নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি ও শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়াকে কেন্দ্র করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি), ঢাকা কলেজ এবং সরকারি আলিয়া মাদরাসায় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই সঙ্ঘাত কেবল ক্যাম্পাসেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং ছড়িয়ে পড়েছে হাসপাতালেও, যেখানে এমনকি সাধারণ রোগী ও সংবাদকর্মীরাও হামলার শিকার হয়েছেন।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে ইউজিসি চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে একটি অনুষ্ঠান চলাকালে উত্তেজনার সূত্রপাত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীর হাতে হস্তান্তর ও আবাসন সমস্যার সমাধানসহ বিভিন্ন দাবিতে জকসু ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করতে গেলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাতে বাধা দেয়। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় জবি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জকসু) ভিপি, জিএস ও জবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি, জবি ছাত্রশক্তির সভাপতি শাহীন মিয়া, ছাত্রদল নেতা ইয়াসিন সাইফসহ কয়েকজন সাংবাদিক আহত হন।
ক্যাম্পাসের এই সঙ্ঘাতের রেশ গড়ায় ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। আহত শিক্ষার্থীরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে সেখানেও হামলার শিকার হয়। অভিযোগ উঠেছে, জবি ছাত্রদলের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী কবি নজরুল ও সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও এই হামলায় যোগ দেয়। হাসপাতালের ভেতরে ও বাইরে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও দেশীয় অস্ত্রের মহড়ায় সাধারণ রোগী এবং তাদের স্বজনদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের ঘটনায় জকসু ও শিবিরের দাবি অনুযায়ী, তাদের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।
ছাত্রদলের সদস্যসচিব শামসুল আরেফিনের দাবি, জামায়াত-শিবির পরিকল্পিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মব কালচার’ সৃষ্টি করে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। অন্য দিকে জকসু নেতাদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক কর্মসূচিতে বাধা দিয়ে ছাত্রদল ফ্যাসিবাদী আচরণ করছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে জোর দাবি জানানো হয়েছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনায় ছাত্রশিবির ও জকসু নেতাদের দাবি অনুযায়ী, অন্তত ৭০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ জনের অবস্থা গুরুতর। অন্য দিকে বকশীবাজারের সরকারি আলিয়া মাদরাসায় সংঘর্ষের ঘটনায় ছাত্রশিবিরের ২০ জন এবং ছাত্রদলের ১৮ জনসহ মোট ৩৮ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসেও উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। সবমিলিয়ে এই সংঘর্ষে আহতের সংখ্যা প্রায় শতাধিক।
এ দিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) সাধারণ শিক্ষার্থী, জকসু প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। গতকাল এক বিবৃতিতে ডাকসু এই ঘটনাকে শিক্ষাঙ্গনে গণতান্ত্রিক পরিবেশের ওপর বড় আঘাত হিসেবে অভিহিত করেছে।
ঢাকা কলেজে শিবির নেতার ওপর হামলা : ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসে মূলত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের দাবি অনুযায়ী, কলেজের গ্যালারিতে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা ও আলোচনা সভার জন্য সাজসজ্জার কাজ করার সময় ছাত্রদলের ২০ থেকে ২৫ জন নেতাকর্মী তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। পরে বেলা দেড়টায় ক্যাম্পাসে মিছিল করে কলেজ শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
এই হামলায় ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের অফিস সম্পাদক আব্দুল মালেক গুরুতর আহত হন এবং তাকে ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে নিউ মার্কেট এলাকায় দু’টি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, যা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ঘটনার পর ছাত্রদল নেতাকর্মীরা সায়েন্সল্যাব মোড় ও কলেজের মূল ফটকে লাঠিসোটা নিয়ে অবস্থান নেয়।
ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের অর্থ সম্পাদক মোহম্মদ মামুন বলেন, ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য পারভেজ মোশারফের নেতৃত্বে ২০ থেকে ২৫ জন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এসে অতর্কিত আব্দুল মালেক ভাইসহ অন্যদের মারধর করে। তার মাথায় আঘাত করায় গুরুতর আহত হয়েছেন তিনি।
আলিয়ায় হল দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ : বকশীবাজার এলাকায় সরকারি আলিয়া মাদরাসায় হল দখল ও রুমের নিয়ন্ত্রণ নেয়াকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। শিবিরের অভিযোগ, ছাত্রদল নেতাকর্মীরা হঠাৎ হলে ঢুকে তাদের মারধর করে এবং বেশ কয়েকটি রুমে তালা ঝুলিয়ে দেয়। পাল্টা অভিযোগে ছাত্রদল দাবি করে, শিবির বহিরাগতদের নিয়ে হলের রুম দখল করে রেখেছিল এবং তাদের একটি রুমে তালা দিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করেছে।
সংঘর্ষের সময় উভয় পক্ষকে দেশীয় অস্ত্র ও পাইপ হাতে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া করতে দেখা যায়। এমনকি স্থানীয় যুবদল ও বিএনপির নেতাকর্মীরাও এই সংঘর্ষে ছাত্রদলের সাথে যুক্ত হন বলে জানা গেছে। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা এই ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনায় ওই এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করে। এই সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদার এবং যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তির দাবি করেছেন।
প্রাপ্ত তথ্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব হামলার খবর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অনেক আগে থেকেই ফেসবুকে পোস্ট করে জানিয়ে দিচ্ছে। একটি অরাজনৈতিক বা সাধারণ ঘটনার আগেই তাদের এই আগাম ‘ভবিষ্যদ্বাণী’ জনমনে গভীর সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। অনেকেই মনে করছেন, ছাত্রসংগঠনগুলোর এই অনাকাক্সিক্ষত বিভেদকে পুঁজি করে কোনো একটি পক্ষ পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।



