ইংলিশদের ইতিহাস গৌরব ও আক্ষেপের দীর্ঘ পথচলা

Printed Edition

আশিকুর রহমান

বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দল ইংল্যান্ড। এবারের বিশ্বকাপে দারুণ খেলে সেমিতে উঠেছে ইংলিশরা। তাদের পারফরম্যান্স নজর কেড়েছে সমালোচকদেরও। তবে ইংল্যান্ডে জাতীয় দলের ইতিহাসে যেমন রয়েছে গৌরবের অধ্যায় তেমনি হতাশা ও আক্ষেপও জড়িয়ে আছে তাদের নামের সাথে। আন্তর্জাতিক ফুটবলের জন্মলগ্ন থেকেই পথচলা শুরু করা দলটি বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছিল ১৮৭২ সালে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। ‘থ্রি লায়ন্স’ নামে পরিচিত এই দলটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী হলেও বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছে মাত্র একবার। দীর্ঘ ইতিহাসে অসংখ্য স্মরণীয় সাফল্যের পাশাপাশি রয়েছে হতাশা, বিতর্ক ও অপূর্ণতার গল্পও।

ইংল্যান্ড প্রথম দিকে মূলত ব্রিটিশ হোম চ্যাম্পিয়নশিপেই অংশ নিত। ১৯০৬ সালে ফিফার সদস্য হলেও অপেশাদার খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক নিয়ে বিরোধের জেরে ১৯২৮ সালে ব্রিটিশ ফুটবল সংস্থাগুলো ফিফা থেকে সরে দাঁড়ায়। ফলে প্রথম তিনটি বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি ইংল্যান্ড।

১৯৫০ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নিলেও অভিষেক আসরটি ছিল হতাশার। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১-০ গোলের অপ্রত্যাশিত হার এবং স্পেনের বিপক্ষে পরাজয়ে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়। ১৯৫৩ সালে হাঙ্গেরির কাছে ওয়েম্বলিতে ৬-৩ গোলের হার এবং পরের বছর বুদাপেস্টে ৭-১ গোলের পরাজয় ইংল্যান্ড ফুটবলের ইতিহাসে বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হয়।

তবে সব কিছু বদলে যায় স্যার আলফ র‌্যামসির অধীনে। ১৯৬৬ সালে নিজেদের মাটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে রথ্যামসির ‘উইংলেস ওয়ান্ডার্স’ ইতিহাস গড়ে। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে অতিরিক্ত সময়ে ৪-২ গোলে হারিয়ে প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে ইংল্যান্ড। জিওফ হার্স্ট ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেন, আর অধিনায়ক ববি মুর বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন। এটি এখনো ইংল্যান্ড ফুটবলের সর্বোচ্চ অর্জন।

১৯৭০ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায়ের পর শুরু হয় দীর্ঘ হতাশার অধ্যায়। ১৯৭৪ ও ১৯৭৮ বিশ্বকাপে দলটি যোগ্যতা অর্জনই করতে পারেনি। ১৯৮২ সালে অপরাজিত থেকেও দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে বিদায় নিতে হয়।

১৯৮৬ বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল এবং ‘শতাব্দীর সেরা গোল’-এর কারণে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেয় ইংল্যান্ড। যদিও গ্যারি লিনেকার ছয় গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন।

১৯৯০ বিশ্বকাপে ববি রবসনের অধীনে আবারও সাফল্যের দেখা পায় দলটি। সেমিফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে টাইব্রেকারে হেরে চতুর্থ স্থান অর্জন করে। এরপর ১৯৯৪ বিশ্বকাপে উঠতেই পারেনি ইংল্যান্ড।

১৯৯৬ ইউরোতে স্বাগতিক হিসেবে সেমিফাইনালে উঠলেও জার্মানির কাছে টাইব্রেকারে হারে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে আবারও আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারে বিদায় নিতে হয়। ২০০২, ২০০৬ ও ২০২২ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালেই থেমে যায় ইংল্যান্ডের যাত্রা। বিশেষ করে ফ্রান্সের বিপক্ষে হ্যারি কেনের পেনাল্টি মিস বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভেঙে দেয়।

গ্যারেথ সাউথগেটের অধীনে ইংল্যান্ড নতুন করে ঘুরে দাঁড়ায়। ২০১৮ বিশ্বকাপে ২৮ বছর পর সেমিফাইনালে ওঠে দলটি। যদিও ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে ফাইনালের স্বপ্ন ভেঙে যায়। ইউরো ২০২০-এ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠেও ইতালির কাছে টাইব্রেকারে হারে। ইউরো ২০২৪-এও ফাইনালে পৌঁছে এবার স্পেনের কাছে ২-১ গোলে পরাজিত হয়ে টানা দ্বিতীয়বার রানার্সআপ হয়।

২০২৪ সালের ইউরোর পর সাউথগেট দায়িত্ব ছাড়েন। অন্তর্বর্তীকালীন কোচ লি কার্সলির পর ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে দলের দায়িত্ব নেন জার্মান কোচ টমাস টুখেল। তার নেতৃত্বে আবারো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছে ইংল্যান্ড।

এখন পর্যন্ত ইংল্যান্ড ১৯৫০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ১৯টি বিশ্বকাপের মধ্যে ১৬টিতে অংশ নিয়েছে। ১৯৬৬ সালে একবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি ১৯৯০ ও ২০১৮ সালে সেমিফাইনালে খেলেছে। তবে সাতবার কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেয়ার রেকর্ডও তাদের দখলে, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

পিটার শিলটন ১২৫ ম্যাচ খেলে ইংল্যান্ডের সর্বাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার রেকর্ডধারী। সর্বোচ্চ গোলদাতা হ্যারি কেন, যিনি দেশের হয়ে গোলসংখ্যায় সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন। গৌরবময় অতীত, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং নতুন স্বপ্ন এই তিনের সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে ইংল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দলের অনন্য ইতিহাস। সূত্র : উইকেপিডিয়া