- খণ্ড খণ্ড গ্রুপ করে আত্মগোপনে নেতারা
- পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর ছক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র এক সপ্তাহ। এরই মধ্যে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু নিরপেক্ষ করার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা মাঠ প্রশাসনে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। নির্বাচনী মাঠে সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী, বিজিবি, র্যাব-পুলিশসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তৎপরতায় সারা দেশে যখন ভোটের হাওয়া বইছে, তখন অনেকটা নিরব রয়েছে পতিত আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। তাদের এই নিরবতাকে ভিন্নভাবে দেখছেন গোয়েন্দারা। একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এক সময়ের প্রভাবশালী দলের নেতাকর্মীরা নিরব থাকলেও তারা ভেতরে সরব হয়ে ভয়ঙ্কর পরিকল্পনায় লিপ্ত। এরই মধ্যে নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের যোগাযোগ বৃদ্ধি করেছে। তারা আগামী জাতীয় নির্বাচনকে বয়কট করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘নো বোট, নো ভোট’ প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতারা দেশের আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিকভাবে ফেরার জন্য বিভিন্ন ‘প্লট’ বা কৌশল তৈরি করছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য গর্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এমন সংবাদ প্রকাশের পর ভারতজুড়ে তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, পতিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এখনো দেশে রয়েছে। যারা বিদেশে বসে আছেন তারা নিয়মিত নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। সেই নির্দেশনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ছোট ছোট দলবদ্ধ হয়ে টার্গেট করে হত্যা, সহিংসতা তৈরি ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে নির্বাচনের দিন ভোটারদের উপস্থিতি কমানোসহ বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাতে পারে। একই সাথে নির্বাচন পরবর্তীতে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগসহ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে এসে তাণ্ডব চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার মধ্যেই ভারতে পালিয়ে থাকা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকারের আমলে মন্ত্রী, এমপিসহ উচ্চপর্যায়ের নেতাদের দেশে প্রত্যাবর্তনের একটি ছক তৈরি করা হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও নাশকতার বিভিন্ন ‘ছক’ নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থা এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নানা সতর্কবার্তা দিয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা নির্বাচন বানচাল করতে ব্যাপক প্রস্তুতির পরিকল্পনা করছে। তারা হত্যাকাণ্ডসহ নাশকতার কাজে অস্ত্র ব্যবহারের প্রস্তুতি নিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে বিএনপি-জামায়াতের নির্বাচনী প্রচারণায় ছদ্মবেশে মিশে গিয়ে সহিংসতা চালানোর সম্ভাবনা রয়েছে। সম্প্রতি ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার দেয়া বক্তব্যে নির্বাচন বানচালের জন্য সহিংসতায় জড়ানোর ‘উসকানি’ দেয়া হয়েছে।
যে কারণে নিরব আওয়ামী লীগ : গোয়েন্দা সূত্র আরো জানায়, গত বছরের শুরুতে ঝটিকা মিছিল দিয়ে রাজপথে নামার চেষ্টা করে নেতাকর্মীরা। এরপর তারা প্রকাশ্যে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নাশকতার চেষ্টা করে। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর হওয়ায় একের পর এক নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করে। যেসব নেতা কারাগারে রয়েছে তাদের জামিন না হওয়ায় বেশির ভাগই কারাভোগ করছেন। অনেকের মৃত্যুর সংবাদে সেই ঝটিকা মিছিল থেকে সরে যায় নেতাকর্মীরা। নির্বাচন তফসিল ঘোষণার পর ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদিকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে নাম উঠে আসে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ও যুবলীগ নেতা আলমগীর হোসেনসহ কয়েকজন নেতাকর্মীর নাম। শুটার ও সহযোগীদের সবার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের। অভিযোগ উঠেছে, জাহাঙ্গীর কবির নানকের পরিকল্পনায় চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়। এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কেরানীগঞ্জের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীনের নামও বেরিয়ে আসে। হাদি হত্যাকারীরা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর এই নিয়ে ক্ষোভে ফেটে উঠে সারা দেশ। অর্থাৎ হাদি হত্যাকাণ্ডে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের যে পরিকল্পনা ছিল তা বাস্তবায়নে রূপ নিয়েছে। পরবর্তীতে হাদি হত্যার পর পুরো দেশ জাগ্রত হয়ে উঠায় অনেকটা নিরবতায় চলে যায় দলটির নেতাকর্মীরা। এখন তারা ছক কষছেন নির্বাচন বানচালে। তাদের উদ্দেশ্য জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে নির্বাচনের মাঠে ভোটারদের উপস্থিতি কমানো নির্বাচন বানচালের সুনির্দিষ্ট ‘নাশকতার ছক’ নিয়ে বর্তমানে আওয়ামী লীগের দিকেই আঙুল তুলছে সরকার ও গোয়েন্দা বিভাগ।
দ্য গার্ডিয়ানের রিপোর্ট : দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার সরকার গণবিক্ষোভের মাধ্যমে পতনের পর বাংলাদেশ যখন প্রথম জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন নির্বাসিত আওয়ামী লীগের সদস্যরা ভারত থেকে রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসার ষড়যন্ত্র করছে। গত মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদপত্রটি লিখেছে যে, কলকাতায় বসবাসকারী দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাবর্তন সম্ভব বলে মনে করেন, যদিও দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বাধা দেয়া হয়েছে এবং এর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দেশে গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশে খুন, রাষ্ট্রদ্রোহ, আত্মসাৎ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতাদের অসংখ্য মামলায় পলাতক হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবুও, দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলকাতার শপিং মল এবং ফুড কোর্টে, দলীয় নেতারা প্রকাশ্যে মিলিত হন, রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবনের পরিকল্পনা করার সময় বিভিন্ন কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন।
১৬ মাসেরও বেশি সময় আগে, হাসিনার শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের কারণে তাকে হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয় যখন বিক্ষোভকারীরা তার বাসভবনের দিকে এগিয়ে যায়। জাতিসঙ্ঘের এক প্রতিবেদন অনুসারে, জুলাইয়ের বিদ্রোহে তার সরকারের চূড়ান্ত দমন-পীড়নে প্রায় এক হাজার ৪০০ জন নিহত হয়।
জনতার সহিংসতা এবং ফৌজদারি মামলার কারণে হাজার হাজার দলীয় কর্মী পালিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৬০০ জনেরও বেশি বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে কলকাতায় আশ্রয় নিয়েছে বলে জানা গেছে।
গার্ডিয়ান বিস্তারিতভাবে জানিয়েছে যে কিভাবে প্রাক্তন মন্ত্রী এবং দলীয় ব্যক্তিরা, যারা দেশে পলাতক বলে বিবেচিত, তারা তাদের কর্মীদের সংগঠিত এবং যোগাযোগের জন্য শহরটিকে একটি ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত মে মাসে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল এবং আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বাধা দিয়েছিল, তবুও এই কর্মকর্তারা হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের মুখে অটল রয়েছেন।
গত বছরের শেষের দিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আওয়ামী লীগ নেত্রী হাসিনাকে তার শাসনামলের শেষ পর্যায়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
ব্রিটিশ দৈনিকটি জানিয়েছে, তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে বলে মনে না করে, হাসিনা রায়কে ‘মিথ্যা’বলে উড়িয়ে দিয়েছেন এবং ভারত থেকে ফিরে আসার ষড়যন্ত্র করছেন, যার মধ্যে আসন্ন নির্বাচন ব্যাহত করার জন্য তার হাজার হাজার সমর্থককে একত্রিত করাও রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে, যারা ঢাকার প্রত্যর্পণের জন্য অনুরোধ করেছে, হাসিনা দিল্লিতে তার সুরক্ষিত আস্তানা থেকে বাংলাদেশের দলীয় নেতাদের সাথে দীর্ঘ সময় ধরে বৈঠক এবং ফোনালাপে ব্যয় করেন। এতে আরো বলা হয়েছে, প্রাক্তন সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রীসহ সিনিয়র নেতারা কৌশল নিয়ে আলোচনা করার জন্য কলকাতা থেকে দিল্লি ভ্রমণ করেছেন।
‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ ফেজ-২ : যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযান ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এর দ্বিতীয় পর্যায়ে ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে মোট ২৩ হাজার ৮৫৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টা (৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) রাজধানী ঢাকাতেই ৩০ জনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারি মাসেই সারা দেশে গ্রেফতার হয়েছেন প্রায় ২২ হাজার ৫৭ জন। অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার : এই অভিযানে ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে ৫৭২টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দমন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে যৌথবাহিনীর এই বিশেষ অভিযান ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর থেকে দেশজুড়ে দ্বিতীয় দফায় শুরু হয়।



