বড় গুনাহ ত্যাগ করুন ছোট গুনাহ মাফ হবে

Printed Edition
বড় গুনাহ ত্যাগ করুন ছোট গুনাহ মাফ হবে
বড় গুনাহ ত্যাগ করুন ছোট গুনাহ মাফ হবে

জাফর আহমাদ

আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তোমরা যদি বড় বড় গুনাহ থেকে দূরে থাকো, যা থেকে দূরে থাকার জন্য তোমাদের বলা হচ্ছে, তাহলে তোমাদের ছোটখাটো কাজগুলো আমি তোমাদের হিসাব থেকে বাদ দিয়ে দিবো এবং তোমাদের সম্মান ও মর্যাদার জায়গায় প্রবেশ করিয়ে দিবো।” (সুরা নিসা : ৩১)

আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন, “যারা বড় বড় গুনাহ এবং প্রকাশ্য ও সর্বজনবিদিত অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকে তবে ছোটখাটো ত্রুটি-বিচ্যুতি হওয়া ভিন্ন কথা। নিশ্চয়ই তোমার রবের ক্ষমাশীলতা অনেক ব্যাপক।” (সুরা নাজম : ৩২)

আল্লাহ তা’আলা আল কুরআনের অন্যত্র বলেন, “প্রকাশ্যে বা গোপনে অশ্লীল বিষয়ের ধারেকাছেও যাবে না।” (সুরা : আনআম : ১৫১)

প্রথমত : কবিরা গুনাহ ও সগিরা গুনাহর পার্থক্য সম্পর্কে জানতে হবে। কবিরা ও সগিরা গুনাহর সংজ্ঞায় আমরা পূর্ণরূপে নিশ্চিত ও পরিতৃপ্ত তা হচ্ছে, “যে গুনাহকে কিতাব ও সুন্নাহর কোনো সুস্পষ্ট উক্তিতে হারাম বলা হয়েছে অথবা যে গুনাহর জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূল দুনিয়াতে কোনো শাস্তি নির্দিষ্ট করেছেন অথবা যে গুনাহের কারণে আখিরাতের আজাবের ভয় দেখিয়েছেন বা অভিশাপ দিয়েছেন অথবা তাতে লিপ্ত ব্যক্তির ওপর আজাব নাযিলের খবর দিয়েছেন।” এ ধরনের সব গুনাহই কবিরা গুনাহ। এ প্রকৃতির গুনাহ ছাড়া শরিয়তের দৃষ্টিতে আর যত রকমের অপছন্দনীয় কাজ আছে তার সবই সগিরা গুনাহর সংজ্ঞায় পড়ে। একইভাবে কেবল গুনাহের আকাক্সক্ষা পোষণ করা কিংবা ইচ্ছা করাও কবিরা গুনাহ নয় যতক্ষণ না ব্যক্তি কার্যত তা করে বসবে। তবে সগিরা গুনাহও যখন ইসলামী বিধানকে হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে করা হয়, আল্লাহ তা’আলার মোকাবেলায় অহঙ্কার মনোবৃত্তি নিয়ে করা হয় এবং যে শরিয়ত একে খারাপ কাজ বলে আখ্যায়িত করেছে তাকে আদৌ গুরুত্ব দেয়ার উপযুক্ত মনে করে না হয় তখন তা কবিরা গুনাহে রূপান্তরিত হয়। আল্লাহর ক্ষমতাশীলতা অত্যন্ত ব্যাপক। যার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। তিনি সঙ্কীর্ণমনা ও সঙ্কীর্ণ দৃষ্টি থেকে মহাপবিত্র। ছোটখাটো ভুল-ভ্রান্তি ধরে তিনি তাঁর বান্দাকে শাস্তি দেন না। কারো আমলনামায় যদি বড় বড় অপরাধ না থাকে, তাহলে ছোটখাটো অপরাধগুলোকে মহান আল্লাহ উপেক্ষা করে যান এবং তাঁর বান্দাদের বিরুদ্ধে অপরাধের কোনো অভিযোগ আনবেন না। কিন্তু যদি বড় বড় অপরাধ করতে থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা চালানো হবে তখন ছোটখাটো অপরাধগুলোও ধর্তব্যের মধ্যে গণ্য হবে, সেজন্য পাকড়াও করা হবে। এখানে বড় গুনাহ ও ছোট গুনাহের মধ্যে নীতিগত পার্থক্য বুঝে নেয়া উচিত। মুফাসিসরগণ কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বড় গুনাহ ও ছোট গুনাহর মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করেছেন। (তবে এর যথার্থ সত্য হলো, এর রহস্য একমাত্র আল্লাহ তা’আলাই ভালো জানেন) মুফাসসিরগণ যে তিনটি কারণে কোনো কাজ বড় গুনাহে পরিণত হয় তাহলো :

এক : কারো অধিকার হরণ করা। সে অধিকার আল্লাহর, বাপ-মার, অন্য মানুষের বা হরণকারীর নিজেরও হতে পারে। তারপর যার অধিকার যত বেশি হবে তার অধিকার হরণও ঠিক তত বেশি বড় গুনাহ হবে। এ কারণেই গুনাহকে জুলুমও বলা হয়। আর এ জন্য কুরআনে শিরককে সবচেয়ে বড় জুলুম বলা হয়েছে।

দুই: আল্লাহকে ভয় না করা এবং আল্লাহর মোকাবিলায় আত্মম্ভরিতা করা। যার কারণে মানুষ আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের পরোয়া করে না। তার নাফরমানি করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছা করেই এমন কাজ করে যা করতে আল্লাহ অত্যন্ত জোরালো ভাষায় নিষেধ করেছেন এবং জেনেবুঝে এমন কাজ থেকে বিরত থাকে যা করার জন্য মহান আল্লাহ বার বার তাগিদ দিয়েছেন। এই নাফরমানি যে পরিমাণ নির্লজ্জতা, অহমিকা, দুঃসাহস ও কাজ যতটুকু আল্লাহভীতির মনোভাব সমৃদ্ধ হবে গুনাহটিও ঠিক সেই পর্যায়ের কঠিন ও মারাত্মক হবে। এই অর্থের প্রেক্ষিতেই গুনাহের জন্য ‘ফিসক’ (ফাসেকি) ও ‘মাসিয়াত’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

তিন : যেসব সম্পর্কের সুস্থতা ও বলিষ্ঠতার ওপর মানব জীবনের শান্তি ও নিরাপত্তা নির্ভর করে সেগুলো বিকৃত ও ছিন্ন করা। এ সম্পর্ক বান্দা ও আল্লাহর মধ্যে এবং বান্দা ও বান্দার মধ্যে হতে পারে। যেমন অনেক সন্তান পিতা-মাতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাঁদের থেকে দূরে অবস্থান করে।

চার : যিনা একটি ফাহেশা জাতীয় গুনাহ। এর ফলে সমাজে বিভীষিকাময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সামাজিক সম্পর্ক ব্যাহত হয়। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীর সাথে যিনার সম্পর্ক রয়েছে। যিনার বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে চিন্তা করুন। এ কাজটি মূলত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয় ডেকে আনে। তাই এটি মূলত একটি বড় গুনাহ। কিন্তু এর বিভিন্ন অবস্থা গুনাহের ব্যাপারে একটি অন্যটির চেয়ে বেশি কঠিন গুনাহ। বিবাহিত মহিলার সাথে যিনা করা অবিবাহিত মেয়ের সাথে যিনা করার তুলনায় অনেক বেশি দোষণীয়। প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে যিনা করা অপ্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে যিনা করার তুলনায় বেশি খারাপ। মাহরাম মহিলার সাথে যিনা করা অন্য অনাত্মীয় মহিলার সাথে যিনা করার তুলনায় অনেক বেশি পাপ। অন্য কোনো জায়গায় যিনা করার তুলনায় মসজিদে যিনা করা কঠিন গুনাহ। ওপরে বর্ণিত কারণের ভিত্তিতে এই দৃষ্টান্তগুলোতে একই কাজের বিভিন্ন অবস্থার মধ্যে গুনাহ হওয়ার দিক দিয়ে পর্যায়ের পার্থক্য সূচিত হয়েছে। যেখানে নিরাপত্তার আশা যত বেশি, যেখানে মানবিক সম্পর্ক যত বেশি সম্মানের অধিকারী এবং যেখানে এই সম্পর্ক ছিন্ন করা যত বেশি বিপর্যয়ের কারণ বলে বিবেচিত হয়। সেখানে যিনা করা তত বেশি বড় গুনাহ। এ অর্থের প্রেক্ষিতে গুনাহের জন্য ‘ফুজুর’ এর পরিভাষা ব্যবহার করা হয়।

“যারা বড় বড় গুনাহ এবং প্রকাশ্য ও সর্বজনবিদিত অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকে।”এখানে ‘ফাওয়াহিশ’ শব্দটি যাকে আমরা ফাহেশা বলে থাকি তার বহুবচন। এ শব্দটি এমন সব কাজের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় যেগুলো সুস্পষ্ট খারাপ কাজ হিসেবে পরিচিত। কুরআনে ব্যভিচার, সমকাম (পুরুষকামিতা), উলঙ্গতা, মিথ্যা দোষারোপ এবং পিতার বিবাহিত স্ত্রীকে বিয়ে করাকে ফাহেশা কাজের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। হাদিসে চুরি ও মদ্যপানের সাথে সাথে ভিক্ষাবৃত্তিকেও ফাহেশা ও অশ্লীল কাজের মধ্যে গণ্য করা হয়েছে। অনুরূপভাবে অন্যান্য সব নির্লজ্জতার কাজও ফাহেশার অন্তর্ভুক্ত। এ ক্ষেত্রে আল্লাহর ঘোষণা হচ্ছে-এ ধরনের কাজ প্রকাশ্য বা গোপনে কোনোভাবেই করা যাবে না। কারণ এ অসৎ কাজগুলো বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যক্তিবর্গকে এবং সামষ্টিক পর্যায়ে সমগ্র সমাজ পরিবেশকে খারাপ করে দেয়। কাজগুলো স্বভাবতই কুৎসিত, নোংরা, ঘৃণ্য ও লজ্জাকর। এগুলোর অতিরিক্ত ব্যাখ্যা হলো, কৃপণতা, ব্যভিচার উলঙ্গতা, সমকামিতা, মুহরাম আত্মীয়কে বিয়ে করা, চুরি করা, শরাব পান, ভিক্ষাবৃত্তি, গালাগালি করা কটু কথা বলা ইত্যাদি। এভাবে সর্বসমক্ষে বেহায়াপনা ও খারাপ কাজ করা এবং খারাপ কাজকে ছড়িয়ে দেয়াও অশ্লীলতা-নির্লজ্জতার অন্তর্ভুক্ত। যেমন মিথ্যা প্রচারণা, মিথ্যা দোষারোপ, গোপণ অপরাধ জনসম্মুখে বলে বেড়ানো, অসৎ কাজের প্ররোচক গল্প, নাটক ও চলচ্চিত্র, উলঙ্গপনা চিত্র, মেয়েদের সাজগোজ করে জনসমক্ষে আসা নারী পুরুষ প্রকাশ্যে মেলামেশা এবং মঞ্চে মেয়েদের নাচগান করা ও তাদের শারীরিক অঙ্গভঙ্গির প্রদর্শন করাও ফাহেশার অন্তর্ভুক্ত। আরেকটি হলো, দুষ্কৃতি। এটি এমন কাজ যা মানুষ সাধারণভাবে খারাপ মনে করে থাকে, চিরকাল খারাপ বলে আসছে এবং আল্লাহর সব শরিয়ত যে কাজ করতে নিষেধ করেছে। আরেকটি হচ্ছে, জুলুম। জুলুম-বাড়াবাড়ি এর মানে হচ্ছে, নিজের সীমা অতিক্রম করা এবং অন্যের অধিকার তা আল্লাহর হোক বা বান্দার হোক লঙ্ঘন করা ও তার ওপর হস্তক্ষেপ করা। আরেকটি বড় ও মারাত্মক গুনাহ হচ্ছে, মানুষকে হত্যা করা। মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের প্রাণকে হারাম ও মর্যাদাসম্পন্ন ঘোষণা করা হয়েছে। তাকে ন্যায় ও সত্যের খাতিরে ছাড়া কোনোক্রমেই ধ্বংস করা যাবে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ ‘ন্যায়সঙ্গতভাবে’ বা ন্যায় ও সত্যের খাতিরে’ অর্থ হচ্ছে, আল কুরআনে এর তিনটি পর্যায় বর্ণিত হয়েছে এবং নবী সা: আরো দু’টি পর্যায় বৃদ্ধি করেছেন।

হাদিসে বর্ণিত দু’টো পর্যায় হচ্ছে, এক. কোনো ব্যক্তি বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও যিনা করলে। দুই. কোনো ব্যক্তি মুরতাদ হয়ে গেলে এবং মুসলিম সমাজ ত্যাগ করলে। এ পাঁচটি পর্যায় ছাড়া অন্য কোনো অবস্থায় একজন আর একজন মানুষকে হত্যা করতে পারে না। সে মু’মিন, জিম্মী বা সাধারণ কাফের যেই হোক না কেন, কোনো ক্ষেত্রেই তার রক্ত হালাল নয়। আমাদেরকে সগিরা গুনাহ ও কবিরা গুনাহের মধ্যে পার্থক্য জানতে হবে। ইসলামে মোটা মোটা অক্ষরে বিবৃত গুনাহগুলো পরিত্যাগ করলে মহান আল্লাহ সগিরা গুনাহগুলো মাফ করে দিবেন। তবে এ কথা ও সঠিক যে, যারা কবিরা গুনাহ ছেড়ে দেয় তাদের জন্য সগিরা গুনাহ ছাড়া অত্যন্ত সহজ হয়ে পড়ে।

লেখক : প্রবন্ধকার