নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা আঘাত হানা হবে বলে সতর্ক করেছে তেহরান। গতকাল বুধবার রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা এ তথ্য জানান।
অন্য দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, চলমান অস্থিরতায় নিহতের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার ৬০০ হলেও নিরপেক্ষ বা সরকারি কোনো সূত্র থেকে তা নিশ্চিত করা যায়নি। মানবাধিকার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী ইরানে বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় দুই হাজার ৬০০ জনে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর এটিই দেশটির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। রয়টার্সের খবরে আরো বলা হয়েছে, ইসরাইলি গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানে হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যদিও এর সময় ও পরিসর এখনো স্পষ্ট নয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইরানি ওই কর্মকর্তা বলেন, তেহরান আঞ্চলিক মার্কিন মিত্রদের অনুরোধ করেছে যেন তারা ওয়াশিংটনকে ইরানে হামলা চালানো থেকে বিরত রাখে। তিনি বলেন, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে শুরু করে তুরস্ক পর্যন্ত আঞ্চলিক দেশগুলোকে জানানো হয়েছে- যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানকে লক্ষ্য করে, তাহলে ওই দেশগুলোর মাটিতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালানো হবে। তিনি আরো জানান, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থগিত করা হয়েছে, যা উত্তেজনা আরো বেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
একজন দ্বিতীয় ইসরাইলি সরকারি সূত্র জানান, মঙ্গলবার মধ্য রাতে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা মন্ত্রিসভাকে ইরানে সরকার পতনের সম্ভাবনা অথবা যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ নিয়ে ব্রিফ করা হয়েছে। গত বছর ইরানের সাথে ইসরাইল ১২ দিনের যুদ্ধে জড়িয়েছিল। মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দেয়, তাহলে আমরা খুবই শক্ত পদক্ষেপ নেবো। যদি তারা ঝুলিয়ে দেয়, তাহলে কিছু জিনিস আপনারা দেখতে পাবেন। উল্লেখ্য, গতকালই ইরানে আটক প্রথম বিক্ষোভকারী এরফানকে ফাঁসি দেয়ার কথা। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জানা গেছে, তাকে আত্মীয়দের সাথে সাক্ষাৎ করতে শেষবার ১০ মিনিট সময় দেয়া হয়।
ট্রাম্প ইরানিদের বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, তারা যেন প্রতিষ্ঠানগুলো দখলে নেয় এবং ঘোষণা করেন- ‘সহায়তা আসছে’। যদিও কী ধরনের সহায়তা, তা তিনি স্পষ্ট করেননি। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। বাহরাইনে আছে মার্কিন নৌবাহিনীর ফিফথ ফ্লিটের সদর দফতর। কাতারে আছে আল উদেইদ বিমানঘাঁটি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের অগ্রবর্তী সদর দফতর। গত বছর ইরান তার পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন বিমান হামলার জবাবে আল উদেইদ ঘাঁটির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল।
ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান আলি লারিজানি কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে কথা বলেছেন। পাশাপাশি আরাকচি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথেও যোগাযোগ করেছেন। এই তিন দেশই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র। আরাকচি আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদের কাছে বলেন, পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে এবং ইরান তার সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় যেকোনো বিদেশী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে দৃঢ়।
ইরানে অস্থিরতার পেছনে বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থার ইন্ধন
ইরানি কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে বলছে, দেশজুড়ে চলমান অস্থিরতার পেছনে বিদেশী শক্তি কাজ করছে এবং তারা সরাসরি মাঠে অস্থিরতা উসকে দিচ্ছে। আলজাজিরায় প্রকাশিত সংবাদে সোমবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেন- ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রই ইরানের দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। তিনি বলেন, গত জুনে ইসরাইলের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় যারা ইরানকে আঘাত করেছিল, তারাই এখন অর্থনৈতিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
পেজেশকিয়ান বলেন, বিদেশ থেকে কিছু সন্ত্রাসী আনা হয়েছে এবং তারা দেশের ভেতরে ও বাইরে প্রশিক্ষণ পেয়েছে। তিনি বলেন, এসব হামলাকারী উত্তরাঞ্চলীয় শহর রাশতের একটি বাজারে আক্রমণ করেছে এবং মসজিদে আগুন দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার ইরানে হামলার প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছেন। এতে সরাসরি বিদেশী হস্তক্ষেপের আশঙ্কা বাড়ছে। ইসরাইলের কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রী আমিখাই এলিয়াহু সেনা রেডিওকে বলেন, গত জুনে ‘রাইজিং লায়ন’ অভিযানে ইরানে প্রবেশ করে আমরা হামলা চালিয়ে ছিলাম এবং এখনো আমাদের কিছু লোক সেখানে কাজ করছে। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সাবেক সিআইএ পরিচালক মাইক পম্পেও সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, ইরানে ইসরাইলি এজেন্টরা কাজ করছে। তিনি ইরানের আন্দোলনকারীদের নববর্ষের শুভেচ্ছা জানান এবং মোসাদের এজেন্টদেরও শুভেচ্ছা দেন।
ইরানে হামলা না করতে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিচ্ছে আরব দেশগুলো
বিক্ষোভে উত্তাল ইরানে সামরিক হামলা চালানো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বিরত রাখতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে কয়েকটি আরব দেশ। সৌদি আরবের সাথে এ উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে কাতার ও ওমান। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ তথ্য জানিয়েছে।
তা ছাড়া মিডল ইস্ট মনিটরের খবরে বলা হয়েছে, ইরানের সাথে বড় ধরনের সামরিক সঙ্ঘাত হলে সৌদি আরবের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে- এ আশঙ্কা থেকেই রিয়াদ এ উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে লক্ষ্য করে কোনো হামলা হলে তা সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে দেশটি উদ্বিগ্ন। কূটনৈতিক মহলের মতে, এ প্রচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপকে সীমিত করার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনা এড়ানোর চেষ্টা। উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর পক্ষ থেকে এমন বড় ধরনের বাধার পেছনে আরেকটি উদ্বেগ হলো গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীকে সচল রাখা। ইরান ও আরব দেশগুলোর মধ্যবর্তী এই সঙ্কীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বব্যাপী মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ইরানে হামলা হলে তেলবাহী জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে মারাত্মক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র তার উপসাগরীয় মিত্রদের ইরান ইস্যুতে সম্ভাব্য উত্তেজনার জন্য প্রস্তুত থাকতে সতর্ক করেছে। এই সতর্কবার্তাই উপসাগরীয় রাজধানীগুলোতে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশগুলো আশঙ্কা করছে- এ ধরনের সঙ্ঘাত জ্বালানি নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর স্থিতিশীলতা এবং নিজ নিজ ভূখণ্ডে এর প্রভাব নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, সৌদি আরব, কাতার ও ওমান স্পষ্টভাবে হোয়াইট হাউজকে জানিয়েছে- ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা উচ্ছেদের কোনো চেষ্টা হলে জ্বালানি তেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে, যার নেতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও পড়বে।



