ভূকৌশলগত অবস্থান কাজে লাগালে তেল রফতানিকারক দেশ হতে পারে বাংলাদেশ

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক রুটের সংযোগস্থলে অবস্থান, গভীর সমুদ্রবন্দর সম্ভাবনা এবং বড় আঞ্চলিক বাজারের নৈকট্য- এসব সুবিধা কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশ জ্বালানি পরিশোধন ও পুনঃ রফতানির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

রাশিদুল ইসলাম
Printed Edition

ভূকৌশলগত অবস্থান ও আঞ্চলিক বাজারের সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশও তেল রফতানিকারক দেশে পরিণত হতে পারে- এমন মত দিয়েছেন জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক রুটের সংযোগস্থলে অবস্থান, গভীর সমুদ্রবন্দর সম্ভাবনা এবং বড় আঞ্চলিক বাজারের নৈকট্য- এসব সুবিধা কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশ জ্বালানি পরিশোধন ও পুনঃ রফতানির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা উদাহরণ হিসেবে সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও নেদারল্যান্ডসের কথা উল্লেখ করেন। এসব দেশ নিজেরা তেল উৎপাদক না হয়েও আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে আন্তর্জাতিক বাজারে পুনরায় রফতানি করে। এর মাধ্যমে তারা বছরে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার আয় করে থাকে। অথচ একই ধরনের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতির ওপর নির্ভর করেছে। ফলে তেল আমদানির পর স্থানীয় চাহিদা পূরণেই পুরো মনোযোগ দেয়া হয়েছে। অপরিশোধিত তেল আমদানি করে তা পরিশোধন ও রফতানি করার মতো কৌশলগত পরিকল্পনা কখনো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।

অতীতে ভারতের দিকে ডিজেল পাচার ঠেকাতে বাংলাদেশকে বিশেষ নজরদারি চালাতে হয়েছে। বর্তমানে মিয়ানমার বা আরাকান অঞ্চলে জ্বালানি তেল পাচার রোধে কোস্টগার্ডকে নিয়মিত নজরদারি করতে হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে জ্বালানি বাণিজ্যের একটি বড় বাজার রয়েছে এবং এ খাতকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক বাণিজ্য গড়ে তোলা সম্ভব।

পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বি.ডি. রহমতুল্লাহ বলেন, গত পাঁচ দশকে কোনো সরকারই জ্বালানি খাতে পুরোপুরি স্বাধীন ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। তার মতে, প্রতি বছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে তেল আমদানি করা হলেও এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়নি যেখান থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

তিনি বলেন, ‘বিশ্বে এখন জ্বালানি শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, এটি ভূরাজনৈতিক শক্তিরও উৎস। অনেক দেশ জ্বালানি বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি।’

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশ চাইলে মিয়ানমার হয়ে চীনে জ্বালানি রফতানির সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারত। চীনের সহায়তায় মিয়ানমারে ইতোমধ্যে জ্বালানি পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা কখনো এ ধরনের কৌশলগত উদ্যোগ নিয়ে এগোয়নি।

জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক রাজনীতিতে জ্বালানি এখন বড় শক্তির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্য, ভেনিজুয়েলা বা মধ্য এশিয়ার সঙ্ঘাতগুলোও অনেকাংশে জ্বালানি সম্পদের সাথে জড়িত। ফলে আমদানিনির্ভর দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

অতীতে আদানি বিদ্যুৎ প্রকল্প, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশে জ্বালানি মূল্য সমন্বয় না করার মতো বিষয়গুলোও আলোচনায় এসেছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে জ্বালানি নীতি পুনর্গঠন করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার সম্প্রতি এক সমাবেশে বলেন, জ্বালানি খাতে বিভিন্ন চুক্তির কারণে রাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। তার মতে, বিদ্যুৎ পাওয়া না পাওয়া নির্বিশেষে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেয়ার কারণে অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘থিংক গ্লোবালি, অ্যাক্ট লোকালি’- এই নীতিতে জ্বালানি খাতকে নতুনভাবে সাজাতে পারলে বাংলাদেশও আঞ্চলিক জ্বালানি বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।