শিগগিরই আলোর মুখ দেখছে বাঁশবাড়িয়া থেকে কুমিরা ফেরিঘাট উন্নয়ন প্রকল্প

দক্ষিণ চট্টগ্রাম সুরক্ষায় বাপাউবোর একগুচ্ছ প্রকল্প, ব্যয় ৪ হাজার ২২৮ কোটি টাকা

Printed Edition
যুগের পর যুগ ধরে খাগড়াছরির পাহাড়ী জনপদ দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলো খননের অভাবে এভাবেই পলিজমে পাহাড়ী জনদপ থমকে রয়েছে : নয়া দিগন্ত
যুগের পর যুগ ধরে খাগড়াছরির পাহাড়ী জনপদ দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলো খননের অভাবে এভাবেই পলিজমে পাহাড়ী জনদপ থমকে রয়েছে : নয়া দিগন্ত

এস এম রহমান পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবেলা, নদীভাঙন ও ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ নদীতীর ও সাগর উপকূল সুরক্ষায় একগুচ্ছ নতুন প্রকল্প প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)। দক্ষিণ চট্টগ্রামসহ জেলার বিভিন্ন অরক্ষিত উপকূলীয় এলাকা সুরক্ষা, জলাবদ্ধতা নিরসন, সেচসুবিধা সম্প্রসারণ ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়নে প্রস্তাবিত ছয়টি প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে চার হাজার ২২৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

বাপাউবো সূত্র জানায়, বর্তমানে চট্টগ্রামে সাতটি প্রকল্পে মোট পাঁচ হাজার ৬৭৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে টেকসই নদীতীর ও উপকূল সুরক্ষা, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পানি ব্যবস্থাপনার কাজ চলছে। এসব চলমান প্রকল্পের সাথে সমন্বয় রেখে যেসব এলাকা এখনো অরক্ষিত রয়েছে, সেগুলোকে নতুন প্রকল্পের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামের উপকূলীয় জনপদগুলো দুর্যোগের ঝুঁকি থেকে অনেকটা সুরক্ষিত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট থেকে কুমিরা ফেরিঘাট পর্যন্ত উপকূলীয় বাঁধ টেকসইকরণ প্রকল্পটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ৫৫৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পটি শিগগিরই আলোর মুখ দেখছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। প্রকল্পের আওতায় বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাটের ১ দশমিক ৩১৫ কিলোমিটার অংশ টেকসইকরণ, ৫ দশমিক ৪৯০ কিলোমিটার সি-ডাইক নির্মাণ এবং আটটি পানি নিষ্কাশন কাঠামো পুনর্র্নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সীতাকুণ্ডের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও বাঁশখালী উপজেলাকেও নতুন প্রকল্পের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আনোয়ারা উপকূল সুরক্ষা প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৪৮ কোটি টাকা। এতে ৩ দশমিক ৪৬০ কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ, ২ দশমিক ৭৩০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, একটি সøুইস গেট নির্মাণ, ২ দশমিক ৭৩০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ এবং ১০ দশমিক ৬০০ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের কাজ রয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ৩০ দশমিক ৩৮ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাবও করা হয়েছে।

বাপাউবো চট্টগ্রাম ডিভিশন-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে শহীদ বলেন, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় থেকে রায়পুর ইউনিয়নকে সুরক্ষা, উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালীকরণ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পারকি সমুদ্রসৈকতকে আরো দৃষ্টিনন্দন করাই এ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। প্রকল্পের ডিপিপি শিগগিরই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

বাঁশখালীর অরক্ষিত অংশ ও জলকদর খাল পুনঃখননের জন্য প্রস্তাবিত প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৩৬২ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এতে ৩ দশমিক ৮৫০ কিলোমিটার নদীতীর ও ৫ দশমিক ৯৭৫ কিলোমিটার সাগর উপকূল সুরক্ষা, ২০ কিলোমিটার জলকদর খাল এবং ৭০ দশমিক ৭০০ কিলোমিটার শাখা খাল পুনঃখনন, ৭৬ দশমিক ০৮৯ কিলোমিটার অভ্যন্তরীণ বাঁধ নির্মাণ, ২৫টি সøুইস গেট পুনর্র্নির্মাণ এবং পাঁচটি ইনলেট-আউটলেট নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে।

এ ছাড়া ফটিকছড়ি বন্যানিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন প্রকল্পে ৬৬৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং হালদা সম্প্রসারণ সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসনে ৩০১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। হালদা প্রকল্পের আওতায় সেচ ও নিষ্কাশন খাল পুনঃখনন, বিভিন্ন সেচ ও পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো মেরামত এবং নদীতীর প্রতিরক্ষার কাজ থাকবে।

অন্য দিকে উড়িরচর প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৯৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। উত্তর সন্দ্বীপে নবসৃষ্ট ভূমি উন্নয়ন এবং দক্ষিণ উড়িরচরে নদীভাঙনের কারণে ভূমি হ্রাস রোধ এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। এতে ৩ দশমিক ৬০০ কিলোমিটার স্থায়ী এবং ৩ দশমিক ৭০০ কিলোমিটার অস্থায়ী নদীতীর প্রতিরক্ষা এবং তিনটি খাল খননের কাজ রয়েছে।

বর্তমানে বাপাউবোর চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে রাঙ্গামাটির কর্ণফুলী ও সংযুক্ত নদীগুলোর টেকসই পানি ব্যবস্থাপনায় ৬৮৭ কোটি ৩৯ লাখ, বোয়ালখালী সুরক্ষায় ১৩৪ কোটি ৯ লাখ, খাগড়াছড়ি সুরক্ষায় ৬২২ কোটি, সন্দ্বীপ সুরক্ষায় ৫৬২ কোটি, চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে এক হাজার ৫০৮ কোটি এবং পটিয়ায় বন্যানিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন, সেচ উন্নয়ন ও আধুনিক এলিভেটর ড্যাম নির্মাণে এক হাজার ২৯১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে কাজ চলছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, চলমান প্রকল্পের সাথে প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামের অরক্ষিত নদীতীর ও উপকূলীয় অঞ্চল সুরক্ষার আওতায় আসবে। একই সাথে কৃষি ও সেচসুবিধা বাড়বে, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নত হবে এবং ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনের ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় দক্ষিণ চট্টগ্রামসহ পুরো অঞ্চলের সক্ষমতা আরো বাড়বে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।