প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে (আইপিও) শেয়ার বরাদ্দে আবারো লটারি পদ্ধতি ফিরিয়ে আনছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। মূলত পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিনিয়োগকারী সঙ্কট ও সেকেন্ডারি মার্কেটে লেনদেনের স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কমিশন। সংশ্লিষ্টদের মতে, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ায় বাজারে যে প্রাণহীনতা তৈরি হয়েছে, লটারি পদ্ধতির পুনর্বহাল তা কিছুটা হলেও দূর করতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে আইপিওতে লটারি পদ্ধতি বাতিল করা হয়। সে সময় অভিযোগ ছিল, লটারি ব্যবস্থায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা প্রকৃত অর্থে ন্যায্য শেয়ার পাচ্ছেন না এবং এটি একটি অনিয়মতান্ত্রিক ও ভাগ্যনির্ভর পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে। লটারির পরিবর্তে তখন প্রবর্তন করা হয় প্রো-রাটা বরাদ্দ ব্যবস্থা, যার আওতায় প্রতিটি বৈধ আবেদনকারী তার আবেদনকৃত শেয়ারের অনুপাতে বরাদ্দ পেত। নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্দেশ্য ছিল, সবাইকে সমানভাবে আইপিওতে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া এবং অতিরিক্ত জল্পনা-কল্পনা নির্ভর বিনিয়োগ আচরণ নিরুৎসাহিত করা।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় বিএসইসি দেখতে পেয়েছে, প্রো-রাটা পদ্ধতিতে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বরং উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তি ও বড় বিনিয়োগকারীরাই এই ব্যবস্থার প্রধান সুবিধাভোগীতে পরিণত হয়েছেন।
বিএসইসির মুখপাত্র মো: আবুল কালাম নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রো-রাটা পদ্ধতিতে যাদের হাতে বেশি অর্থ ছিল, তারাই বেশি শেয়ারের জন্য আবেদন করেছেন এবং তারাই বেশি শেয়ার পেয়েছেন। ফলে সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা নামমাত্র শেয়ার পেয়ে আইপিওতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
বিএসইসির তথ্যে দেখা যায়, লটারি পদ্ধতি বাতিলের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য আইপিও শেয়ার নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি ঘিরে যে উৎসবমুখর পরিবেশ আগে দেখা যেত, তা ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আইপিও থেকে উল্লেখযোগ্য মুনাফা করতে না পারায় বাজারে তাদের অংশগ্রহণ কমতে থাকে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে সেকেন্ডারি মার্কেটের লেনদেনে।
তথ্যে দেখা যায়, আইপিও বিধিমালা সংশোধনের সময় বিএসইসি জনমত গ্রহণ করে। সংশোধিত বিধিমালা নিয়ে পাওয়া প্রায় ২০০টি মতামতের মধ্যে ১৭১টিতেই আইপিওতে লটারি পদ্ধতি পুনর্বহালের পক্ষে মত দেয়া হয়। এই জনমতকে গুরুত্ব দিয়েই কমিশন লটারি ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পুঁজিবাজার সংস্কারের জন্য গঠিত টাস্কফোর্সের সুপারিশে আইপিওতে লটারি পদ্ধতি পুনর্বহালের বিষয়টি ছিল না। টাস্কফোর্সকে সহায়তাকারী ফোকাস গ্রুপের সদস্য এবং প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো: মনিরুজ্জামান বলেন, তারা লটারি পদ্ধতি ফিরিয়ে আনার সুপারিশ করেননি। তার মতে, যারা কেবল আইপিও থেকে স্বল্পমেয়াদি মুনাফার আশায় আবেদন করেন, তারাই মূলত এই পদ্ধতি ফেরানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
মনিরুজ্জামান আরো বলেন, লটারি পদ্ধতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উচ্চ মুনাফার আশায় অংশগ্রহণ বাড়ায়, যা স্বল্পমেয়াদে আবেদন সংখ্যা বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সহায়ক নয়। তবে তিনি স্বীকার করেন, লটারি পদ্ধতির সময় বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।
প্রো-রাটা ব্যবস্থায় আইপিও শেয়ার বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছিল। সাধারণ বিনিয়োগকারী, প্রবাসী বাংলাদেশী এবং যোগ্য বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য নির্দিষ্ট অনুপাতের শেয়ার বরাদ্দ থাকত। কোনো একটি ক্যাটাগরিতে অতিরিক্ত আবেদন হলে প্রত্যেক আবেদনকারী তার আবেদনকৃত শেয়ারের অনুপাতে বরাদ্দ পেতেন। কিন্তু এই ব্যবস্থায় বড় বিনিয়োগকারীরা স্বাভাবিকভাবেই বেশি সুবিধা পেতেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিএসইসির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রো-রাটা পদ্ধতি প্রকৃতপক্ষে বড় বিনিয়োগকারীদের পক্ষেই কাজ করেছে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আইপিও থেকে উল্লেখযোগ্য শেয়ার না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েন এবং বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। এই পরিস্থিতি পুঁজিবাজারের জন্য দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
বিএসইসির তথ্যে দেখা যায়, লটারি পদ্ধতি বাতিল হওয়ার পর থেকে বাজারে বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) অ্যাকাউন্টের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এক সময় যেখানে প্রায় ৩০ লাখ বিও অ্যাকাউন্ট সক্রিয় ছিল, বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ লাখে। একই সাথে সেকেন্ডারি মার্কেটে লেনদেনের পরিমাণও ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে কমিশনের বিশ্বাস, লটারি পদ্ধতি পুনর্বহাল হলে নতুন করে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তৈরি হবে। আইপিও ঘিরে আবারো উৎসবমুখর পরিবেশ ফিরে আসবে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আইপিও থেকে লাভ করলে তার একটি অংশ সেকেন্ডারি মার্কেটে পুনঃবিনিয়োগ করবেন। এর ফলে বাজারে লেনদেন বাড়বে এবং তারল্য সঙ্কট কিছুটা হলেও কাটবে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক সময় লটারিভিত্তিক আইপিওতে অতিরিক্ত সাবস্ক্রিপশনের ঘটনা ছিল নিয়মিত। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের কয়েকশ গুণ আবেদন জমা পড়ত, যা আইপিও প্রক্রিয়ায় পরিচালন ও নিষ্পত্তি সংক্রান্ত চাপ তৈরি করত। তবে বিএসইসি মনে করছে, বর্তমানে এই পরিস্থিতি আর সৃষ্টি হবে না। কারণ এখন বিও অ্যাকাউন্ট খোলার নিয়ম আগের তুলনায় অনেক কঠোর।
বর্তমানে বিও অ্যাকাউন্ট খুলতে হলে বিনিয়োগকারীকে নিজ নামে ব্যাংক হিসাব, ব্যাংক সনদ এবং জাতীয় পরিচয়পত্র থাকতে হয়। এর ফলে ভুয়া বা একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে আইপিও আবেদনের সুযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
বিএসইসির মতে, এই ব্যবস্থায় অতীতের মতো কৃত্রিম আবেদন ও অপব্যবহারের ঝুঁকি থাকবে না।
এ ছাড়া সংশোধিত আইপিও বিধিমালায় প্রতিটি বিও অ্যাকাউন্টের জন্য সেকেন্ডারি মার্কেটে ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগের যে শর্ত ছিল, তা বাতিল করা হয়েছে। এতে নতুন ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য বাজারে প্রবেশ আরো সহজ হবে বলে মনে করছে কমিশন।
বিএসইসির ভাষ্য অনুযায়ী, লটারি পদ্ধতি পুনর্বহালের মূল উদ্দেশ্য হলো সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য আইপিওতে আরো বেশি শেয়ার নিশ্চিত করা এবং বাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানো। কমিশনের বিশ্বাস, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বাজারে ফিরলে শুধু আইপিও নয়, সামগ্রিকভাবে পুঁজিবাজারের কার্যক্রমে গতি আসবে।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, লটারি পদ্ধতি ফেরানোর সিদ্ধান্ত স্বল্পমেয়াদে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে তালিকাভুক্ত কোম্পানির মান, করপোরেট সুশাসন এবং বাজারে আস্থার সঙ্কট দূর করার দিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তবুও বর্তমান বিনিয়োগকারী সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে বিএসইসির এই সিদ্ধান্ত বাজারে কিছুটা হলেও ইতিবাচক সাড়া ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



