প্রয়োজন হতে পারে।

প্রস্তাবে এই অতিরিক্ত ব্যয়কে সরকারের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন কার্যক্রমের জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; অর্থাৎ শিল্পায়নের জন্য নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ বাড়লেও বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সঠিকভাবে নির্ধারণ না করলে তার আর্থিক দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপর পড়তে পারে।

বিতরণ সংস্থার চেয়ে বিপিডিবির ব্যয় কম

বাল্ক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্থার বিতরণ ব্যয়ের তুলনাও তুলে ধরা হয়েছে। নথি অনুযায়ী, বিপিডিবির বিতরণ ব্যয় প্রতি ইউনিট ৭৫ পয়সা, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বাপবিবো) ১ টাকা ৩৯ পয়সা, ডিপিডিসির ১ টাকা ১৮ পয়সা, ডেসকোর ১ টাকা ১৬ পয়সা, ওজোপাডিকোর ১ টাকা ৩৩ পয়সা এবং নেসকোর ১ টাকা ৪৩ পয়সা।

প্রস্তাবে দাবি করা হয়েছে, বিপিডিবির মাধ্যমে এসব বাল্ক গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলে সরকারের ভর্তুকি কমানো সম্ভব হবে। তবে নথির ওই অংশে প্রতি ইউনিট সাশ্রয়ের হিসাব উল্লেখ করার ক্ষেত্রে একটি সংখ্যাগত অসামঞ্জস্যও রয়েছে, বিতরণ ব্যয়ের পার্থক্যের সাথে সেখানে উল্লেখ করা ‘প্রতি ইউনিটে ৫০ টাকা’ সাশ্রয়ের দাবি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে এই নির্দিষ্ট অঙ্কটি চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সরকারি হিসাব যাচাই ছাড়া ব্যবহার না করাই নিরাপদ।

উৎপাদন থেকে গ্রিড- পুরো ব্যবস্থার দায় বিপিডিবির

বিপিডিবির যুক্তি হলো, ১৩২/২৩০ কেভি বাল্ক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সরবরাহ কেবল বিদ্যুৎ বিক্রির বিষয় নয়; এর সাথে উৎপাদন পরিকল্পনা, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, গ্রিডের স্থিতিশীলতা, রিজার্ভ মার্জিন এবং মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়গুলো সরাসরি যুক্ত।

বাল্ক গ্রাহকদের লোড ডিমান্ড অনুযায়ী উৎপাদন ও মনিটরিং, গ্রিডের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে জেনারেশন কন্ট্রোল, অটোমেটিক জেনারেশন কন্ট্রোল, সঠিক ভোল্টেজ ও কিলোভার সরবরাহ এবং রিজার্ভ মার্জিন বজায় রাখার দায়িত্ব বিপিডিবি পালন করে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রয়োজনে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখার পাশাপাশি তেল, কয়লা ও গ্যাসের মতো জ্বালানি সরবরাহও নিশ্চিত করা হয়।

অন্য দিকে এসব কারিগরি ও আর্থিক দায়ভার না বহন করেও কোনো কোনো বিতরণ সংস্থা বাল্ক গ্রাহকদের কাছ থেকে ডিমান্ড চার্জ ও জামানত গ্রহণ করলে বিপিডিবির রাজস্ব কমে যায় এবং সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়ে- এমন যুক্তি দেয়া হয়েছে। প্রস্তাবে এসব রাজস্ব বিপিডিবির কাছে রাখার পক্ষে মত দেয়া হয়েছে।

পিজিবির অবকাঠামো ব্যবহার করে সরাসরি সরবরাহ

১৩২/২৩০ কেভি স্তরে বাল্ক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সরবরাহে বিপিডিবির পাশাপাশি তার সহযোগী প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিবি) জড়িত। বিপিডিবি উৎপাদন, লোড ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুতের মান নিশ্চিত করবে এবং পিজিবির অবকাঠামো ব্যবহার করে সেই বিদ্যুৎ শিল্প গ্রাহকের স্থাপনায় পৌঁছাবে- এটিই প্রস্তাবিত কাঠামো।

নথিতে আশঙ্কা করা হয়েছে, এই সরবরাহ ব্যবস্থায় তৃতীয় কোনো সংস্থা যুক্ত হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা তৈরি হতে পারে এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘœ ঘটতে পারে। এর ফলে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সেমিকন্ডাক্টর, ইস্পাত ও রিফাইনারির জন্য মানসম্মত বিদ্যুৎ

ভবিষ্যতের শিল্পায়ন পরিকল্পনার সাথেও বিষয়টিকে যুক্ত করা হয়েছে। নথিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের মাধ্যমে সেমিকন্ডাক্টর, ইস্পাত, রিফাইনারি, ইলেকট্রনিকস ম্যানুফ্যাকচারিংসহ উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব শিল্পের জন্য শুধু বিদ্যুৎ পাওয়া যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য ও উচ্চমানসম্পন্ন বিদ্যুৎ।

বিদ্যুৎ সরবরাহে গুণগত সমস্যা হলে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো ক্যাপটিভ পাওয়ারের দিকে যেতে পারে। এতে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের কাক্সিক্ষত সুফলও বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে প্রস্তাবে সতর্ক করা হয়েছে।

১৩২ কেভি স্তরে অন্য সংস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দেশের অধিকাংশ বিতরণ সংস্থা সাধারণত ৩৩ কেভি স্তরে বাল্ক বিদ্যুৎ গ্রহণ করে। ডিপিডিসি ও ডেসকো কিছু এলাকায় বিপিডিবি থেকে ১৩২ কেভি স্তরেও বিদ্যুৎ নেয়। ২০২০ সালের বিইআরসি ট্যারিফ আদেশের একটি নির্দেশনার উল্লেখ করে বলা হয়েছে, যেখানে ১৩২ কেভি অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে সেখানে ডিপিডিসি ও ডেসকোর বিপিডিবির কাছ থেকে ১৩২ কেভি স্তরে বাল্ক বিদ্যুৎ কেনার ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে।

বিপিডিবির যুক্তি, ১৩২/২৩০ কেভি স্তরে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য অন্যান্য বিতরণ সংস্থার নিজস্ব গ্রিড অবকাঠামো, সঞ্চালন ব্যবস্থা কিংবা প্রয়োজনীয় কারিগরি সক্ষমতা নেই। ফলে এ স্তরে বড় শিল্প গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সরবরাহে তাদের ভূমিকা নিয়ে নীতিগত ও কারিগরি প্রশ্ন রয়েছে। অতিরিক্ত সংস্থা যুক্ত হলে দায়িত্বের ওভারল্যাপ এবং আর্থিক অদক্ষতা তৈরি হতে পারে।

বাপবিবোর আইনগত এখতিয়ার নিয়েও আপত্তি

বাল্ক শিল্প গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সরবরাহে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডকে যুক্ত করার বিষয়েও নথিতে আপত্তি তোলা হয়েছে।

২০১৩ সালের পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড আইনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রামীণ ও কিছু অন্যান্য এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে কৃষি, কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশ, গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ১৩২/২৩০ কেভি স্তরের বৃহৎ বাল্ক শিল্প গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সরবরাহ বাপবিবোর আইনগত উদ্দেশ্য, দায়িত্ব বা ক্ষমতার মধ্যে নির্ধারিত নয়। ফলে এ ধরনের কার্যক্রমে বাপবিবোকে যুক্ত করা হলে আইনটির উদ্দেশ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব বণ্টনের সাথে অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে।

ভর্তুকি কমানোই মূল লক্ষ্য

সব মিলিয়ে বিপিডিবির প্রস্তাবের মূল যুক্তি তিনটি- ভর্তুকি কমানো, বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো এবং বিনিয়োগবান্ধব শিল্প অবকাঠামো নিশ্চিত করা।

নথির উপসংহারে বলা হয়েছে, বিদ্যমান আইন, বিইআরসি ট্যারিফ আদেশ, সরকারের নীতি এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় ১৩২/২৩০ কেভি স্তরের বাল্ক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সরবরাহ একক বিদ্যুৎ ক্রেতা হিসেবে বিপিডিবির অধীনেই পরিচালনা করা সবচেয়ে যৌক্তিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। অন্য কোনো সংস্থাকে অতিরিক্তভাবে যুক্ত করলে দায়িত্বের পুনরাবৃত্তি, সমন্বয়হীনতা, প্রশাসনিক ব্যয় ও রাজস্ব বিভাজনের পাশাপাশি সরকারের ভর্তুকি বাড়তে পারে।

তাই জাতীয় স্বার্থ, রাষ্ট্রীয় অর্থের সাশ্রয় এবং বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক টেকসইতার কথা বিবেচনায় ১৩২/২৩০ কেভি ভোল্টেজ স্তরের সব বাল্ক গ্রাহকের বিদ্যুৎ সরবরাহ একক ক্রেতা হিসেবে বিপিডিবির আওতায় রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।