দেশে নিকাহ রেজিস্ট্রারের পদ খালি দুই শতাধিক

অস্থায়ী নিয়োগ দিতে তৎপর সিন্ডিকেট

খালিদ সাইফুল্লাহ
Printed Edition

সারা দেশে দুই শতাধিক নিকাহ রেজিস্ট্রারের (কাজী) পদ খালি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব পদ আওয়ামী দলীয় কাজীরা ভোগদখলের পর এবার সেসব পদে অস্থায়ী নিয়োগ দেয়ার তৎপরতা শুরু হয়েছে। তবে এসব নিয়োগ নিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিতে একটি চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ মুসলিম নিকাহ রেজিস্ট্রার সমিতির পক্ষ থেকে গতকাল আইন সচিবের কাছে একটি লিখিত আবেদন করা হয়েছে। ওই আবেদনে সারা দেশে ২০০ থেকে ২৫০ নিকাহ রেজিস্ট্রারের পদ খালি রয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। সমিতির সভাপতি জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের সাবেক সভাপতি মাওলানা শাহ নেছারুল হক, নির্বাহী সভাপতি মাওলানা ইকবাল হোসেন ও মহাসচিব মাওলানা সেলিম রেজা স্বাক্ষরিত আবেদনে শূন্য পদগুলোকে অস্থায়ী কাজী নিয়োগসহ ৯ দফা দাবি জানানো হয়েছে। সমিতির নির্বাহী সভাপতি মাওলানা ইকবাল হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, বিগত ১৬ বছর ধরে নিকাহ রেজিস্টাররা আওয়ামী ফ্যাসিবাদের অত্যাচারে চরমভাবে নিগৃহীত। ওই সময় কোনো আলেম ওলামা ও নিকাহ রেজিস্টার স্বাধীনভাবে কোনো কথা বলার সুযোগ পাননি। এমনকি নিকাহ্ রেজিস্টারের ২০০-২৫০টি শূন্য পদে বিগত আওয়ামী সরকারের আজ্ঞাবহ চিহ্নিত কাজীরা নিজ দায়িত্বের সাথে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে আসছে। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ওইসব শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নেয়ায় পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার শুরু হয়েছে।

মাওলানা ইকবাল আরো বলেন, আমরা আইন মন্ত্রণালয়ে দেয়া আবেদনে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী বেকারত্ব দূরীকরণের অংশ হিসেবে নিকাহ্ রেজিস্টারের শূন্য পদগুলো পূরণে অস্থায়ী নিকাহ রেজিস্টার নিয়োগের দাবি জানিয়েছি। এ ছাড়া আরো বেশ কিছু দাবি রয়েছে। অন্য দাবির মধ্যে রয়েছে-১. নিকাহ্ রেজিস্টারের অবসরের বয়স বর্তমানে ৬৫ বছরের পরিবর্তে ৭৫ বছর করা, ২. পিতার স্থলে পুত্রকে যোগ্যতার ভিত্তিতে ও ৬ এর (ক) বিধি মোতাবেক সরাসরি নিয়োগ প্রদান, ৩. বিয়ের ক্ষেত্রে বরের ১৮ বছর এবং কনের বয়স ১৬ বছর নির্ধারণ। এতে তারা উল্লেখ করেন- বাংলাদেশের জলবায়ুজনিত কারণে খুব অল্প বয়সে ছেলেমেয়েরা সাবালক/সাবালিকা হয়। বিয়ের বয়স ছেলে ১৮ এবং মেয়ে ১৬ হলে বাল্যবিয়ে, ব্যভিচার ও সামাজিক অসঙ্গতি রোধ পাবে। ৪. নিকাহ্ রেজিস্ট্রারদের বিধি মোতাবেক যার যে অধিক্ষেত্র রয়েছে তার থেকে কোনো এলাকা বাদ না দেয়া, ৫. ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নিকাহ রেজিস্টারদের অহেতুক হয়রানি বন্ধ, ৬. নিজ খরচে কমপক্ষে ০২ জন অফিস সহকারী রাখার অনুমতি প্রদান, ৭. বিয়ের রেজিস্টেশন ফি ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হাজারে ১৪ টাকার পরিবর্তে ২০ টাকা এবং পরবর্তী প্রতি লাখে ১০০ টাকার পরিবর্তে ৩০০ টাকা করা, তালাক রেজিস্ট্রেশন ফি ১০০০ টাকার পরিবর্তে ২০০০ টাকা করা। বিয়ের নকল ফি ৫০ টাকার পরিবর্তে ২০০ টাকা করা এবং কমিশন ফি ৫০০ টাকা করা এবং ৮. বিয়ের ব্যাপারে নোটারি পাবলিকের হলফনামা বন্ধ করা।

নিকাহ রেজিস্টার নিয়োগে ফের সিন্ডিকেট : এ দিকে নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজী) নিয়োগ ঘিরে আবারো একটি চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নতুন সরকার আসার পর অস্থায়ী কাজী নিয়োগ দেয়ার কথা বলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার পাঁয়তারা করছে চক্রটি। গত ১ এপ্রিল আইনমন্ত্রীর বরাবর আব্দুল মোতালিব নামে এক কাজী লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন। এতে তিনি অস্থায়ী নিকাহ রেজিস্টার নিয়োগ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। লিখিত আবেদন সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালে নিকাহ রেজিস্টার নিয়োগকে কেন্দ্র করে একটি অস্থায়ী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। তৎকালীন আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের প্রভাব খাটিয়ে প্রতিমন্ত্রীকে দিয়ে ২০০৯ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন বিধিমালা উপেক্ষা করে ২০১৩ সালের ২০ অক্টোবর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করানো হয়। ওই প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে কয়েকটি অস্থায়ী নিয়োগ দিয়ে প্রচুর অর্থ হাতিয়ে নেয় একটি চক্র। ওই অস্থায়ী নিয়োগকে কেন্দ্র করে তৎকালীন সিনিয়র সহকারী সচিব হেমায়েত উদ্দিনের স্বাক্ষর জাল করে শত শত ভুয়া নিয়োগপত্র তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে এ বিষয়ে উচ্চ আদালতে একাধিক মামলা হয়, যা বর্তমানে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন রয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, পুরনো সেই চক্রটি আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়ার কথা বলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার পাঁয়তারা করছে চক্রটি।