কূটনৈতিক প্রতিবেদক
বিএনপির নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের বেইজিং সফরে বাংলাদেশ কেবল ‘একচীন’ নীতির প্রতি তার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্তই করেনি, বরং তাইওয়ান চীনের ভূখণ্ডের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীন সরকারই সমগ্র চীনের একমাত্র বৈধ সরকার Ñ এমন অবস্থান প্রকাশ্যে এনেছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ তাইওয়ানের স্বাধীনতার ঘোর বিরোধিতা করেছে এবং জাতীয় পুনর্মিলন অর্জনে চীন সরকারকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ঝুঁকি নিয়ে তাইওয়ানের মতো ভূ-রাজনীতির স্পর্শকাতর ইস্যুতে বাংলাদেশ চীনের পক্ষে অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
অন্যদিকে তিস্তা চুক্তির জন্য ভারতের জন্য আর অপেক্ষা না করে অভিন্ন এই নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা ও সমর্থন চেয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদশে ও চীন একে অপরের মূল স্বার্থ সমর্থন ও প্রধান উদ্বেগগুলো নিরসনে তাদের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সাথে সংযোগ স্থাপনকারী ‘চিকেন নেক’ হিসেবে পরিচিতি সংবেদনশীল এলাকার কাছে চীনের এ ধরনের প্রকল্পে অস্বস্তিতে রয়েছে। এ কারণে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বাংলাদেশের অনুরোধেই চীন তিস্তা প্রকল্পে আগ্রহ দেখলেও পরবর্তী সময়ে এই উদ্যোগ ঝুলে যায়। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ মেয়াদে ভারত তিস্তা প্রকল্পে বিনিয়োগের বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফরে দুই দেশ উচ্চপর্যায়ের সফর বিনিময়ের গতি বজায় রাখতে, পারস্পরিক আস্থা ও উন্নয়ন কৌশলের মধ্যে সমন্বয় গভীর করতে এবং চীন-বাংলাদেশ সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বকে এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রায় তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে বলেন, বাংলাদেশ এবার তাইওয়ান ইস্যুতে সুনির্দিষ্টভাবে নিজের অবস্থান ব্যক্ত করেছে। এটা বাংলাদেশের আগের অবস্থানের ধারাবাহিকতা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের নতুন সরকার চীনের প্রতি জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করল। তবে তা অন্য কোনো দেশের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ক্ষুণœ করে নয়। এই অবস্থানের ভিন্ন কোনো অর্থ বের করার চেষ্টা করা হলে ভুল হবে। এর মাধ্যমে চীনের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থানকারী কারোরই উচ্ছ্বসিত বা হতাশ হওয়ার কারণ নেই। বাংলাদেশকে নিজের স্বার্থেই সব দেশের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখতে হবে। এক দেশের সাথে সম্পর্ক ভালো করতে গিয়ে অন্য দেশের সাথে সম্পর্ক যাতে খারাপ না হয়, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, তাইওয়ানের স্বাধীনতা যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে সমর্থন করে না। কিন্তু তারা তাইওয়ানকে সমরাস্ত্রসহ যুদ্ধপ্রস্তুতির জন্য সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। এটাই যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিমুখী নীতির উদাহরণ।
বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্পে চীনের সমর্থন আগে থেকেই ছিল উল্লেখ করে সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, চীন বরাবরই এই প্রকল্পে অংশ নিতে চেয়েছে। কিন্তু আমরা সময়মতো তাদের সহায়তা নিতে পারিনি। একবার কাজ শুরু করেও আমরা পিছিয়ে গেছি। চীনের এ ধরনের প্রকল্পে ভারত স্বস্তিতে ছিল না। তাই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রকল্পটি ঝুলে গিয়েছিল। বর্তমান সরকার এই প্রকল্পের কাজ নতুন করে শুরু করতে চায়। তিনি বলেন, ভারত অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করলে বাংলাদেশের জন্য এ ধরনের প্রকল্প হাতে নেয়ার হয়তো প্রয়োজন হতো না। কিন্তু দীর্ঘকাল পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় তিস্তা মহাপরিকল্পনার আওতায় প্রকল্প হাতে নেয়া ছাড়া বাংলাদেশের সামনে বিকল্প নেই।
সম্প্রতি দিল্লিতে বাংলাদেশের একটি সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের সাথে আলাপকালে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রিকে চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় তিস্তা প্রকল্প হাতে নেয়ার ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, এরই মধ্যে ভারতের প থেকে বাংলাদেশকে একটি প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের নতুন সরকার চাইলে ওই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে ভারত তৈরি আছে।
দুই দেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে উল্লেখ করে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বলেন, পানি খাতে সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি মানুষের জীবন ও জীবিকার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। গঙ্গা, তিস্তাসহ পানিবণ্টনের বিষয়গুলো নিয়ে যৌথ নদী কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কারিগরি সংস্থার বৈঠক শিগগিরই অনুষ্ঠিত হবে।
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি এখনো ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতায় আটকে আছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তন এ েেত্র অগ্রগতি আনতে পারে কি নাÑ প্রশ্ন করা হলে বিক্রম মিশ্রি বলেন, এ বিষয়ে আমি আগে থেকে অনুমান করতে চাই না।
বিএনপি মতায় আসার পর থেকেই আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করতে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়টিতে জোর দিচ্ছে। এমন প্রোপটে আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন উদ্যোগ আর সার্ককে পুরোদমে সক্রিয় করার বিষয়টি নিয়ে দিল্লির ভাবনা কী জানতে চাইলে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বলেন, সার্ককে ফলপ্রসূ করতে অতীতে আমরা অনেক পদপে নিয়েছিলাম, কিন্তু আশানুরূপ ফল আসেনি। একটি দেশ এ অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদের বিস্তার ঘটানোয় সার্ক স্থবির হয়ে পড়েছে। যে দেশটি অতীতে এখানে সন্ত্রাসবাদকে ব্যবহার করেছে, তারা তাদের অবস্থান থেকে সরে এসেছে, এটা বিশ্বাস করার কোনো সুযোগ নেই। এমন প্রোপটে আমরা আঞ্চলিক সহযোগিতার েেত্র বিমসটেক নিয়ে আশাবাদী। আর বাংলাদেশ এই মুহূর্তে বিমসটেকের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে। এখানে বেশ কিছু েেত্র সহযোগিতা এগিয়ে নেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।



