অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
অবশেষে ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানিতে ফিরতে শুরু করেছেন বিনিয়োগকারীরা। গতকাল দেশের দুই পুঁজিবাজার আচরণ বিশ্লেষণে বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের এ পরিবর্তন দেখা যায়। বিশেষ করে ঢাকা শেয়ারবাজারে এ দিন লেনদেনের শুরু থেকেই বিনিয়োগকারীদের ঝোঁক ভালো কোম্পানিগুলোর প্রতিই বেশি দেখা যায়। এতে স্বাভাবিকভাবেই ওই কোম্পানিগুলো লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় জায়গা করে নেয়। আর খাতওয়ারি বিশ্লেষণে বীমা খাতেই আগ্রহ দেখা যায় বেশি। এর ফলে গত ক’দিন ধরে বিক্রয়চাপে অস্থির থাকা বাজারগুলোতে সূচকের উন্নতি ঘটে।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগকারীদের ভালো কোম্পানির প্রতি এ ঝোঁক খুবই ইতিবাচক। কারণ দীর্ঘদিন ধরে কিছু নির্দিষ্ট কোম্পানি যার বেশির ভাগই দুর্বল মৌলভিত্তির, দুই বাজারের লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছিল। এটি পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক গতিকে বাধাগ্রস্ত করে তুলছিল। কিন্তু গতকাল এ চিত্র কিছুটা হলেও পাল্টে যায়। মৌলভিত্তির কোম্পানি হিসেবে পরিচিত ওষুধ খাতের দু’টি কোম্পানি গতকাল ডিএসইর লেনদেনে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে জায়গা করে নেয়। এর বাইরে ব্যাংকিং খাতের একটি ভালো কোম্পানি ও বীমা খাতের কয়েকটি কোম্পানি জায়গা করে নেয় ডিএমইতে লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির তালিকায়। তাদের মতে, বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের এ পরিবর্তন সামনের দিনগুলোতে অব্যাহত থাকলে ক্রমান্বয়ে পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে। ভালো বিনিয়োগকারীরা আবার আস্থাশীল হবেন।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১৯ দশমিক ৮৪ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। ৪ হাজার ৯৪৬ দশমিক ৬৬ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বুধবার দিনশেষে পৌঁছে যায় ৪ হাজার ৯৬৬ দশমিক ৫১ পয়েন্টে। তবে আগের দিনের মতো এ দিনও লেনদেনের শুরুতে সূচকের বড় ধরনের উন্নতি পরিলক্ষিত হয়। সকাল সাড়ে ১০টার আগেই সূচকটি পৌঁছে যায় ৪ হাজার ৯৬৮ পয়েন্টে। সূচকের এ অবস্থান থেকেই সৃষ্টি হয় বিক্রয়চাপ। বেলা ১১টার দিকে ডিএসই সূচক নেমে আসে ৪ হাজার ৯৫৬ পয়েন্টে। তবে এ পর্যায়ে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেলে বিক্রয়চাপ কমে যায়। বেলা ১টা পর্যন্ত সূচক একই অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়। এরপর নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে বাজার সূচক, যা একপর্যায়ে পৌঁছে যায় ৪ হাজার ৯৭৩ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে ডিএসই সূচকের উন্নতি ঘটে ৩১ পয়েন্ট। তবে দিনের সমন্বয় শেষে বৃদ্ধি পাওয়া সূচকের পুরোটা ধরে রাখতে পারেনি বাজারটি। একই সময় ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ যথাক্রমে ৯ দশমিক ০৮ ও ২ দশমিক ২১ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
অপর দিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই এদিন ৩০ দশমিক ০৯ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। বাজারটির বিশেষায়িত দুই সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৫৯ দশমিক ১৫ ও ২১ দশমিক ৪৬ পয়েন্ট।
বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায় গতকাল উভয় পুঁজিবাজারেই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের তালিকার শীর্ষস্থানে ছিল বীমা খাত। ফলে এ খাতের কোম্পানিগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশেরই দাম বৃদ্ধি পায়। একক খাত হিসেবে টেলিকমিউনিকেশন ও চামড়া শিল্পের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে শতভাগ কোম্পানির। এ ছাড়া টেক্সটাইল, ওষুধ ও রসায়ন, সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, ভ্রমণ ও বিনোদন ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে মিশ্র আচরণ দেখা যায়। তবে সবচেয়ে বড় খাত ব্যাংকিং খাতে মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় ছিল হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি।
এ দিকে গতকাল হঠাৎ করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের দুর্বল কোম্পানিগুলো আবার হারানো দর ফিরে পেতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক বিভিন্ন সময় কোম্পানিগুলো অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলার পর থেকে এসব কোম্পানি প্রায় প্রতিদিনই দিনের সর্বোচ্চ দরপতনের তালিকায় জায়গা করে নিত। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগের ঘোষণা দেয়। গতকাল দিনের শুরুতেই এ খাতের বেশ কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারের বিক্রেতা উধাও হয়ে যায়। লেনদেনের শেষ পর্যন্ত এসব কোম্পানিতে আর বিক্রেতা ফিরেনি। সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ এ ঘোষনা হয়তোবা বিনিয়োগকারিদের নতুন করে আশান্বিত করে তুলতে পারে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে গতকাল লেনদেনের শীর্ষে ছিল ওষুধ ও রসায়ন খাতের এসিআই লিমিটেড। ১৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৬ লাখ ৬১ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ১০ কোটি ২৬ লাখ টাকায় ৪ লাখ ৯৩ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে একই খাতের স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সিটি ব্যাংক, ওরিয়ন ইনফিউশন, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস, সায়হাম টেক্সটাইলস, বিডি থাই ফুড, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, মেঘনা ইন্স্যুরেন্স ও ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স।
এদিন মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ কোম্পানি ছিল খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের কোম্পানি বিডি থাই ফুড। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। ৭ দশমিক ৬১ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে প্রকৌশল খাতের বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম ছিল এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, সিএপিএম বিডিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড, আইসিবি থার্ড এনআরবি মিউচুয়াল ফান্ড, এসিআই ফরমুলেশন, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স, লিনডে বিডি ও মেঘনা ইন্স্যুরেন্স।
এ দিন ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষে ছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের বিআইএফসি। গতকাল ১০ শতাংশ দরপতন ঘটে কোম্পানিটির। ৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ দর হারিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল শ্যামপুর সুগার মিলস ছিল এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি। ডিএসইর দরপতনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে মেঘনা সিমেন্ট, বে-লিজিং, এনসিসিবি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, রিজেন্ট টেক্সটাইলস, চার্টার্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স, সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ, এইচ আর টেক্সটাইলস ও পপুলার লাইফ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড।



