ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

তারুণ্য ও মেধায় ভর করে ক্ষমতার স্বপ্ন এনসিপির

Printed Edition
এনসিপি নেতারা নির্বাচনী প্রচার শুরুর আগে ঢাবি এলাকায় শহীদ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করেন : নয়া দিগন্ত
এনসিপি নেতারা নির্বাচনী প্রচার শুরুর আগে ঢাবি এলাকায় শহীদ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করেন : নয়া দিগন্ত

হারুন ইসলাম

চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া তরুণদের নিয়ে গঠিত দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখন ব্যালট বিপ্লবের দোরগোড়ায়। রাষ্ট্র সংস্কারের স্লোগান নিয়ে গঠিত এনসিপি আর কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই; পুরোদমে নির্বাচনী মাঠে নেমেছে দলটি।

দলটির নেতাকর্মীরা বলছেন, প্রথাগত রাজনীতির ‘পেশিশক্তি’ ও ‘পরিবারতন্ত্র’ ভেঙে মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন তাদের লক্ষ্য। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে তিন নেতার মাজার ও শহীদ ওসমান হাদির কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করেন এনসিপির আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী নাহিদ ইসলাম। এ সময় আশাবাদ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ১০ দলীয় জোটই আগামী সরকার গঠন করবে।

এদিন সকাল সাড়ে ১০টায় দোয়েল চত্বর সংলগ্ন তিন নেতার মাজারে (শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও খাজা নাজিমুদ্দিন) জড়ো হন দলের নেতাকর্মীরা। সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন ও মুনাজাত শেষে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এই জনপদের সব কিছুর সাথেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ১৯৫২, ’৪৭, ’৭১ এবং সর্বশেষ ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের অগ্নিপাত এখান থেকেই শুরু হয়েছিল। তাই বাংলার পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে আমরা এখান থেকেই আমাদের নির্বাচনী যাত্রা শুরু করলাম।’ তিনি শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের জমিদারি প্রথা বিলোপের সংগ্রামের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘শেরেবাংলা যেমন সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, আজ আমরাও তেমনি ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের দিকে এগোচ্ছি।’

মাজার জিয়ারত শেষে দলের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে ঢাকা-৮ এলাকায় ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ ও গণসংযোগে অংশ নেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন দলের মুখ্য সমন্বয়ক ও ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।

নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতেই উঠে আসে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশেই শায়িত আছেন তিনি। তার কবর জিয়ারত করে নাহিদ ইসলাম এবারের নির্বাচনকে ‘আধিপত্যবাদবিরোধী আজাদীর যাত্রা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ‘এই যাত্রার অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হলো শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার। নির্বাচনের আগেই আমরা হাদি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দাখিলের আহ্বান জানাচ্ছি।’ একই সাথে তিনি নির্বাচন কমিশন ও বর্তমান সরকারের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেন। নাহিদ অভিযোগ করেন, সরকার ও নির্বাচন কমিশন একটি বিশেষ দলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায়।

আসন্ন নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে নাহিদ ইসলাম দেশবাসীর কাছে দু’টি আহ্বান জানান। প্রথমত, ১০ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থীদের এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির ৩০ জন প্রার্থীকে ‘শাপলা কলি’ মার্কায় ভোট দিয়ে সংসদে পাঠানো। দ্বিতীয়ত, সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়া। তিনি বলেন, ‘বিগত ১৬ বছর মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। আজ আমরা নতুন নির্বাচন ও গণভোটের দিকে যাচ্ছি। আপনারা শাপলা কলিতে ভোট দিয়ে আমাদের প্রার্থীদের সংসদে পাঠান। তারা সংসদে সাধারণ মানুষের কথা, গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তুলে ধরবে।’

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের প্রার্থী তালিকায় চমক দেখিয়েছে। দলটির ঘোষিত ৩০ জন প্রার্থীর তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তারা প্রথাগত রাজনীতিবিদদের বদলে আস্থা রেখেছেন তরুণ ও উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবীদের ওপর। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেখানে বয়োজ্যেষ্ঠদের আধিপত্য, সেখানে এনসিপির ৩০ জন প্রার্থীর মধ্যে ২২ জনের বয়সই ২৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ ৭৩ শতাংশ প্রার্থীই তরুণ। দলটির সর্বকনিষ্ঠ প্রার্থী নোয়াখালী-৬ আসনের আবদুল হান্নান মাসউদ, যার বয়স মাত্র ২৬ বছর। অন্য দিকে, প্রবীণতম প্রার্থী হিসেবে আছেন নাটোর-৩ আসনের ৬৪ বছর বয়সী এস এম জার্জিস কাদির। নবীণ-প্রবীণের এই মেলবন্ধনকে রাজনীতিতে ‘নতুন রক্তের সঞ্চালন’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এনসিপির প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতাও অনেকের নজর কেড়েছে। ৩০ জনের মধ্যে ২৬ জনই (৮৬ শতাংশ) স্নাতক বা তদূর্ধ্ব ডিগ্রিধারী। এর মধ্যে পিএইচডি ডিগ্রিধারী দু’জন, স্নাতকোত্তর ১৭ জন, স্নাতক সাত জন এবং এইচএসসি ও অন্যান্য যোগ্যতার চারজন প্রার্থী রয়েছেন। সংসদে সাধারণত ব্যবসায়ীদের আধিপত্য দেখা গেলেও এনসিপি সেই ধারা ভেঙেছে। তাদের তালিকায় ব্যবসায়ী আছেন মাত্র আটজন। এর বিপরীতে শিক্ষক পাঁচজন, আইনজীবী চারজন, সাংবাদিক তিনজন, চিকিৎসক ও লেখক দু’জন এবং ব্যাংকার ও উন্নয়নকর্মীসহ অন্যান্য পেশার ছয়জন প্রার্থী রয়েছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আইনসভায় পেশাজীবীদের এই উপস্থিতি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কারিগরি দক্ষতার প্রতিফলন ঘটাবে। এ ছাড়া সংখ্যায় কম হলেও প্রার্থী তালিকায় লিঙ্গসমতা ও অন্তর্ভুক্তির চেষ্টা করেছে দলটি। ৩০ জনের মধ্যে দু’জন নারী প্রার্থী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে একজন প্রতিনিধিকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে।

এনসিপির এই প্রার্থী তালিকা এবং নির্বাচনী কৌশলকে দেশের রাজনীতির জন্য একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ড. মো: শাহজাহান বলেন, ‘এটি কেবল একটি নির্বাচনী কৌশল নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত। আমরা দীর্ঘকাল পেশিশক্তি ও পরিবারতন্ত্রের রাজনীতি দেখেছি। এনসিপি তার বিপরীতে মেধা ও তারুণ্যনির্ভর বিকল্প উপস্থাপন করেছে।’

ড. শাহজাহান আরো বলেন, ‘সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো ব্যবসায়ীদের পরিবর্তে পেশাজীবীদের অগ্রাধিকার দেয়া। আইনসভা এখন কেবল রাজনৈতিক তর্কের জায়গা হবে না, বরং গবেষণানির্ভর বিতর্কের ক্ষেত্র হয়ে উঠবে। ২৬ বছরের মাসউদ আর ৬৪ বছরের কাদির সাহেবের উপস্থিতি প্রমাণ করে দলটি তারুণ্যের উদ্দীপনা আর অভিজ্ঞতার প্রজ্ঞার সমন্বয় ঘটাতে চায়।’ তার মতে, এনসিপির এই মডেল সফল হলে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে বাধ্য হবে।

‘ইনসাফের রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা এবং ‘আধিপত্যবাদ বিরোধী’ স্লোগান নিয়ে রাজপথে নেমেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি। তাদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ ভোটারদের আস্থা অর্জন করা। তারুণ্য, মেধা আর গণ-অভ্যুত্থানের আবেগকে পুঁজি করে তারা কি পারবে ১০ দলীয় জোটকে ক্ষমতায় নিতে? নাকি প্রথাগত রাজনীতির স্রোতে এই নতুন ধারা হারিয়ে যাবে? উত্তর মিলবে ব্যালট বাক্সে। তবে আপাতত, রাজনীতির মাঠে এক ভিন্নধর্মী বাতাসের জানান দিচ্ছে এনসিপির ‘শাপলা কলি’।