ক্রীড়া প্রতিবেদক
একজনের বাম পায়ের জাদু এখনো ফুটবলকে কবিতার মতো সুন্দর করে তোলে, আরেকজনের গতি যেন বজ্রপাত, তৃতীয়জনের শক্তি আর ফিনিশিং গোলরক্ষকদের কাছে এক ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন। বিশ্বকাপের মঞ্চে তাই আলোটা ভাগাভাগি নয়, বরং তিনজন মিলে পুরো আকাশটাই নিজেদের করে নিয়েছেন। বিশ্বকাপ মানেই নতুন গল্প, নতুন নায়ক। কিন্তু এবার যেন সব গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে মাত্র তিনজন। আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি, ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে ও নরওয়ের আরলিং হলান্ড। বয়স, খেলার ধরন আর ব্যক্তিত্বে ভিন্ন হলেও একটি জায়গায় তারা অভিন্ন। গোলের ক্ষুধায় অদম্য।
১৮ গোল নিয়ে সবার ওপরে আছেন মেসি। বয়স যেন তাকে ছুঁতেও পারেনি। প্রতিটি ম্যাচে তিনি শুধু গোলই করছেন না, তৈরি করছেন মুহূর্ত, যে মুহূর্তে দর্শক উঠে দাঁড়িয়ে করতালি দেয়। আর্জেন্টাইন সমর্থকদের কাছে তিনি কেবল একজন ফুটবলার নন, তিনি এক চলমান আবেগ।
তবে খুব বেশি দূরে নেই এমবাপ্পে। তার গোলসংখ্যা ১৬। ফরাসি এই তারকার পায়ে বল থাকলেই যেন প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের বুক কেঁপে ওঠে। বিস্ফোরক গতি, নিখুঁত ফিনিশিং আর বড় ম্যাচে নিজেকে মেলে ধরার ক্ষমতা তাকে নিয়ে গেছে কিংবদন্তির পথে।
আর নরওয়ের হলান্ড? তিনি যেন গোল করার জন্যই জন্মেছেন। বিশাল দেহ, দুর্দান্ত পজিশনিং আর অসাধারণ গোল-ইনস্টিংক্ট দিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণকে বারবার ভেঙে দিচ্ছেন। তার সামনে বল পৌঁছানো মানেই গোলের সুবাতাস।
প্রশ্ন এখন একটাই কোথায় গিয়ে থামবেন তারা? মেসি কি বিশে পৌঁছে নতুন উচ্চতায় উঠবেন? এমবাপ্পে কি তাকে ছুঁয়ে ফেলবেন? নাকি হালান্ড সবাইকে পেছনে ফেলে নতুন রাজত্ব গড়বেন? উত্তর ভবিষ্যতের হাতে। তবে এটুকু নিশ্চিত, বিশ্বকাপ ২০২৬-এর কথা যখনই বলা হবে, ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে তিনটি নাম মেসি, এমবাপ্পে ও হলান্ড। কারণ তারা শুধু গোল করছেন না, তারা কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে আনন্দের উৎসব রচনা করছেন।
দুই তারকা ফুটবলার লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেশ জমে উঠেছে। দু’জনই পাল্লা দিয়ে গোল করছেন। কখনো এগিয়ে মেসি, কখনোবা এমবাপ্পে। এখন তাদের মধ্যে যে লড়াইটা যাচ্ছে, একসময় রোনালদো নাজারিও-মিরোস্লাভ ক্লোসার মধ্যে দেখা যেত।
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ ইতিহাসে যে পরিমাণ রেকর্ড ভাঙা-গড়ার খেলা চলছে, তাতে পেছনে পড়েছেন ক্লোসা-রোনালদোরা। ডালাসে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৮ গোলের রেকর্ড নিজের করে নেন মেসি। দুইয়ে থাকা ক্লোসার বিশ্বকাপে গোল ছিল ১৬। মেসি যেখানে শেষ করেছেন, কিলিয়ান এমবাপ্পের শুরু সেখানেই। ডালাস থেকে ২৩৫৭ কিলোমিটার দূরে ফিলাডেলফিয়ায় এমবাপ্পে জোড়া গোল করে ক্লোসার পাশে বসেছেন। বজ্রঝড়ের রাতে ইরাকের বিপক্ষে এমবাপ্পে দুই গোল করে বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা হয়ে গেল ১৬। বিশ^কাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডে যৌথভাবে দুইয়ে ক্লোসা-এমবাপ্পে। ১৫ গোল করে তিনে রোনালদো নাজারিও। এমবাপ্পে আর এক গোল করলে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকবেন তিনি।
১৬ জুন রাতে নিউ ইয়র্কে সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপের গোলসংখ্যা ১৪ বানিয়ে ফেলেছিলেন এমবাপ্পে। তখন মেসির গোল ছিল ১৩। ঠিক তার কয়েক ঘণ্টা পর কানসাস সিটিতে মেসি হ্যাটট্রিক করায় বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা হয়ে গেল ১৬। আগের রাতে ডালাসে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ৯ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল আদায় করতে ব্যর্থ হলেও ৩৮ ও ৯০ মিনিটের পর অতিরিক্ত সময়ে দুটি গোলে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটা নিজের করে নিয়েছেন।
ক্লোসা-রোনালদো অবসর নিয়েছেন আরও আগেই। ক্লোসা সবশেষ বিশ্বকাপ খেলেছেন ২০১৪ সালে। শেষটা তার হয়েছিল চ্যাম্পিয়ন হয়েই। ১২ বছর আগে মারাকানায় আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল জার্মানি। আর রোনালদো ২০০৬ বিশ্বকাপে শেষবারের মতো খেলেছেন। দুটি বিশ্বকাপও জিতেছেন তিনি। তবে মেসি-এমবাপ্পের গোলের ব্যবধান মাত্র ২ হওয়ায় তাদের লড়াইটা হবে উপভোগ করার মতোই।
বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার লড়াইয়ে মেসির চেয়ে এমবাপ্পের এগিয়ে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। যেখানে কানসাস সিটিতে ১৭ জুন আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিকের পর মেসির কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ২০৩০ বিশ্বকাপে তিনি খেলবেন কি না। আর্জেন্টাইন তারকা ফরোয়ার্ড সরাসরি না করে দিয়েছেন। তবে এমবাপ্পের বয়স মাত্র ২৭। চোট বাধা হয়ে না দাঁড়ালে এই বিশ্বকাপের পরও কমপক্ষে দু’টি বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ রয়েছে। যদি ফর্ম ধরে রাখতে পারেন, তাহলে সংখ্যাটাকে নিশ্চিতভাবেই বাড়ানোর চেষ্টা করবেন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড।
মেসি সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডটা এমন দিনে গড়েছেন, যে দিনটা ছিল দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গডের’ ৪০ বছর পূর্তি। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে মেক্সিকোর আসতেকা স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হয়েছিল ম্যারাডোনার সেই অবিস্মরণীয় গোল। বর্ষপূর্তির দিনই রেকর্ডটা নিজের করে নিয়েছেন মেসি।
আর্জেন্টিনার অধিনায়কের এমন পারফরম্যান্সে মুগ্ধ ভক্তরা। ফুটবল দুনিয়ায় মেসিকে নিয়ে উৎসবে মাতলেও কিলিয়ান এমবাপ্পে জানালেন, এলএমটেন কী করছেন, সে দিকে একদমই নজর নেই তাঁর।
এবারের বিশ্বকাপে এমবাপ্পের সময়টাও দারুণ যাচ্ছে। প্রথম দুই ম্যাচেই জোড়া গোল করেছেন। সবশেষ ইরাকের বিপক্ষে ফ্রান্সকে ৩-০ গোলের জয় এনে দিতেও দু’বার গোলের খাতায় নাম লেখান। তাঁর এমন পারফরম্যান্সে নকআউটে পৌঁছে গেছে দু’বারের চ্যাম্পিয়নরা। যদিও ব্যক্তিগত সাফল্য বা গোলের রেকর্ডের দিকে না তাকিয়ে এমবাপ্পের পুরো নজর এখন দলীয় সাফল্যের দিকে। মেসির এই অর্জন এমবাপ্পের মনোযোগে কোনো প্রভাব ফেলছে না। মেসিকে নিয়ে প্রশ্নের জবাবে এমবাপ্পে বলেন, ‘লিও সব সময়ই গোল করে। সে সব সময় করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। সে কী করছে, সে দিকে যদি মনোযোগ দিই, তাহলে আমাকে আরো বেশি পরিশ্রম করতে হবে। আমি শুধু আমার দলকে সাহায্য করার কথাই ভাবি।’
ইরাকের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ১০০তম ম্যাচ খেলতে নেমেছিলেন এমবাপ্পে। বিশ্বকাপে নিজের ফর্ম নিয়ে বেশ সন্তুষ্ট। ‘আমি দারুণ অনুভব করছি। সবাই জানে, একজন ফুটবলারের জন্য বিশ্বকাপ কতটা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। আমি রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে সম্ভাব্য সেরা মৌসুম কাটানোর চেষ্টা করেছি। জানুয়ারিতে গুরুতর চোটে পড়েছিলাম, কিন্তু পরে শারীরিক ও মানসিকভাবে সেরা অবস্থায় ফিরে এসেছি, যাতে এখানে ভালো অবস্থায় আসতে পারি।’



